জৈব কীটনাশক
জৈব খামারে পোকা থাকবেই; লক্ষ্য তাদের নির্মূল নয়, ক্ষতির সীমার নিচে রাখা। প্রথমে প্রতিরোধ, তারপর ফাঁদ ও হাতে দমন, আর শেষ উপায় হিসেবে ঘরে তৈরি জৈব দ্রবণ।
চার ধাপের নীতি
- প্রতিরোধ: সুস্থ বীজ, সঠিক সময়ে বোনা, সঠিক দূরত্ব, শস্য পর্যায়, সাথী ফসল, আর সুস্থ মাটি।
- পর্যবেক্ষণ: সপ্তাহে অন্তত দুবার মাঠে ঘুরে পাতার ওপর-নিচ, ডগা আর ফল দেখা; কোন পোকা, কতটা, খাতায় লেখা।
- উপকারী প্রাণী রক্ষা: মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল, বোলতা, ব্যাঙ, পাখি আর হাঁস অনেক পোকা খায়। মাঠের পাশে ফুলের গাছ আর পাখি বসার ডাল।
- দমন: হাতে তোলা, ফাঁদ, তারপর প্রয়োজনে নিচের জৈব দ্রবণ, সবচেয়ে মৃদুটি আগে।
তামাক পাতার পানি পুরোনো প্রচলিত পদ্ধতি হলেও আমরা ব্যবহার করব না: নিকোটিন মানুষ, মৌমাছি আর উপকারী পোকার জন্যও বিষাক্ত। একইভাবে “জৈব” নামে বিক্রি হওয়া কোনো তৈরি পণ্য কেনার আগে উপাদান যাচাই করা হবে।
ঘরে তৈরি দ্রবণ
নিম পাতার নির্যাস
- উপাদান
- প্রায় এক কেজি তাজা নিম পাতা, দশ লিটার পানি, সামান্য সাধারণ সাবান
- প্রস্তুতি
- পাতা বেটে বা কুচি করে এক রাত পানিতে ভিজিয়ে, অথবা কিছুক্ষণ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে নেওয়া; সাবান মেশালে পাতায় লেগে থাকে
- কিসে
- জাব পোকা, সাদা মাছি, ছোট শুঁয়োপোকা, পাতা খাওয়া পোকা
- কখন
- বিকেলে, পাতার নিচসহ; সাত-দশ দিন পরপর
নিম বীজের দ্রবণ
- উপাদান
- শুকনো নিম ফলের শাঁস গুঁড়া, প্রতি লিটার পানিতে প্রায় ৫০ গ্রাম
- প্রস্তুতি
- গুঁড়া কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে এক রাত পানিতে ভিজিয়ে চিপে ছেঁকে নেওয়া
- কিসে
- শুঁয়োপোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়া, পাতা মোড়ানো পোকা; নিমপাতার চেয়ে কড়া
- কখন
- আক্রমণের শুরুতে, বিকেলে
ছাই
- উপাদান
- চুলার শুকনো কাঠের ছাই, চালুনিতে ছাঁকা
- প্রস্তুতি
- সরাসরি ব্যবহার
- কিসে
- লাল পামকিন বিটল, জাব পোকা, করাতি মাছি
- কখন
- ভোরে শিশির থাকতে পাতায় হালকা ছিটানো; বেশি দিলে মাটি ক্ষারীয় হয়
সাবান-পানি
- উপাদান
- সুগন্ধিহীন সাধারণ কাপড় কাচার বা গোসলের সাবান, প্রতি লিটারে ৫–১০ গ্রাম; ডিটারজেন্ট নয়
- প্রস্তুতি
- গরম পানিতে গলিয়ে ঠান্ডা করা
- কিসে
- জাব পোকা, ছাতরা পোকা, সাদা মাছি; পোকার গায়ে সরাসরি লাগতে হবে
- কখন
- বিকেলে; আগে কয়েকটি পাতায় পরীক্ষা
রসুন-মরিচের দ্রবণ
- উপাদান
- প্রায় ১০০ গ্রাম রসুন, ৫০ গ্রাম কাঁচা মরিচ, এক লিটার পানি
- প্রস্তুতি
- বেটে এক রাত ভিজিয়ে ছেঁকে, দশ গুণ পানি ও সামান্য সাবান মিশিয়ে
- কিসে
- বিভিন্ন পোকা তাড়াতে; মারে কম, দূরে রাখে বেশি
- সতর্কতা
- চোখ ও ত্বকে জ্বালা করে; দস্তানা ও চশমা
দুধ-পানি
- উপাদান
- এক ভাগ দুধ, নয় ভাগ পানি
- প্রস্তুতি
- মিশিয়ে সাথে সাথে ব্যবহার
- কিসে
- কুমড়াজাতীয় ফসলের পাউডারি মিলডিউ
- কখন
- রোদেলা সকালে, সপ্তাহে একবার
ফাঁদ
| ফাঁদ | কোন পোকা | কীভাবে |
|---|---|---|
| ফেরোমন ফাঁদ | বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা; কুমড়াজাতীয় ফসলের মাছি পোকা | পোকার প্রজাতি অনুযায়ী আলাদা লিউর; পানিভরা পাত্রে ঝুলিয়ে মাঠে কয়েক মিটার পরপর; লিউর নির্দেশনা মতো বদল |
| আলোর ফাঁদ | ধানের মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকা, নানা মথ | সন্ধ্যায় এক-দুই ঘণ্টা সৌর বাতি, নিচে সামান্য সাবান মেশানো পানির গামলা; সারারাত নয়, যাতে উপকারী পোকা কম মরে |
| হলুদ আঠালো ফাঁদ | সাদা মাছি, জাব পোকা, পাতার সুড়ঙ্গকারী পোকা | হলুদ রঙের টিন বা কার্ডে রেড়ির তেল বা আঠা মাখিয়ে গাছের উচ্চতায় |
| মিষ্টিকুমড়ার টোপ | ফলের মাছি | থেঁতো পাকা কুমড়া পানিভরা পাত্রে; বিষ মেশানো হবে না, মাছি পানিতে ডুবে মরে |
ট্রাইকোডার্মা মেশানো কম্পোস্ট
ট্রাইকোডার্মা একটি উপকারী ছত্রাক, যা মাটিবাহিত ক্ষতিকর ছত্রাকের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের দমন করে। বেগুন-টমেটোর ঢলে পড়া, চারার গোড়া পচা আর আদা-হলুদের কন্দ পচা প্রতিরোধে বীজতলা ও মাদায় ট্রাইকোডার্মা মেশানো কম্পোস্ট ব্যবহার করা যায়। এর উৎস ও ব্যবহারবিধি উপজেলা কৃষি অফিসের সাথে যাচাই করে নিতে হবে; কম্পোস্টে মিশিয়ে কয়েক দিন ছায়ায় রেখে তারপর মাটিতে দেওয়া।
নিরাপত্তা
- জৈব হলেও সব দ্রবণ তৈরি ও ছিটানোর সময় দস্তানা, মাস্ক ও চশমা; শিশুরা দূরে।
- দিনের বেলা ফুল ফোটা গাছে ছিটানো নয়, মৌমাছির ক্ষতি হয়; বিকেলে ছিটানো।
- নতুন দ্রবণ আগে কয়েকটি পাতায় পরীক্ষা, এক দিন পর পাতা পুড়েছে কি না দেখা।
- ছিটানোর পর তোলার আগে কয়েক দিন বিরতি; সবজি ভালো করে ধুয়ে রান্না।
- প্রতিটি বোতলে নাম ও তারিখ; খাবারের পাত্রে নয়, শিশুর নাগালের বাইরে।
- পুকুরের কাছে বা পানিতে কোনো দ্রবণ ফেলা যাবে না।
প্রতিটি ফসলের নির্দিষ্ট রোগ-পোকা আর তার জৈব প্রতিকার সেই ফসলের বীজের পাতায় আলাদা টেবিলে।