কম্পোস্ট
খামারের প্রতিটি ঝরা পাতা, খড়ের টুকরো আর সবজির খোসা মাটির খাবার। ঠিকমতো স্তূপ করলে কয়েক মাসে তা কালো, ঝুরঝুরে, মাটির গন্ধওয়ালা কম্পোস্ট হয়ে যায়, যা রাসায়নিক সারের চেয়ে মাটির জন্য অনেক বেশি উপকারী।
কম্পোস্ট কী
জৈব উপাদান বাতাসের উপস্থিতিতে অণুজীব, ছত্রাক আর ছোট প্রাণীর মাধ্যমে পচে যে স্থির, পুষ্টিসমৃদ্ধ পদার্থ হয়, সেটাই কম্পোস্ট। কাঁচা গোবর সরাসরি জমিতে দিলে গাছের শিকড় পুড়তে পারে, আগাছার বীজ ছড়ায়, আর পুষ্টির বড় অংশ বাতাসে বা পানিতে হারিয়ে যায়। কম্পোস্ট করলে এই সমস্যাগুলো কমে, আর তৈরি সার মাটির গঠন উন্নত করে, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ায়।
দুই ধরনের উপাদান
বাদামি (কার্বন বেশি)
- শুকনো খড় ও নাড়া
- ঝরা শুকনো পাতা
- ভুট্টা বা সরিষার শুকনো কাণ্ড
- কাঠের গুঁড়া, ছেঁড়া কাগজ (অল্প)
স্তূপকে বাতাস দেয়, ধীরে পচে, গন্ধ কমায়।
সবুজ (নাইট্রোজেন বেশি)
- গোবর ও বায়োগ্যাস স্লারি
- হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা
- কাঁচা ঘাস, আগাছা (বীজ আসার আগে)
- সবজির খোসা ও রান্নাঘরের বর্জ্য
দ্রুত পচে, স্তূপকে গরম করে।
দেওয়া যাবে না: মাছ-মাংসের হাড় ও চর্বি (ইঁদুর-কুকুর টানে), রোগাক্রান্ত গাছ (আলাদা গভীর গর্তে), বীজসহ আগাছা, প্লাস্টিক, রাসায়নিক মেশানো কিছু।
মিশ্রণের হিসাব যন্ত্র
ভালো কম্পোস্টে কার্বন আর নাইট্রোজেনের অনুপাত মোটামুটি ২৫ থেকে ৩৫ ভাগ কার্বনে এক ভাগ নাইট্রোজেন। নিচে আপনার হাতে থাকা উপাদানের আনুমানিক ওজন বসান; যন্ত্র দেখাবে মিশ্রণ ঠিক আছে কি না। প্রতিটি উপাদানের অনুপাত প্রচলিত গড় হিসাবে ধরা, আর্দ্রতা ও মানভেদে বাস্তবে কম-বেশি হয়।
স্তূপ পদ্ধতি
- ছায়াযুক্ত, উঁচু, পানি জমে না এমন জায়গা; আমাদের নকশায় গোয়াল আর বায়োগ্যাসের পাশে কম্পোস্টের জায়গা।
- নিচে ডাল-পালা বা শক্ত খড়ের একটি স্তর, যাতে নিচ দিয়ে বাতাস চলে।
- তারপর পালাক্রমে বাদামি আর সবুজ স্তর, প্রতিটি কয়েক আঙুল পুরু; মাঝে মাঝে সামান্য পুরোনো কম্পোস্ট বা মাটি, যাতে অণুজীব আসে।
- প্রতিটি স্তর হালকা ভিজিয়ে দেওয়া: চিপলে দুই-এক ফোঁটা পানি বের হবে, এর বেশি নয়।
- প্রায় এক থেকে দেড় মিটার উঁচু হলে ওপরে খড় বা চটের ঢাকনা, বৃষ্টি থেকে রক্ষায় ছাউনি।
- কয়েক দিনেই ভেতর গরম হবে; প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে স্তূপ উল্টে দেওয়া, যাতে বাতাস ঢোকে আর সব অংশ সমানভাবে পচে।
- প্রায় দুই থেকে চার মাসে, মৌসুম অনুযায়ী, কম্পোস্ট কালো, ঝুরঝুরে আর মাটির গন্ধযুক্ত হবে।
গর্ত পদ্ধতি
শুকনো মৌসুমে আর্দ্রতা ধরে রাখতে গর্ত পদ্ধতি ভালো। প্রায় এক মিটার গভীর, দেড়-দুই মিটার লম্বা গর্ত; চারপাশে মাটির আইল যাতে বৃষ্টির পানি না ঢোকে। একই নিয়মে স্তরে স্তরে ভরা, ওপরে মাটি বা গোবরের প্রলেপ। বর্ষায় গর্তে পানি জমার ঝুঁকি থাকলে স্তূপ পদ্ধতি ভালো। দুই-তিনটি গর্ত পালাক্রমে ব্যবহার করলে সারা বছর কম্পোস্ট পাওয়া যায়।
স্লারি দিয়ে দ্রুত কম্পোস্ট
বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের স্লারি কম্পোস্টের জন্য চমৎকার সবুজ উপাদান: এতে অণুজীব সক্রিয় থাকে, তাই খড় ও পাতা দ্রুত পচে। খড়ের প্রতিটি স্তরে স্লারি ঢেলে দিলে কয়েক সপ্তাহ আগে কম্পোস্ট তৈরি হয়। বিস্তারিত বায়োগ্যাস স্লারি সার পাতায়।
সমস্যা ও সমাধান
| লক্ষণ | কারণ | সমাধান |
|---|---|---|
| পচা ডিম বা অ্যামোনিয়ার গন্ধ | সবুজ বেশি, পানি বেশি, বাতাস কম | খড়-পাতা মেশানো, উল্টে দেওয়া |
| গরম হচ্ছে না, পচছে না | বাদামি বেশি বা খুব শুকনো | গোবর বা স্লারি মেশানো, পানি দেওয়া |
| শুধু মাঝখানে পচেছে | স্তূপ ছোট বা উল্টানো হয়নি | বাইরের অংশ ভেতরে দিয়ে উল্টানো |
| মাছি ও পোকা | রান্নাঘরের বর্জ্য খোলা | বর্জ্য স্তূপের ভেতরে পুঁতে খড়ে ঢাকা |
প্রয়োগ
সবজির বেড তৈরির সময়, ধানের শেষ চাষে, ফলগাছের গর্তে আর বর্ষার শুরু-শেষে গাছের গোড়ায়। সাধারণভাবে প্রতি শতাংশ জমিতে কয়েক ঝুড়ি থেকে কয়েক মণ পর্যন্ত, ফসল ও মাটির অবস্থা অনুযায়ী; বার্ষিক মাটি পরীক্ষা দেখে পরিমাণ ঠিক করা হবে। কম্পোস্ট বেশি হলে সাধারণত ক্ষতি নেই, তবে আধপচা কম্পোস্ট চারার গোড়ায় দেওয়া যাবে না।