জমি ও অবস্থান নির্বাচন
খামারের সাফল্যের অর্ধেক নির্ভর করে সঠিক জমি বাছাইয়ের ওপর। ভুল জমি পরে কোনো পরিশ্রমেই পুরোপুরি শোধরানো যায় না।
কতটুকু জমি
বিঘার মাপ সারা দেশে এক নয়; কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় বিঘা ৩৩ শতাংশের চেয়ে কম বা বেশি ধরা হয়। তাই দরদাম করার সময় সবসময় শতাংশ বা বর্গফুটে কথা বলুন, আর দলিলে শতাংশেই পরিমাণ লেখা আছে কি না দেখুন। মসজিদের ওয়াকফ প্লটের জন্য এর বাইরে আলাদা কিছু জমি লাগবে, যা রাস্তার ধারে হলে ভালো।
বাছাইয়ের মাপকাঠি
১. দূরত্ব ও যাতায়াত
শহর থেকে গাড়িতে বিশ মিনিটের বেশি নয়, যাতে পরিবারগুলো সপ্তাহে কয়েকবার যেতে পারে আর জরুরি চিকিৎসা হাতের কাছে থাকে। রাস্তাটি বর্ষাতেও চলাচলযোগ্য কি না, সেটি বর্ষাকালে নিজে গিয়ে দেখুন। ট্রাক বা পিকআপ খামারের ফটক পর্যন্ত ঢুকতে পারা জরুরি, কারণ নির্মাণসামগ্রী, পশু আর খড় আনতে হবে।
২. বন্যা ও জমির উচ্চতা
জমি যেন আশপাশের সাধারণ বন্যার পানির চেয়ে উঁচু হয়। স্থানীয় প্রবীণদের জিজ্ঞেস করুন গত কয়েকটি বড় বন্যায় পানি কতটা উঠেছিল। পুরোপুরি নিচু জমি হলে বসতঘর, সীড ব্যাংক, গোয়াল আর ব্যাটারি ঘরের ভিটা উঁচু করতে বাড়তি মাটি লাগবে; পুকুর খননের মাটি দিয়ে সেটা কিছুটা করা যায়।
৩. মাটি
ধান, সবজি আর ঘাস তিনটির জন্যই দোআঁশ বা এঁটেল-দোআঁশ মাটি ভালো। খুব বেলে মাটিতে পানি ধরে না, আর পুকুরের পাড় টেকে না। জেলার মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) গবেষণাগারে মাটি পরীক্ষা করালে পিএইচ, জৈব পদার্থ আর পুষ্টির অবস্থা জানা যাবে। আগের মালিক কী ধরনের চাষ করতেন আর কত রাসায়নিক দিতেন, সেটাও জেনে নিন; পুরোপুরি জৈব হতে মাটির কয়েক মৌসুম সময় লাগতে পারে।
৪. পানি
নলকূপের পানির স্তর কত গভীরে, শুকনো মৌসুমে কতটা নেমে যায়, আর পানিতে আর্সেনিক বা অতিরিক্ত আয়রন আছে কি না, জমি কেনার আগে জানা অত্যন্ত জরুরি। আশপাশের নলকূপের পানি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) গবেষণাগারে বা স্বীকৃত ল্যাবে পরীক্ষা করান। পুকুরে বর্ষার পানি ধরে রাখা যাবে কি না, তাও মাটির ধরন দেখে বোঝা যায়।
৫. আকার ও সূর্যের আলো
চৌকো বা আয়তাকার জমিতে দেয়াল কম লাগে, নকশাও সহজ হয়। লম্বা সরু ফালি জমিতে দেয়ালের খরচ অনেক বাড়ে। জমির দক্ষিণ দিকে উঁচু ভবন বা ঘন বাগান থাকলে সোলার প্যানেলে ছায়া পড়বে, এটা খেয়াল রাখুন।
৬. প্রতিবেশী জমি
পাশে ইটভাটা, কারখানা, পোলট্রি ফার্ম বা ভারী কীটনাশক দেওয়া বাণিজ্যিক সবজি খেত থাকলে জৈব খামারের জন্য তা বড় সমস্যা। ধোঁয়া, দুর্গন্ধ, দূষিত পানি আর বাতাসে ভেসে আসা কীটনাশক আমাদের ফসলে পড়বে। একইভাবে পাশের জমির পানি নিষ্কাশন আমাদের জমি দিয়ে যায় কি না দেখুন।
৭. নিরাপত্তা ও সমাজ
এলাকার মানুষের সাথে কথা বলুন। জমি নিয়ে পুরোনো বিবাদ আছে কি না, এলাকা কতটা নিরাপদ, কাছাকাছি কাজের লোক পাওয়া যায় কি না, এসব জানা দরকার। কাছে মসজিদ, বাজার, পশু হাসপাতাল আর উপজেলা কৃষি অফিস থাকলে সুবিধা।
জমি যাচাইয়ের স্কোরকার্ড
প্রতিটি সম্ভাব্য জমি দেখতে গিয়ে এই তালিকা পূরণ করুন। প্রতিটি বিষয়ের পাশে গুরুত্ব অনুযায়ী নম্বর দেওয়া আছে। নিচের মিটার মোট নম্বর দেখাবে। কয়েকটি জমি তুলনা করার সময় একই তালিকা ব্যবহার করুন।
আইনি কাগজ আর আর্সেনিক পরীক্ষা, এই দুটি “না” হলে বাকি নম্বর যত বেশিই হোক, জমিটি বাদ দেওয়াই নিরাপদ।
কাগজপত্র যাচাই
বাংলাদেশে জমি কেনায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কাগজের জটিলতা। নিচের প্রতিটি ধাপ একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী ও সার্ভেয়ারের সাহায্যে করুন।
- বিক্রেতার মালিকানার দলিল আর তার আগের দলিলগুলোর ধারাবাহিকতা (বায়া দলিল)।
- সিএস, এসএ, আরএস ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিএস খতিয়ানে মালিকের নাম ও দাগ নম্বর মেলানো।
- নামজারি (মিউটেশন) হালনাগাদ আছে কি না, আর ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রসিদ।
- মৌজা ম্যাপে দাগের অবস্থান, আর সার্ভেয়ার দিয়ে মাঠে সীমানা মাপা।
- জমি নিয়ে কোনো মামলা, বন্ধক বা ঋণ আছে কি না, ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ।
- উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি হলে সব ওয়ারিশের সম্মতি ও বণ্টননামা।
- কৃষিজমিতে পুকুর খনন বা স্থাপনা নির্মাণে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি লাগবে কি না।
খতিয়ানের ধরন, নামজারির প্রক্রিয়া, রেজিস্ট্রি খরচ আর কৃষিজমি ব্যবহারের নিয়ম সময়ের সাথে বদলায়। উপজেলা ভূমি অফিস ও আইনজীবীর কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন।
সরেজমিন পরিদর্শনের পরামর্শ
- একই জমি অন্তত দুবার দেখুন: একবার শুকনো মৌসুমে, একবার ভরা বর্ষায়।
- সকালে আর বিকেলে গিয়ে দেখুন কোথায় ছায়া পড়ে।
- জমির মাটি কয়েক জায়গা থেকে খুঁড়ে দেখুন, আর নমুনা পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসুন।
- পাশের জমির মালিক, ইমাম সাহেব আর স্থানীয় দোকানদারের সাথে কথা বলুন।
- ফোনের জিপিএস দিয়ে চার কোণার অবস্থান রেকর্ড করুন, যাতে পরে নকশা করা যায়।
জমি চূড়ান্ত হলে লেআউট মাস্টারপ্ল্যান জমির আসল আকার অনুযায়ী নতুন করে সাজানো হবে।