ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল
ব্ল্যাক বেঙ্গল বাংলাদেশের গর্ব: ছোট আকার, কালো চকচকে লোম, বছরে প্রায় দুবার বাচ্চা, প্রায়ই জমজ, আর মাংস ও চামড়ার জন্য বিখ্যাত। কম খাবারে চলে, তবে ভেজা মেঝে একেবারেই সহ্য করে না।
কেন ব্ল্যাক বেঙ্গল
ব্ল্যাক বেঙ্গল দেশি জাত, আমাদের গরম-আর্দ্র আবহাওয়ায় অভ্যস্ত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক ভালো। এরা তাড়াতাড়ি প্রজননক্ষম হয়, প্রায়ই জমজ বা তিনটি বাচ্চা দেয়, আর মাংস নরম ও সুস্বাদু। বড় জাতের ছাগলের মতো দানাদার খাবারের ওপর নির্ভরশীল নয়; ঘাস আর গাছের পাতাতেই বেশির ভাগ চাহিদা মেটে। কুরবানির পশু হিসেবেও খামারে ছাগল গুরুত্বপূর্ণ।
ছাগল কেনা হবে পরিচিত কৃষকের কাছ থেকে, টিকার ইতিহাস জেনে। বিশুদ্ধ ব্ল্যাক বেঙ্গল চেনার লক্ষণ: পুরো কালো চকচকে লোম, ছোট পা, সোজা ছোট শিং, খাটো কান। পাঁঠা একই এলাকার আত্মীয় না হওয়াই ভালো, যাতে অন্তঃপ্রজনন না হয়।
মাচার ঘর
- উঁচু মাচা: মাটি থেকে প্রায় এক মিটার ওপরে বাঁশ বা কাঠের ফাঁকা পাটাতন, যাতে প্রস্রাব-বিষ্ঠা নিচে পড়ে, মেঝে শুকনো থাকে। ভেজা মেঝে ছাগলের নিউমোনিয়া আর খুরের রোগের প্রধান কারণ।
- মাপ: প্রায় ১০ × ৬ মিটার; প্রতিটি বড় ছাগলের জন্য ভেতরে অন্তত এক বর্গমিটার, বাচ্চাসহ ছাগীর জন্য আরও বেশি। শুরুর ছয়টি ছাগলের জন্য যথেষ্ট, বাচ্চা বাড়লেও জায়গা থাকবে।
- পাটাতনের ফাঁক: এত চওড়া যাতে বিষ্ঠা পড়ে যায়, কিন্তু বাচ্চার পা আটকে না যায়।
- ঢালু সিঁড়ি: ওঠানামার জন্য কাঠের ঢালু পথ, খাঁজকাটা।
- বেড়া ও ছাদ: তিন দিক বাঁশের বেড়া, সামনে অর্ধেক খোলা; টিনের ছাদের নিচে খড়ের স্তর, যাতে গরম কম লাগে। শীতে রাতে চট দিয়ে ঢাকা।
- নিচের গোবর: মাচার নিচে জমা বিষ্ঠা সপ্তাহে একবার পরিষ্কার করে কম্পোস্টে।
খাদ্য
ছাগল আসলে ঘাসের চেয়ে গাছের পাতা বেশি পছন্দ করে। কাঁঠাল পাতা, ইপিল-ইপিল, ধইঞ্চা, বাবলা, মান্দার আর পুকুরপাড়ের ঝোপের পাতা ছাগলের প্রিয়। একটি বড় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের দিনে আনুমানিক দুই-তিন কেজি কাঁচা ঘাস-পাতা আর ১০০–২৫০ গ্রাম দানাদার মিশ্রণ (কুঁড়া, ভুসি, ভাঙা ডাল, খৈল) লাগে; গর্ভবতী আর দুধ দেওয়া ছাগীর বেশি। সাথে পরিষ্কার পানি আর লবণ।
ভেজা, শিশির পড়া ঘাস খাওয়ালে পেট ফাঁপা আর কৃমির সমস্যা বাড়ে; তাই সকালের ঘাস একটু শুকিয়ে বা দুপুরের পরে কেটে দেওয়া হবে। বর্ষায় চরানো কম, ঘরে কেটে খাওয়ানো বেশি।
প্রজনন
ছাগী সাধারণত ছয়-আট মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়, তবে শরীর একটু বড় হওয়ার পর পাল দেওয়া ভালো। গরম হলে (লেজ নাড়া, ডাকাডাকি) ১২–২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাঁঠার কাছে। গর্ভকাল প্রায় পাঁচ মাস। বাচ্চা জন্মের পর নাভি পরিষ্কার, আর শাল দুধ নিশ্চিত করা। পাঁঠা দুই বছর পর বদলানো বা অন্য খামারের পাঁঠার সাথে বিনিময়, যাতে মেয়ে ছাগলের সাথে বাবার প্রজনন না হয়।
স্বাস্থ্য ও টিকা
| রোগ | কখন (সাধারণ সূচি) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| পিপিআর (ছাগলের প্লেগ) | বাচ্চার প্রায় তিন-চার মাস বয়সে, তারপর উপজেলা অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, সাধারণত আশ্বিনে | জ্বর, পাতলা পায়খানা, মুখে ঘা; দ্রুত ছড়ায়, মৃত্যুহার বেশি |
| গোটপক্স (ছাগলের বসন্ত) | বছরে একবার, চৈত্রে | চামড়ায় গুটি, জ্বর |
| ক্ষুরা রোগ | বছরে দুবার, ফাল্গুন ও ভাদ্রে, গরুর সাথে | মুখ ও খুরে ঘা |
| কৃমিনাশক | প্রতি চার মাস অন্তর: জ্যৈষ্ঠ, আশ্বিন, মাঘ | বর্ষায় কৃমির প্রকোপ বেশি |
| উকুন ও আঁঠালি | নিয়মিত পরীক্ষা | নিমপাতার পানি দিয়ে গা ধোয়া; ঘর পরিষ্কার |
টিকার নাম, বয়স, মাত্রা ও পুনরাবৃত্তির সময় এলাকা, রোগের প্রাদুর্ভাব আর টিকার ধরন অনুযায়ী বদলায়। এখানে দেওয়া সূচি সাধারণ পরিকল্পনা; চূড়ান্ত সূচি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বা নিবন্ধিত পশু চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক হবে। সরকারি টিকা সাধারণত উপজেলা অফিসে স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়।
অ্যান্টিবায়োটিক নীতি: নিয়মিত বা রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন বা বৃদ্ধিবর্ধক কখনো নয়। কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা হবে, কারণ কষ্ট দেখেও চিকিৎসা না করা পশু কল্যাণের পরিপন্থী। চিকিৎসার পর ওষুধের নির্ধারিত “প্রত্যাহার সময়” পর্যন্ত সেই প্রাণীর দুধ, ডিম বা মাংস খাওয়া হবে না, আর বিষয়টি চিকিৎসার খাতায় লেখা থাকবে।
অসুস্থতার লক্ষণ
দলের থেকে আলাদা হয়ে থাকা, খাবারে অনীহা, জাবর না কাটা, নাক দিয়ে পানি, পাতলা পায়খানা, খোঁড়ানো বা পেট ফোলা দেখলে সেই ছাগলকে আলাদা করে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ। পিপিআর সন্দেহ হলে দেরি নয়, কারণ পুরো দলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।