দেশি মুরগি
উঠানে চরে বেড়ানো দেশি মুরগি বাংলার সবচেয়ে চেনা প্রাণী। ডিম কম পাড়ে, বাড়ে ধীরে, কিন্তু রোগ সহ্য করে, নিজের খাবার অনেকটা নিজেই খুঁজে নেয়, আর ডিম ও মাংসের স্বাদের তুলনা নেই।
আধা-মুক্ত পদ্ধতি
মুরগি রাতে থাকবে বন্ধ, নিরাপদ ঘরে; দিনে চরবে জাল ঘেরা মাঠে, আর তদারকিতে মাঝে মাঝে সবজি ক্ষেতের ফসল তোলা অংশে বা ফলগাছের নিচে, যেখানে তারা পোকা, শামুক আর আগাছার বীজ খাবে। বাণিজ্যিক খাঁচায় আটকে রাখা হবে না, আবার পুরোপুরি ছেড়েও দেওয়া হবে না, কারণ দিনে বাজপাখি-চিল আর সন্ধ্যায় শিয়াল-বেজির ঝুঁকি আছে। সবজির কচি চারার বেডে মুরগি ঢুকতে দেওয়া যাবে না।
ঘর ও চরার মাঠ
- রাতের ঘর: প্রায় ৬ × ৪ মিটার, পাকা ভিত, মেঝে থেকে একটু উঁচু; প্রতিটি দেশি মুরগির জন্য অন্তত ০.২–০.৩ বর্গমিটার। পঁচিশটি মুরগির জন্য যথেষ্ট জায়গা।
- দাঁড়: মেঝে থেকে আধা-এক মিটার উঁচুতে বাঁশের দাঁড়, যেখানে মুরগি রাতে বসে ঘুমায়।
- ডিমের বাসা: প্রতি চার-পাঁচটি মুরগির জন্য একটি খড় বিছানো ঝুড়ি বা বাক্স, আধো-অন্ধকার কোণে।
- লিটার: মেঝেতে শুকনো তুষ বা কাঠের গুঁড়া; ভিজে গেলে বদলানো, পুরোনো লিটার কম্পোস্টে।
- জাল ও দরজা: জানালায় শক্ত জাল; জালের নিচের অংশ মাটিতে কিছুটা গাঁথা, যাতে বেজি গর্ত করে ঢুকতে না পারে। সন্ধ্যায় দরজা বন্ধ, সকালে খোলা।
- চরার মাঠ: প্রায় ৯ × ৫ মিটার জাল ঘেরা, ভেতরে একটি-দুটি ছায়াদার গাছ বা ছাউনি, ধুলাস্নানের জন্য শুকনো মাটি বা ছাইয়ের একটি কোণ।
খাবার
চরে খাওয়ার পাশাপাশি সকাল-বিকেল সম্পূরক খাবার: ভাঙা চাল, গম, ধানের কুঁড়া, ভুট্টা ভাঙা, রান্নাঘরের সবজির খোসা ও উচ্ছিষ্ট। প্রতিটি মুরগির দিনে আনুমানিক ৩০–৫০ গ্রাম দানা, চরার সুযোগ কম হলে বেশি। ডিমের খোসা শক্ত রাখতে ক্যালসিয়াম: ভাজা ডিমের খোসা গুঁড়া বা শামুক-ঝিনুকের খোসা গুঁড়া। ক্ষুদিপানা বা অ্যাজোলা আমিষের ভালো উৎস। সারাদিন পরিষ্কার পানি, পাত্র প্রতিদিন ধোয়া। বাজারের তৈরি খাবার, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো খাবার, দেওয়া হবে না।
ডিম ও বাচ্চা
দেশি মুরগি বছরে কয়েক দফায় ডিম পাড়ে, প্রতি দফায় দশ-পনেরোটি, তারপর কুঁচে হয়ে তা দিতে চায়। আমরা রাতে আলো জ্বালিয়ে জোর করে বেশি ডিম পাড়াব না। খাওয়ার ডিম প্রতিদিন সংগ্রহ; বাচ্চা ফোটানোর ডিম আলাদা করে কুঁচে মুরগির নিচে। পদ্ধতি দেশি পদ্ধতিতে ডিম ফোটানো পাতায়। মোরগ থাকলে ডিম উর্বর হয়; শুধু খাওয়ার ডিমে মোরগের দরকার নেই, তবে দলের শৃঙ্খলা আর সতর্কতায় মোরগ উপকারী।
টিকা ও স্বাস্থ্য
| রোগ | কখন (সাধারণ সূচি) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| রানীক্ষেত (নিউক্যাসল) | বাচ্চার প্রথম সপ্তাহে চোখে ফোঁটা, প্রায় দুই মাসে ইনজেকশন, তারপর প্রতি চার-ছয় মাসে (বৈশাখ, ভাদ্র, পৌষ) | সবচেয়ে মারাত্মক রোগ; সবুজ পাতলা পায়খানা, ঘাড় বাঁকা, দ্রুত মৃত্যু |
| মুরগির বসন্ত (ফাউল পক্স) | প্রায় এক-দুই মাস বয়সে, বছরে একবার; বর্ষার আগে, জ্যৈষ্ঠে | ঝুঁটি ও চোখের পাশে গুটি; মশায় ছড়ায় |
| গামবোরো | বাচ্চার প্রায় দুই সপ্তাহ বয়সে, উপজেলা অফিসের পরামর্শে | বাচ্চায় বেশি হয় |
| কৃমি | প্রতি তিন-চার মাসে, চিকিৎসকের পরামর্শে | চরে খাওয়া মুরগিতে বেশি |
টিকার নাম, বয়স, মাত্রা ও পুনরাবৃত্তির সময় এলাকা, রোগের প্রাদুর্ভাব আর টিকার ধরন অনুযায়ী বদলায়। এখানে দেওয়া সূচি সাধারণ পরিকল্পনা; চূড়ান্ত সূচি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বা নিবন্ধিত পশু চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক হবে। সরকারি টিকা সাধারণত উপজেলা অফিসে স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়।
অ্যান্টিবায়োটিক নীতি: নিয়মিত বা রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন বা বৃদ্ধিবর্ধক কখনো নয়। কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা হবে, কারণ কষ্ট দেখেও চিকিৎসা না করা পশু কল্যাণের পরিপন্থী। চিকিৎসার পর ওষুধের নির্ধারিত “প্রত্যাহার সময়” পর্যন্ত সেই প্রাণীর দুধ, ডিম বা মাংস খাওয়া হবে না, আর বিষয়টি চিকিৎসার খাতায় লেখা থাকবে।
জৈব নিরাপত্তা
- নতুন মুরগি বা বাজার থেকে আনা পাখি অন্তত দুই সপ্তাহ আলাদা।
- মরা পাখি দ্রুত সরিয়ে গভীর গর্তে চুন দিয়ে পুঁতে ফেলা।
- এলাকায় রানীক্ষেত বা বার্ড ফ্লুর খবর পেলে চরানো বন্ধ, প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ।
- হাঁস ও মুরগির ঘর আলাদা, পানির পাত্র আলাদা।