জৈব খাদ্য
আমাদের মাছের খাবার আসবে খামারের ভেতর থেকেই: ধানের কুঁড়া, সরিষার খৈল, কেঁচো সারের কেঁচো, ক্ষুদিপানা আর রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট। কোনো হরমোন, ওষুধ বা অজানা পিলেট নয়।
প্রাকৃতিক খাবার প্রথম
পুকুরের পানিতে ভাসমান উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণা (প্ল্যাংকটন), তলার জৈব কণা, জলজ পোকা আর শেওলা মিলেই মাছের প্রাকৃতিক খাবার। পরিমিত জৈব সারে এগুলো জন্মায়। কাতলা, মলা আর মৃগেলের মতো মাছ প্রায় পুরোপুরি এর ওপরেই চলে। সম্পূরক খাবার শুধু এর ঘাটতি পূরণ করে; বেশি দিলে খরচও বাড়ে, পানিও নষ্ট হয়।
সম্পূরক খাবারের উপকরণ
| উপকরণ | কোন মাছের জন্য | প্রস্তুতি ও সতর্কতা |
|---|---|---|
| চালের কুঁড়া | রুই, মৃগেল, তেলাপিয়া, ছোট মাছ | খামারের ধান ভাঙানো থেকেই আসে; শুকনো রাখতে হয়, ভেজা কুঁড়ায় ছত্রাক |
| সরিষার খৈল | কার্প মাছ | আগের রাতে পানিতে ভিজিয়ে নরম করা; শুকনো খৈল সরাসরি নয় |
| গমের ভুসি, ভাঙা চালের গুঁড়া | সব মাছ | খাবারের বল জোড়া লাগাতে সাহায্য করে |
| ক্ষুদিপানা | রুই, তেলাপিয়া, কৈ; হাঁসও খায় | আলাদা ছোট গর্ত বা চৌবাচ্চায় পাতলা স্লারি দিয়ে চাষ; দ্রুত বাড়ে, তুলে পুকুরে দেওয়া |
| কেঁচো | শিং, মাগুর, কৈ, গলদা | খামারের কেঁচো সারের হাউজ থেকে; জিওল মাছের সেরা খাবার |
| শামুক | গলদা, মাগুর | ধানক্ষেত ও পাড় থেকে সংগ্রহ, খোল ভেঙে মাংস |
| উইপোকা | সব মাছ, বিশেষ করে জিওল মাছ | ভেজা খড় ভরা মাটির হাঁড়ি উল্টো করে মাটিতে রাখলে কয়েক দিনে উইপোকা জমে |
| রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট | তেলাপিয়া, মাগুর, কৈ | সবজির খোসা, ভাত; ঝাল-তেলমশলাযুক্ত খাবার নয়; মাছ-মাংসের উচ্ছিষ্ট সেদ্ধ করে |
ঘরে তৈরি খাবারের বল
একটি সহজ মিশ্রণ, প্রয়োজনে অনুপাত বদলানো যায়:
- চালের কুঁড়া প্রায় অর্ধেক
- ভেজানো সরিষার খৈল প্রায় এক-তৃতীয়াংশ
- আটা বা ভাঙা চালের গুঁড়া অল্প, জোড়া লাগানোর জন্য
- জিওল মাছ বা গলদার জন্য কুঁচানো কেঁচো, শামুক বা শুঁটকির গুঁড়া অল্প
সব মিশিয়ে অল্প পানি দিয়ে মণ্ড করে ছোট বল বানানো হয়। তাজা দেওয়া যায়, বা রোদে শুকিয়ে কয়েক দিন রাখা যায়। শুকনো বল বায়ুরোধী পাত্রে, যাতে ছত্রাক না ধরে।
কতটুকু খাবার
সাধারণ নিয়ম: পুকুরের মাছের মোট আনুমানিক ওজনের প্রায় ২–৩ শতাংশ প্রতিদিন, গরমে উঁচু দিকে, শীতে অর্ধেক বা কম। মাছের মোট ওজন জানতে মাসে একবার জাল টেনে কয়েকটি মাছ মেপে গড় বের করুন।
খাওয়ানোর নিয়ম
- প্রতিদিন একই সময়ে, একই জায়গায়; মাছ শিখে যায় আর খাবার নষ্ট কম হয়।
- বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো খাবারের ট্রে বা জালের থালা, যাতে দেখা যায় খাবার শেষ হচ্ছে কি না।
- কার্পের জন্য সকালে, জিওল মাছ ও গলদার জন্য সন্ধ্যায়।
- মেঘলা, গুমোট দিনে আর ভোরে মাছ খাবি খেলে খাবার বন্ধ।
- আহরণের কয়েক দিন আগে খাবার কমানো, যাতে মাছে কাদার গন্ধ কম থাকে।
যা ব্যবহার হবে না
- হরমোন মেশানো খাবার বা মনোসেক্স পোনা তৈরির হরমোন।
- অ্যান্টিবায়োটিক বা রোগ প্রতিরোধের নামে ওষুধ মেশানো খাবার।
- উপাদান অজানা বাণিজ্যিক পিলেট খাবার।
- ইউরিয়া, টিএসপির মতো রাসায়নিক সার।
- পচা, ছত্রাক ধরা বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার।
খাবারের সব উপকরণ যতটা সম্ভব খামারের ভেতর থেকে: ধানের কুঁড়া, নিজেদের সরিষার খৈল, কেঁচো সারের কেঁচো, ক্ষুদিপানা আর রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট। এভাবেই মাছ চাষ খামারের বৃত্তাকার ব্যবস্থার অংশ হয়।