মূল পরিকল্পনা

ভিশন

লক্ষ্য বলে আগামী কয়েক বছরে কী করব। ভিশন বলে কুড়ি বছর পরে আমরা কোথায় দাঁড়াতে চাই, আর কোন জিনিসগুলো কখনো বদলাবে না।

এক বাক্যে

পাঁচ পরিবারের এমন একটি খামার, যেখানে মাটি প্রতি বছর আগের চেয়ে উর্বর হয়, খাবার আসে নিজেদের বীজ থেকে, শক্তি আসে সূর্য আর গোয়াল থেকে, আর সন্তানেরা শেখে যে জমি আমাদের সম্পত্তি নয়, আমানত।

দশ বছর পরের একটি দিন

শীতের ভোর। ফজরের আজান হয় খামারের পাশের ছোট মসজিদ থেকে, যার আলো জ্বলে নিজস্ব সোলার প্যানেলে। নামাজ শেষে কেউ গোয়ালে যায় দুধ দোয়াতে, কেউ মুরগির ঘর খোলে। রান্নাঘরে বায়োগ্যাসের চুলায় চা চড়ে, অথচ কোনো সিলিন্ডার কেনা হয়নি বছরের পর বছর।

সকালে বাচ্চারা পুকুরঘাটে বসে দেখে হাঁসগুলো পানিতে নামছে। মাচায় লাউ ঝুলছে, বেডে লালশাক আর পালং। পাশের জমিতে সরিষা ফুটেছে, যার বীজ গত বছর নিজেদের সীড ব্যাংক থেকে এসেছে। বীজঘরের তাকে কাঁচের বয়ামে সাজানো কালিজিরা ধান, শিম, লাউ, টমেটোর বীজ, প্রতিটির গায়ে লেবেল আর তারিখ।

দুপুরে সোলার পাম্প নিজে নিজেই ট্যাংক ভরে রাখে। বিকেলে ঘাটে বসে বড়রা আগামী মৌসুমের পরিকল্পনা করেন। রাতে সব আলো জ্বলে দিনের রোদে ভরা ব্যাটারি থেকে। মাসের শেষে হিসাবের খাতা সবার সামনে খোলা হয়, আর কোন পরিবার কত সবজি, ডিম, দুধ পেল তা মিলিয়ে দেখা হয়।

মাটি, পানি ও গাছ

কুড়ি বছর পরে আমরা চাই খামারের মাটি কালো, ঝুরঝুরে আর কেঁচোয় ভরা থাকুক। প্রতি মৌসুমে ডালজাতীয় ফসল, সবুজ সার আর কম্পোস্ট মাটিতে ফিরবে। জমি কখনো খালি পড়ে থাকবে না; ফসল না থাকলে ঢাকনা ফসল বা খড়ের আবরণ থাকবে।

পুকুর দুটি হবে বৃষ্টির পানির ভান্ডার। বর্ষার পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে সেচ, যাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কম পড়ে। পাড়ে নারকেল, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা আর লেবুগাছ তখন পূর্ণবয়স্ক; তাদের ছায়ায় পাখি, মৌমাছি আর প্রজাপতির আনাগোনা।

খাবারের ছবি

  • বছরের বেশির ভাগ সময় পরিবারগুলোর সবজি, ডিম আর মাছ খামার থেকে আসে।
  • চালের বড় অংশ নিজেদের, বিশেষ করে সুগন্ধি আমন আর দেশি আউশ।
  • দুধ, দই, ঘি নিজেদের দেশি গাভী থেকে; কুরবানির পশুর একটি অংশও খামারে বড় হয়।
  • মসলার মধ্যে মরিচ, হলুদ, আদা, ধনিয়া, পেঁয়াজ, রসুন আর কালোজিরা নিজেদের।
  • সরিষা আর তিল থেকে অন্তত কিছু তেল নিজেরা ভাঙিয়ে আনা হয়।

পরের প্রজন্ম

খামারের সবচেয়ে বড় ফসল হবে সন্তানেরা। আমরা চাই তারা জানুক ধানের চারা কীভাবে রোপণ করতে হয়, বীজ কীভাবে শুকিয়ে রাখতে হয়, গাভীর যত্ন কীভাবে নিতে হয়। তারা যেন হিসাব রাখতে শেখে, পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, আর অপচয়কে অপছন্দ করতে শেখে।

বড় হয়ে তারা চাইলে খামারের দায়িত্ব নেবে। সেজন্য মালিকানার উত্তরাধিকার নিয়ে এখনই পরিষ্কার নিয়ম থাকবে, যাতে ভাগাভাগিতে জমি টুকরো না হয়, আর খামারের মূলনীতিগুলো বজায় থাকে।

প্রতিবেশী ও সমাজ

খামারটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা হলেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। ওয়াকফ জমির মসজিদ এলাকার সবার জন্য খোলা। দেশি বীজ যে কেউ বিনিময় করতে পারবেন। কৃষকেরা চাইলে কম্পোস্ট বা কেঁচো সার বানানো দেখে যেতে পারবেন। উদ্বৃত্ত খাবারের একটি অংশ নিয়মিতভাবে প্রতিবেশী ও অভাবী মানুষের কাছে যাবে।

যা কখনো বদলাবে না

পরিস্থিতি বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, পরিবারের সদস্য বদলাবে। কিন্তু চারটি নীতি বদলাতে হলে সব অংশীদারের সর্বসম্মতি লাগবে, যা আমরা আশা করি কখনো হবে না:

জৈব

রাসায়নিক সার, কীটনাশক আর হরমোন কখনো নয়।

হাইব্রিডমুক্ত

যে বীজ রাখা যায় না, সেই বীজ খামারে ঢুকবে না।

অবাণিজ্যিক

উৎপাদন পরিবারের জন্য, লাভের জন্য নয়।

আমানত

জমি, পানি ও প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব; ওয়াকফ জমি কখনো ফেরত নেওয়া যায় না।

যে ঝুঁকিগুলো মানছি

ভিশন সুন্দর হলেই সব সহজ হবে না। প্রথম কয়েক বছর জৈব চাষে ফলন কম হতে পারে। দেশি জাতের ফলন হাইব্রিডের চেয়ে কম, এটা জেনেই আমরা বেছে নিচ্ছি। পরিবারের সময় আর আগ্রহ ওঠানামা করবে। বন্যা, খরা বা রোগে ক্ষতি হবে। এসব মাথায় রেখেই রোডম্যাপ ধাপে ধাপে সাজানো, যাতে প্রতিটি ধাপের শিক্ষা পরের ধাপে কাজে লাগে।