সোলার পাম্প ও সেচ
খামারের পানির দুই উৎস: খাওয়া ও ঘরের কাজের জন্য নলকূপ, আর সেচের জন্য পুকুর। দুই ক্ষেত্রেই নিয়ম একটাই: পানি তোলা হবে দিনের রোদে, ব্যবহার হবে যখন দরকার।
পানির ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে
- নলকূপ: আর্সেনিকমুক্ত স্তর পর্যন্ত পাইপ বসানো নলকূপ। পানি পরীক্ষা না করে কোনো নলকূপের পানি খাওয়া হবে না।
- সোলার পাম্প: দুপুরে সৌর বিদ্যুতে পাম্প চলে, নলকূপ থেকে পানি তোলে।
- উঁচু ট্যাংক: প্রায় ছয় মিটার উঁচু স্ট্যান্ডে মোট প্রায় ৫,০০০ লিটারের ট্যাংক (এক বা একাধিক)।
- মাধ্যাকর্ষণে বিতরণ: ট্যাংক থেকে পাইপে বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়াল, মুরগির ঘর আর সবজির ড্রিপ লাইনে পানি যায়; রাতে পাম্প চালাতে হয় না।
- হাতের নলকূপ: রান্নাঘরের পাশে একটি হস্তচালিত নলকূপ, যাতে পাম্প বা সৌর ব্যবস্থায় সমস্যা হলেও খাওয়ার পানি বন্ধ না হয়।
কোন ধরনের পাম্প
প্রধান ব্যবস্থা থেকে চালিত পাম্প
সাধারণ এসি পাম্প, খামারের ইনভার্টার থেকে দুপুরে চলে। আলাদা প্যানেল লাগে না, তবে চালানোর সময় অন্য ভারী যন্ত্র বন্ধ রাখতে হয়। প্রথম পর্যায়ে এটাই প্রস্তাবিত।
নিজস্ব প্যানেলের সোলার পাম্প
ডিসি সাবমার্সিবল বা সারফেস পাম্প, নিজস্ব দু-তিনটি প্যানেল থেকে সরাসরি চলে, ব্যাটারি ছাড়াই। রোদ থাকলে পানি ওঠে, না থাকলে থামে। মূল ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে; দ্বিতীয় পর্যায়ে বিবেচনা।
পাম্পের ক্ষমতা নির্ভর করে পানির স্তর কত গভীরে আর ট্যাংক কত উঁচুতে, তার ওপর। মোটামুটি দেড় অশ্বশক্তির কাছাকাছি একটি পাম্প দুপুরে দুই-আড়াই ঘণ্টায় ট্যাংক ভরতে পারার কথা, তবে চূড়ান্ত মাপ নলকূপের গভীরতা দেখে মিস্ত্রি বা প্রকৌশলী ঠিক করবেন।
কত পানি লাগে
নিচের হিসাব পরিকল্পনার জন্য আনুমানিক; প্রথম বছরের খাতা থেকে নিজেদের প্রকৃত ব্যবহার বের করা হবে।
| ব্যবহার | ধরে নেওয়া | দৈনিক (আনুমানিক) | উৎস |
|---|---|---|---|
| ঘরের কাজ ও রান্না | খামারে থাকা মানুষ প্রতি দিনে কয়েক বালতি | ৫০০–৮০০ লিটার | ট্যাংক |
| গরু | প্রতিটি দিনে কয়েক বালতি, গরমে বেশি | ২০০–৩৫০ লিটার | ট্যাংক |
| ছাগল, মুরগি, পরিষ্কার | গোয়াল ধোয়া ও পাখির পানি | ২০০–৪০০ লিটার | ট্যাংক |
| সবজির বেড | শুকনো মৌসুমে, ড্রিপ ও ঝাঁঝরি | কয়েক হাজার লিটার | পুকুর, কিছুটা ট্যাংক |
| বোরো ধান | শুকনো মৌসুমে নিয়মিত সেচ | সবচেয়ে বেশি | পুকুর |
অর্থাৎ ট্যাংকের পানি মূলত ঘর ও পশুর জন্য। জমির সেচ যথাসম্ভব পুকুর থেকে, যাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কম পড়ে।
পুকুর থেকে সেচ
- ছোট লো-লিফট পাম্প: দুপুরে বহনযোগ্য পাম্প দিয়ে পুকুর থেকে নালা বা পাইপে সবজি ও ধানক্ষেতে।
- ড্রিপ সেচ: সবজির বেডে উঁচু ট্যাংক বা ছোট ড্রামের মাধ্যাকর্ষণে চলা ড্রিপ লাইন; পানি সরাসরি শিকড়ে যায়, অপচয় কম।
- মালচিং: বেডে খড় বা শুকনো পাতার আবরণ; মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, সেচ কম লাগে।
- বোরোতে পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো: ধানক্ষেত সবসময় ডুবিয়ে না রেখে পানি কিছুটা নামতে দেওয়া, তারপর আবার সেচ। এতে পানি সাশ্রয় হয়, আর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটও এই পদ্ধতি সুপারিশ করে।
- সকাল বা বিকেলে পানি: দুপুরের রোদে বেডে পানি দিলে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়; পাম্প দুপুরে চালিয়ে ড্রামে রাখা, আর বিকেলে দেওয়া।
পুকুরের পানির স্তর
শুকনো মৌসুমের শেষে, চৈত্র-বৈশাখে, পুকুরের পানি সবচেয়ে কম থাকে। তখন সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি তুললে মাছের কষ্ট হয়। তাই পুকুরে একটি মাপকাঠি পোঁতা থাকবে; পানি নির্দিষ্ট দাগের নিচে নামলে সেচ বন্ধ, আর তখন বোরো এলাকা ছোট রাখার সিদ্ধান্ত। প্রয়োজনে নলকূপ থেকে পুকুরে কিছু পানি দেওয়া যায়। বিস্তারিত পানির গুণমান পাতায়।
রক্ষণাবেক্ষণ
- ট্যাংক বছরে অন্তত দুবার পরিষ্কার; ঢাকনা সবসময় বন্ধ, যাতে মশা বা পাখি না ঢোকে।
- পাম্পের শব্দ, কম্পন বা পানির প্রবাহ কমে গেলে খাতায় লেখা ও মিস্ত্রি ডাকা।
- ড্রিপ লাইনের ফিল্টার মাসে একবার ধোয়া; আয়রন বেশি হলে নজল বন্ধ হয়ে যায়।
- নলকূপের পানি বছরে একবার পরীক্ষা।
সেচের জন্য নলকূপ স্থাপনে উপজেলা পর্যায়ের সেচ কমিটির অনুমতি বা লাইসেন্স লাগতে পারে, আর এলাকাভেদে নলকূপের গভীরতা ও দূরত্বের নিয়ম আছে। নলকূপ বসানোর আগে উপজেলা কৃষি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের সাথে নিশ্চিত হয়ে নিন।