বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট
গোয়ালঘরের গোবর পানিতে মিশিয়ে মাটির নিচের বাতাসহীন গম্বুজে রাখলে কয়েক সপ্তাহে তা পচে তৈরি হয় রান্নার গ্যাস। আর যা বাকি থাকে, সেই স্লারি হয়ে ওঠে উৎকৃষ্ট সার।
কয়টি গরুতে কত গ্যাস
হিসাবের ভিত্তি: প্রতি কেজি তাজা গোবর থেকে আনুমানিক ০.০৩৫–০.০৪ ঘনমিটার গ্যাস (এখানে ০.০৩৬ ধরা); গোবর ও পানি সমান অনুপাতে; প্ল্যান্টে মিশ্রণ গড়ে প্রায় ৪০ দিন থাকে; একটি সাধারণ চুলা ঘণ্টায় প্রায় ০.৩৫ ঘনমিটার গ্যাস পোড়ায়। দেশি গরুর গোবরের পরিমাণ খাবার ও আকারভেদে অনেক কম-বেশি হয়, তাই প্রথম কয়েক সপ্তাহ গোবর মেপে দেখা ভালো।
কীভাবে কাজ করে
- ইনলেট ট্যাংক: গোয়ালের পাশে ছোট পাকা ট্যাংকে গোবর আর সমান পরিমাণ পানি মিশিয়ে ঘন স্যুপের মতো করা হয়; খড়, বালি, পাথর বেছে ফেলা হয়।
- ডাইজেস্টার: মিশ্রণ পাইপ দিয়ে মাটির নিচের গোলাকার কক্ষে যায়। বাতাস না থাকায় সেখানে জীবাণুরা গোবর ভেঙে গ্যাস তৈরি করে।
- গম্বুজ: গ্যাস ওপরের পাকা গম্বুজে জমে, আর চাপ তৈরি করে।
- আউটলেট ও স্লারি পিট: নতুন মিশ্রণ ঢুকলে সমান পরিমাণ পচা স্লারি অন্য দিক দিয়ে বের হয়ে স্লারি পিটে জমে।
- গ্যাসের লাইন: গম্বুজের ওপরের ভালভ থেকে পাইপ রান্নাঘরে যায়। পাইপের নিচু জায়গায় পানি জমার ফাঁদ (ওয়াটার ট্র্যাপ) থাকে, যা মাঝে মাঝে খালি করতে হয়।
নকশা ও অবস্থান
বাংলাদেশে পারিবারিক বায়োগ্যাসের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত হলো ইটের তৈরি স্থির গম্বুজ প্ল্যান্ট, যা মাটির নিচে থাকে, নড়াচড়ার অংশ নেই, আর ঠিকমতো বানালে বহু বছর চলে। আমাদের নকশায় প্ল্যান্টটি গোয়ালঘরের ঠিক পাশে, যাতে গোবর বয়ে নিতে না হয়; স্লারি পিট থেকে নালা দিয়ে স্লারি ঘাসের প্লট আর কম্পোস্টের দিকে যায়। রান্নাঘর পর্যন্ত পাইপের দৈর্ঘ্য যত কম, চাপ তত ভালো থাকে।
- সাধারণ বন্যার পানির ওপরে, যাতে ডাইজেস্টারে পানি না ঢোকে।
- বড় গাছের শিকড় থেকে দূরে, যাতে দেয়ালে ফাটল না ধরে।
- নলকূপ থেকে নিরাপদ দূরত্বে, যাতে স্লারি চুইয়ে খাওয়ার পানিতে না যায়।
- রোদ পড়ে এমন জায়গায়; মাটি গরম থাকলে গ্যাস বেশি হয়।
প্ল্যান্টের মাপ, গাঁথুনি আর গম্বুজের নির্মাণ প্রশিক্ষিত বায়োগ্যাস নির্মাতা দিয়ে করাতে হবে। দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে পারিবারিক বায়োগ্যাস কর্মসূচি চলেছে; বর্তমানে কোন সংস্থা প্রশিক্ষিত নির্মাতা বা সহায়তা দেয়, উপজেলা প্রাণিসম্পদ বা পল্লী উন্নয়ন দপ্তরে খোঁজ নিন।
প্রতিদিনের কাজ
- সকালে গোয়াল থেকে গোবর সংগ্রহ, খড় ও মাটি বেছে আলাদা।
- ইনলেটে সমান পানি দিয়ে ভালো করে মেশানো, তারপর ঢালা। প্রতিদিন প্রায় একই পরিমাণ।
- গ্যাসের চাপ মিটার বা চুলার শিখা দেখে খাতায় নোট।
- স্লারি পিট উপচে পড়ছে কি না দেখা।
- সপ্তাহে একবার ওয়াটার ট্র্যাপ খালি করা, আর পাইপের জোড়ায় সাবান-পানি দিয়ে ফুটো পরীক্ষা।
যা দেওয়া যাবে না
- সাবান, ডিটারজেন্ট, ফিনাইল বা রাসায়নিক মেশানো পানি: জীবাণু মরে যায়, গ্যাস বন্ধ হয়।
- বেশি পরিমাণে শক্ত খড়, ঘাস বা বালি: ভেতরে জমে স্তর তৈরি করে।
- অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার সময়ের গোবর বেশি পরিমাণে: কিছুদিন কম দেওয়া নিরাপদ।
- প্লাস্টিক বা অপচনশীল কিছু।
শুরুর সময়
নতুন প্ল্যান্ট প্রথমবার পূর্ণ করতে অনেক গোবর লাগে; কয়েক সপ্তাহ ধরে জমিয়ে ভরা হয়। প্রথম গ্যাস আসতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, আর প্রথম দিকের গ্যাসে বাতাস মিশে থাকে বলে তা ভালো জ্বলে না; তাই প্রথম কয়েকবারের গ্যাস খোলা জায়গায় ছেড়ে দিতে হয়। গরমকালে শুরু করলে প্ল্যান্ট দ্রুত সক্রিয় হয়।
শীতে গ্যাস কম কেন
পৌষ-মাঘে মাটি ঠান্ডা থাকে, জীবাণুর কাজ ধীর হয়, তাই গ্যাস কমে। তখন রান্নার সময় একটু পরিকল্পনা করে চলতে হয়: ভাত ও ডাল একসাথে চাপা, প্রেশার কুকার ব্যবহার, চুলার আশপাশে বাতাস আটকানো। গম্বুজের ওপর মাটি বা খড়ের আবরণও কিছুটা উষ্ণতা ধরে রাখে।
নিরাপত্তা
- কখনো আগুন দিয়ে লিক পরীক্ষা নয়; শুধু সাবান-পানি।
- রান্নাঘরে বাতাস চলাচল; গ্যাসের গন্ধ পেলে চুলা ও ভালভ বন্ধ, দরজা-জানালা খোলা।
- স্লারি পিট ও ইনলেট ট্যাংকের ওপর মজবুত ঢাকনা বা বেড়া; শিশু বা ছাগলছানা পড়ে গেলে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
- ডাইজেস্টারের ভেতরে কেউ নামবে না; মেরামত শুধু প্রশিক্ষিত নির্মাতা, পুরো গ্যাস বের করে আর বাতাস ঢুকিয়ে।
স্লারি কীভাবে সার হিসেবে ব্যবহার হবে, তা বায়োগ্যাস স্লারি সার পাতায়।