ফসল ও মাটি

ভার্মি কম্পোস্ট

কেঁচো দিনে নিজের ওজনের কাছাকাছি খাবার খেয়ে যে মল ত্যাগ করে, সেটাই কেঁচো সার: দানাদার, গন্ধহীন, পুষ্টি আর উপকারী অণুজীবে ভরা। সাধারণ কম্পোস্টের চেয়ে দ্রুত তৈরি হয়, আর চারা ও সবজির বেডের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

কোন কেঁচো

মাটির গভীরে থাকা সাধারণ কেঁচো নয়, কেঁচো সারের জন্য লাগে মাটির ওপরের স্তরে জৈব বর্জ্য খেয়ে বাঁচা লাল কেঁচো। দেশে কেঁচো সার তৈরিতে সবচেয়ে প্রচলিত আইসেনিয়া ফেটিডা প্রজাতি, যা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে আর আমাদের আবহাওয়ায় টিকে থাকে। শুরুর কেঁচো সংগ্রহ করা যায় উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে স্থানীয় কেঁচো সার উৎপাদনকারীর কাছ থেকে; প্রথমে অল্প কেঁচো দিয়ে শুরু করলে কয়েক মাসে নিজেরাই বাড়িয়ে নেওয়া যায়।

হাউজ বা চাড়ি

আমাদের নকশায় কম্পোস্টের জায়গায় একটি ছাউনির নিচে তিনটি লম্বা পাকা হাউজ। বিকল্প হিসেবে সিমেন্টের রিং বা মাটির বড় চাড়িও চলে।

  • ছায়া: সরাসরি রোদ আর বৃষ্টি কেঁচোর জন্য প্রাণঘাতী; ছাউনি অপরিহার্য।
  • নিষ্কাশন: তলায় সামান্য ঢাল আর ছোট ছিদ্র, যাতে বাড়তি পানি বেরিয়ে যায়; সেই পানিই ভার্মিওয়াশ।
  • গভীরতা: প্রায় আধা মিটারের মধ্যে; লাল কেঁচো ওপরের স্তরেই থাকে।
  • সুরক্ষা: চারদিকে পানির নালা বা ছাইয়ের রেখা, যাতে পিঁপড়া না ওঠে; ওপরে জাল, যাতে পাখি, ব্যাঙ, ইঁদুর না আসে।

খাবার প্রস্তুতি

কাঁচা গোবর সরাসরি দিলে গরম হয়ে কেঁচো মরে যায়। তাই গোবর প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ আগে আলাদা জমিয়ে, মাঝে মাঝে উল্টে ঠান্ডা ও আধপচা করে নিতে হয়। বায়োগ্যাসের স্লারি কিছুদিন শুকিয়ে নিলে চমৎকার খাবার। এর সাথে কুচি করা সবজির খোসা, কলাগাছের টুকরো, ঝরা পাতা আর অল্প খড় মেশানো যায়। টক ফল, পেঁয়াজ-রসুনের খোসা, তেল-মসলা আর মাছ-মাংস দেওয়া যাবে না।

ধাপে ধাপে

  1. হাউজের তলায় কয়েক আঙুল পুরু খড় বা নারকেলের ছোবড়ার বিছানা, হালকা ভেজা।
  2. তার ওপর আধপচা গোবর ও অন্য খাবারের মিশ্রণ, প্রায় এক বিঘত পুরু।
  3. ওপরে কেঁচো ছেড়ে দেওয়া; কয়েক মিনিটে তারা নিচে ঢুকে যাবে।
  4. ওপরে ভেজা চট বা কলাপাতার ঢাকনা, যাতে অন্ধকার আর আর্দ্রতা থাকে।
  5. আর্দ্রতা পরীক্ষা: এক মুঠো চিপলে দুই-এক ফোঁটা পানি বের হবে; শুকনো হলে পানি ছিটানো, বেশি ভেজা হলে শুকনো খড় মেশানো।
  6. খাবার শেষ হয়ে এলে ওপরে নতুন খাবারের পাতলা স্তর।
  7. প্রায় দেড় থেকে দুই মাসে ওপরের স্তর দানাদার, কালো আর মাটির গন্ধযুক্ত হলে সংগ্রহের সময়।

সংগ্রহ ও কেঁচো আলাদা করা

সংগ্রহের কয়েক দিন আগে খাবার দেওয়া বন্ধ। তারপর হাউজের এক পাশে নতুন খাবার দিলে কেঁচো সেদিকে চলে যায়, অন্য পাশ থেকে সার তোলা যায়। আরেকটি উপায়: সার রোদের আলোয় ছোট ছোট স্তূপ করে রাখলে কেঁচো আলো এড়াতে নিচে নামে, ওপর থেকে সার তুলে নেওয়া যায়। তোলা সার ছায়ায় সামান্য শুকিয়ে চালুনিতে ছেঁকে বস্তায়, ছোট কেঁচো ও ডিম আবার হাউজে।

ভার্মিওয়াশ

হাউজের তলা দিয়ে যে বাদামি পানি চুইয়ে বের হয়, তা পুষ্টি ও অণুজীবসমৃদ্ধ তরল সার। পাত্রে ধরে রেখে পাঁচ-দশ গুণ পানিতে মিশিয়ে চারার গোড়ায় দেওয়া যায়। পাতায় দেওয়ার আগে কয়েকটি গাছে পরীক্ষা করে নিতে হবে।

প্রয়োগ

  • বীজতলা ও চারার মাটি: মাটির সাথে মিশিয়ে; চারা সবল হয়।
  • সবজির বেড: চারা রোপণের সময় প্রতিটি গর্তে এক-দুই মুঠো।
  • মাচার মাদা ও ফলগাছ: গোড়ার চারপাশে।
  • পরিমাণ: সাধারণ পরামর্শে প্রতি শতাংশে কয়েক কেজি থেকে দশ-বারো কেজি পর্যন্ত, ফসল ও মাটির অবস্থা দেখে। কেঁচো সার দামি ও সীমিত, তাই চারা, বেড আর গাছের গোড়ায় লক্ষ্য করে দেওয়া, ধানক্ষেতে নয়।

সতর্কতা

কেঁচো মরে যাওয়ার সাধারণ কারণ

কাঁচা গরম গোবর, অতিরিক্ত পানি, সরাসরি রোদ, পিঁপড়া ও ইঁদুরের আক্রমণ, আর লবণ বা রাসায়নিক মেশানো খাবার। গ্রীষ্মে ছাউনির নিচে ছিটিয়ে পানি দিয়ে ঠান্ডা রাখা, আর শীতে ঢাকনা মোটা করা।