পুকুর পাড়ের ফলের গাছ
গাছ পুকুরের পাড় ধরে রাখে, ঘাটে ছায়া দেয়, পাখি ডাকে, আর বছরজুড়ে ফল দেয়। আজ লাগানো আম-কাঁঠাল খাবে আমাদের সন্তান আর নাতি-নাতনিরা; ফলগাছ লাগানো তাই খামারের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
কোথায় কোন গাছ
মাস্টারপ্ল্যানে গাছের জায়গা তিন ধরনের: বড় পুকুরের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাড়, ছোট পুকুরের পশ্চিম ও উত্তর পাড়, আর সীমানা প্রাচীরের ভেতর দিক। বড় পুকুরের উত্তর আর পূর্ব পাড়ে মাচা থাকায় সেখানে উঁচু গাছ নেই। ঘাট আর বেঞ্চের আশপাশে ছায়াদার গাছ, কিন্তু ঘাটের সিঁড়ির ঠিক ওপরে নয়, যাতে পাতা পড়ে পিচ্ছিল না হয়।
সোলার প্যানেলের দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিমে এমন কোনো গাছ লাগানো যাবে না, যা বড় হয়ে প্যানেলে ছায়া ফেলবে। প্যানেল উত্তর-পূর্ব কোণে, তাই তার উত্তরে সীমানা ঘেঁষে ছোট গাছ চলবে, কিন্তু দক্ষিণে নয়। আজ ছোট চারা দশ বছরে বিশাল গাছ হবে; লাগানোর সময়েই পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা আর ছায়ার কথা ভাবতে হবে।
গাছের তালিকা ও দূরত্ব
| গাছ | গাছ থেকে গাছ (আনুমানিক) | কোথায় | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| আম | ৮–১০ মি (কলমের খাটো জাতে ৫–৬ মি) | বড় পুকুরের দক্ষিণ পাড়, সীমানা | গ্রীষ্মের ফল; কলমের চারা আগে ফল দেয় |
| কাঁঠাল | ৮–১০ মি | সীমানা ঘেঁষে, উঁচু জায়গায় | জলাবদ্ধতা সহ্য করে না; পাতা ছাগলের প্রিয় খাবার |
| নারকেল | ৬–৮ মি | পুকুরপাড়ের কোণ ও কিনারা | শিকড় পাড়ের মাটি ধরে রাখে; ছায়া কম |
| পেয়ারা | ৫–৬ মি | বসতঘরের আশপাশ, ছোট পুকুরপাড় | দ্রুত ফল; ডাল ছেঁটে ছোট রাখা যায় |
| লেবু | ৩–৪ মি | রান্নাঘরের কাছে | সারা বছর কিছু না কিছু ফল |
| কলা | ২–২.৫ মি | ছোট পুকুরের পাড়, নালার ধারে | পানি পছন্দ করে; ঝাড় থেকে নতুন চারা |
| সজনে | ৩–৪ মি | সীমানা, বেডের উত্তর দিকে | ডাঁটা ও পাতা পুষ্টিকর; পাতা পশুখাদ্যও |
| পেঁপে | ২–২.৫ মি | উঁচু, রোদেলা জায়গা | দ্রুত ফল দেয়; জলাবদ্ধতায় মরে যায় |
| জাম, তেঁতুল, বেল | ১০ মি বা বেশি | শুধু সীমানার কোণে | বিশাল গাছ; সোলার ও ঘর থেকে দূরে |
ফলগাছ সাধারণত কলম বা কাটিং দিয়ে বংশবিস্তার করা হয়, তাই মা-গাছের গুণ অপরিবর্তিত থাকে। স্থানীয় ভালো জাতের কলম বিশ্বস্ত নার্সারি বা হর্টিকালচার সেন্টার থেকে নেওয়া হবে।
কয়টি গাছ ধরবে
লাগানোর নিয়ম
- জ্যৈষ্ঠে প্রায় ৬০–৯০ সেমি চওড়া ও গভীর গর্ত; ওপরের মাটি আলাদা রাখা।
- গর্তে কম্পোস্ট, পচা গোবর ও কিছু ছাই ওপরের মাটির সাথে মিশিয়ে ভরে দুই সপ্তাহ রাখা।
- আষাঢ়ের প্রথম ভালো বৃষ্টিতে চারা লাগানো, কলমের জোড়া মাটির ওপরে।
- খুঁটি দিয়ে বেঁধে দেওয়া, চারপাশে বাঁশের খাঁচা যাতে ছাগল-গরু না খায়।
- গোড়ায় খড়ের মালচ, প্রথম শুকনো মৌসুমে নিয়মিত পানি।
যত্ন
- বর্ষার শুরু ও শেষে গোড়া থেকে একটু দূরে চক্রাকার নালায় কম্পোস্ট বা শুকনো স্লারি।
- শীতের শেষে মরা ও রোগা ডাল ছাঁটাই; আমের মুকুলের আগে গাছ পরিষ্কার।
- আমের হপার পোকা ও মাছি পোকা, পেয়ারার মাছি পোকার জন্য ফেরোমন ফাঁদ ও ফল ঢেকে রাখা।
- পুকুরে বেশি পাতা পড়লে নিয়মিত তুলে কম্পোস্টে; পানিতে পচা পাতা জমতে দেওয়া যাবে না।
- প্রতিটি গাছের লাগানোর তারিখ ও জাত একটি খাতায়।
শুধু ফল নয়
পুকুরপাড়ের গাছ বর্ষার ঢেউ আর বৃষ্টিতে পাড় ভাঙা কমায়, গ্রীষ্মে ঘাট আর গোয়ালের আশপাশ ঠান্ডা রাখে, পাখি আর উপকারী পোকার আশ্রয় দেয়। কাঁঠাল আর সজনের পাতা ছাগলের খাবার, ঝরা পাতা কম্পোস্টের বাদামি উপাদান। আর ইসলামি শিক্ষায় গাছ লাগানো সদকায়ে জারিয়া: যতদিন মানুষ, পাখি বা প্রাণী তার ফল খায়, ততদিন লাগানো ব্যক্তির জন্য সওয়াব।