পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
পাঁচ পরিবারের খামারে সবচেয়ে কঠিন কাজ চাষ নয়, একসাথে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তাই নিয়মগুলো শুরুতেই লিখে রাখা, যাতে পরে ভুল বোঝাবুঝি না হয়।
পরামর্শের নীতি
কুরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে, তারা নিজেদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শে করে। আমাদের পরিচালনার ভিত্তিও তাই শূরা বা পরামর্শ। কারও অংশ বেশি বলে তাঁর একার সিদ্ধান্ত চলবে না, আবার যিনি বেশি টাকা দিয়েছেন তাঁর মতামতকেও উপেক্ষা করা যাবে না। এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতেই সিদ্ধান্তকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে।
পরিচালনা পরিষদ
প্রতিটি পরিবার থেকে একজন প্রতিনিধি নিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিচালনা পরিষদ। প্রতিনিধি পরিবার নিজেই ঠিক করবে, আর প্রয়োজনে বদলাতে পারবে, তবে বদলের কথা লিখিতভাবে জানাতে হবে। পরিষদের পাশাপাশি তিনটি দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ থাকবে:
সমন্বয়ক
দৈনন্দিন কাজের তদারকি, শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ, রোস্টার মেলানো। প্রতি বছর পালাক্রমে বদল।
কোষাধ্যক্ষ
তহবিল, রসিদ, মাসিক হিসাব আর ব্যাংক হিসাব। একই ব্যক্তি টানা দুই বছরের বেশি নয়।
সচিব
সভার নোটিশ, কার্যবিবরণী আর সিদ্ধান্তের খাতা রাখা; সিদ্ধান্ত সবার কাছে পাঠানো।
এ ছাড়া শক্তি, বীজঘর, পুকুর, প্রাণিসম্পদের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য একজন করে দায়িত্বশীল থাকবেন। কে কোন দায়িত্বে, তা দায়িত্ব বণ্টন পাতায়।
সিদ্ধান্তের চার স্তর
দৈনন্দিন কাজ
কোন বেডে আজ পানি, কোন গাভীর চিকিৎসক লাগবে, অনুমোদিত বাজেটের ভেতরে ছোট কেনাকাটা।
সমন্বয়ক বা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলসাধারণ সিদ্ধান্ত
মৌসুমি চাষ পরিকল্পনা, রোস্টার, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে খরচ, ছোট মেরামত, নতুন জাত পরীক্ষা।
প্রতি পরিবার এক ভোট, সংখ্যাগরিষ্ঠবড় আর্থিক সিদ্ধান্ত
নতুন বিনিয়োগ, সীমার বেশি খরচ, ১০ কিলোওয়াটে উন্নীতকরণ, নতুন স্থাপনা, শ্রমিক নিয়োগ।
অংশ অনুযায়ী ভোটে ৬০%-এর বেশি, এবং অন্তত তিন পরিবারের সম্মতিমৌলিক পরিবর্তন
জমি বিক্রি বা বন্ধক, মূলনীতি বদল (জৈব, হাইব্রিডমুক্ত, অবাণিজ্যিক), নতুন অংশীদার, ওয়াকফ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত।
সর্বসম্মতিতৃতীয় স্তরের নিয়মটি ইচ্ছা করে দুই শর্তে বাঁধা। শুধু অংশের হিসাবে ভোট হলে উদ্যোক্তা পরিবার একাই সিদ্ধান্ত নিতে পারত; আবার শুধু মাথাপিছু ভোট হলে যিনি ৬০ শতাংশ টাকা দিচ্ছেন তাঁর অমতে বড় খরচ চাপানো যেত। দুই শর্ত একসাথে থাকায় বড় খরচে উদ্যোক্তা পরিবারের সম্মতি লাগবে, আর অন্তত আরও দুই পরিবারকেও রাজি হতে হবে।
কোন সিদ্ধান্তে কী লাগবে
নিচে একটি ধরন বাছাই করলে দেখাবে কোন স্তরের নিয়ম প্রযোজ্য।
একটি সিদ্ধান্তের ধরন বাছাই করুন।
খরচের সীমা
কোন খরচ কোন স্তরে যাবে, তার সীমা প্রথম বার্ষিক সভায় টাকার অঙ্কে ঠিক হবে, আর প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি দেখে নতুন করে বসানো হবে। সাধারণ নিয়ম: মাসিক বাজেটের ভেতরের নিয়মিত খরচ প্রথম স্তরে; বাজেটের বাইরে কিন্তু ছোট অঙ্ক দ্বিতীয় স্তরে; বাকি সব তৃতীয় স্তরে। জরুরি অবস্থায় (পশুর চিকিৎসা, ঝড়ে ক্ষতি) সমন্বয়ক খরচ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবাইকে জানাবেন।
সভার সূচি
| সভা | কখন | মূল আলোচ্য |
|---|---|---|
| মাসিক সভা | প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার, জুমার পরে | গত মাসের হিসাব, কাজের অগ্রগতি, সমস্যা, আগামী মাসের রোস্টার |
| মৌসুমি পরিকল্পনা সভা | খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি শুরুর আগে, বছরে তিনবার | কোন জমিতে কী ফসল, বীজ প্রস্তুতি, শস্য পর্যায়, শ্রমের প্রয়োজন |
| বার্ষিক সাধারণ সভা | চৈত্র মাসে, রবি মৌসুম শেষে | বার্ষিক হিসাব ও নিরীক্ষা, লক্ষ্যের পর্যালোচনা, পদ বদল, বাজেট ও খরচের সীমা |
| জরুরি সভা | যেকোনো দুই পরিবারের অনুরোধে, তিন দিনের নোটিশে | অপ্রত্যাশিত ক্ষতি, বিরোধ, জরুরি বড় খরচ |
সভার কোরাম: অন্তত চার পরিবারের প্রতিনিধি, যার মধ্যে উদ্যোক্তা পরিবার থাকবে। কেউ সশরীরে আসতে না পারলে ফোন বা ভিডিওতে যোগ দিতে পারবেন। প্রতিটি সিদ্ধান্ত কার্যবিবরণীতে লেখা হবে, আর সাত দিনের মধ্যে সবার কাছে পাঠানো হবে।
বিরোধ নিষ্পত্তি
মতভেদ হবেই। সমস্যা হয় যখন মতভেদ মনোমালিন্যে গড়ায়। তাই আগেই ঠিক করা ধাপগুলো:
- সরাসরি আলোচনা: সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে বসে কথা বলবেন, সমন্বয়ক উপস্থিত থাকতে পারেন।
- পরিষদে উত্থাপন: না মিটলে পরের মাসিক সভায় বিষয়টি উঠবে; বিবদমান পরিবার সেই বিষয়ের ভোটে অংশ নেবে না।
- মধ্যস্থতা: তবুও না মিটলে সব পক্ষের সম্মত একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যেমন একজন আলেম বা অভিজ্ঞ মুরুব্বি, মধ্যস্থতা করবেন।
- সালিশ: অংশীদারি চুক্তিতে উল্লেখিত সালিশ ব্যবস্থায় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, যা সবাই মানতে আগেই রাজি থাকবেন।
- আদালত: শুধু শেষ উপায় হিসেবে, আর সেই সময়েও খামারের দৈনন্দিন কাজ বন্ধ রাখা যাবে না।
লিখিত রাখা
- অংশীদারি চুক্তি ও জমির দলিলের কপি প্রতিটি পরিবারের কাছে।
- সিদ্ধান্তের খাতা: তারিখ, সিদ্ধান্ত, কোন স্তর, কে পক্ষে, কে বিপক্ষে।
- মাসিক হিসাব ও বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন।
- বীজ রেজিস্টার, পশুর টিকার খাতা আর রক্ষণাবেক্ষণের লগ, যাতে দায়িত্ব বদলালেও তথ্য না হারায়।
এই পাতার নিয়মগুলো অংশীদারি চুক্তিতে কীভাবে লেখা হবে, আর সালিশের ধারা আইনত কতটা কার্যকর, তা আইনজীবীর সাথে নিশ্চিত করতে হবে।