মাছ ও পুকুর

পানির গুণমান

মাছের স্বাস্থ্য মানেই পানির স্বাস্থ্য। দামি ওষুধ নয়, প্রতিদিন পানির রং দেখা, মাসে একবার পিএইচ মাপা আর সময়মতো চুন দেওয়াই রোগ প্রতিরোধের মূল উপায়।

পানি দেখে পরামর্শ

—সামগ্রিক অবস্থা

    এটি সাধারণ নির্দেশনা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শের বিকল্প নয়। হঠাৎ অনেক মাছ মরলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে দ্রুত জানান।

    কী কী দেখতে হবে

    পানির গুণমানের প্রধান মাপকাঠি
    মাপকাঠিভালো সীমা (মোটামুটি)কীভাবে মাপবেন
    পিএইচপ্রায় ৭–৮.৫পিএইচ কাগজ বা ছোট পরীক্ষার কিট, মাসে একবার, সকালে
    স্বচ্ছতাপ্রায় ২৫–৪০ সেমিঘরে তৈরি সাদা-কালো চাকতি (সেকি ডিস্ক) লাঠিতে বেঁধে পানিতে নামিয়ে যে গভীরতায় অদৃশ্য হয়
    রংহালকা সবুজ বা সবুজাভ-বাদামিচোখে দেখে, প্রতিদিন
    দ্রবীভূত অক্সিজেনযথেষ্ট; ভোরে মাছ ওপরে খাবি খেলে কমভোরে মাছের আচরণ দেখে; সম্ভব হলে কিট
    তাপমাত্রাকার্পের জন্য উষ্ণ পানি ভালো; শীতে বৃদ্ধি ধীরথার্মোমিটার, খাতায় লেখা
    গন্ধকোনো পচা গন্ধ নয়তলার কাদা নাড়ালে পচা ডিমের গন্ধ মানে বিষাক্ত গ্যাস

    সীমাগুলো সাধারণ নির্দেশনা। পানির নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা করাতে উপজেলা মৎস্য অফিস বা মৃত্তিকা ও পানি পরীক্ষাগারের সহায়তা নেওয়া যায়।

    হাতের সহজ পরীক্ষা

    সেকি ডিস্ক না থাকলে: রোদেলা দুপুরে হাত কনুই পর্যন্ত পানিতে ডুবিয়ে দেখুন। হাতের তালু যদি ঝাপসা দেখা যায়, প্ল্যাংকটন ঠিক আছে। একেবারে পরিষ্কার দেখা গেলে খাবার কম; কনুই পর্যন্ত যাওয়ার আগেই তালু হারিয়ে গেলে প্ল্যাংকটন বেশি। এক গ্লাস পানি তুলে আলোর দিকে ধরলে সবুজ কণা দেখা গেলেও বোঝা যায় প্রাকৃতিক খাবার আছে।

    চুন প্রয়োগ

    • পুকুর প্রস্তুতিতে: শুকনো বা আংশিক শুকানো পুকুরের তলায় প্রতি শতাংশে প্রায় ১ কেজি চুন।
    • চলমান অবস্থায়: পিএইচ কমলে বা শীতের আগে প্রতি শতাংশে প্রায় ২০০–২৫০ গ্রাম চুন পানিতে গুলে ঠান্ডা করে সারা পুকুরে ছিটানো।
    • সতর্কতা: কলিচুন পানিতে মেশালে খুব গরম হয় আর ত্বক পোড়ায়; দস্তানা ও চোখের সুরক্ষা, শিশুদের দূরে রাখা। চুন আর জৈব সার একই দিনে নয়, অন্তত এক সপ্তাহ ব্যবধান।

    জৈব সার দিয়ে প্রাকৃতিক খাবার

    পুকুর প্রস্তুতির সময় চুন দেওয়ার এক সপ্তাহ পর প্রতি শতাংশে কয়েক কেজি ভালোভাবে পচা গোবর বা কম্পোস্ট। এরপর পানির রং আর স্বচ্ছতা দেখে সপ্তাহে বা পনেরো দিনে অল্প অল্প। পুরোনো, পচা বায়োগ্যাস স্লারিও দেওয়া যায়, তবে খুব সাবধানে (স্লারির সতর্ক ব্যবহার)। ইউরিয়া বা টিএসপির মতো রাসায়নিক সার ব্যবহার হবে না। হাঁস ছোট পুকুরে নিজেরাই সার দেয়, তাই সেখানে আলাদা সার কম লাগে।

    অক্সিজেন ঘাটতি: জরুরি করণীয়

    1. খাবার ও সার তৎক্ষণাৎ বন্ধ।
    2. নলকূপ থেকে নতুন পানি দেওয়া; পানির ধারা ওপর থেকে ফেললে বাতাস মেশে।
    3. বাঁশ বা দাঁড় দিয়ে পানির ওপরের অংশ পেটানো, কয়েকজন মিলে পানিতে নেমে নাড়ানো।
    4. মরা মাছ দ্রুত তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলা।
    5. পরের কয়েক দিন খাবার কম, আর সার দেওয়ার পরিমাণ নিয়ে পুনর্বিবেচনা।

    মেঘলা, গুমোট, বাতাসহীন দিনে আর রাতে প্ল্যাংকটন অক্সিজেন তৈরি করতে পারে না অথচ খরচ করে, তাই ভোরের দিকে ঘাটতি সবচেয়ে বেশি হয়। এমন দিনে আগেভাগেই সার ও খাবার কমানো ভালো।

    খাতা

    পুকুরের দায়িত্বশীল প্রতি সপ্তাহে রং, স্বচ্ছতা আর মাছের আচরণ, আর মাসে একবার পিএইচ খাতায় লিখবেন। চুন, সার, খাবার আর পোনা ছাড়ার তারিখও একই খাতায়। কয়েক মাসের খাতা দেখলেই বোঝা যায় কোন অভ্যাস পুকুরের জন্য ভালো কাজ করছে।