সীড ব্যাংক

সংরক্ষণাগার ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশের ভেজা বাতাস বীজের সবচেয়ে বড় শত্রু। বর্ষায় খোলা জায়গায় রাখা বীজ কয়েক মাসেই গজানোর ক্ষমতা হারায়। তাই সীড ব্যাংকের মূল কাজ একটাই: বীজকে শুকনো, ঠান্ডা আর অন্ধকারে রাখা।

একটি সহজ নিয়ম

বীজবিজ্ঞানে একটি পুরোনো মোটা দাগের নিয়ম আছে: বীজের আর্দ্রতা মোটামুটি এক শতাংশ কমালে, অথবা সংরক্ষণের তাপমাত্রা প্রায় পাঁচ ডিগ্রি কমালে, বীজের আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়। নিয়মটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আর আনুমানিক, তবে এটি দেখায় কেন শুকানো আর ঠান্ডা রাখা এত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ সীমিত বলে আমরা ঘর ঠান্ডা করতে পারব না, তাই আমাদের প্রধান হাতিয়ার হলো ভালোভাবে শুকানো আর বায়ুরোধী পাত্র।

বীজঘরের নকশা

  • উঁচু ভিটা: সাধারণ বন্যার উচ্চতার অনেক ওপরে; মাটির আর্দ্রতা যেন মেঝে দিয়ে না ওঠে।
  • পুরু দেয়াল ও তাপরোধী ছাদ: দিনের গরম ভেতরে কম ঢোকে, তাপমাত্রা ওঠানামা কম।
  • ছায়ায়, উত্তরমুখী দরজা: সরাসরি রোদ ঢুকবে না।
  • ছোট, জালি দেওয়া ভেন্ট: শুকনো মৌসুমে বাতাস চলাচল; বর্ষায় বন্ধ রাখা যায় এমন।
  • মেঝে থেকে উঁচু তাক: দেয়াল থেকে একটু দূরে, যাতে চারপাশে বাতাস চলে আর ইঁদুর চড়তে না পারে।
  • একটি আর্দ্রতা মিটার (হাইগ্রোমিটার): ঘরের আপেক্ষিক আর্দ্রতা খাতায় লেখার জন্য।

পাত্র

বীজ রাখার পাত্রের তুলনা
পাত্রকোন বীজের জন্যমন্তব্য
রাবার-আংটির ঢাকনাসহ কাচের বয়ামসবজি, শাক, মসলার অল্প বীজভেতর দেখা যায়, বায়ুরোধী; আলো থেকে রক্ষায় অন্ধকার তাকে
খাবার উপযোগী ঢাকনাওয়ালা প্লাস্টিক ড্রামধান, ডাল, সরিষার বেশি পরিমাণ বীজঢাকনা শক্ত করে লাগানো; ভেতরে আর্দ্রতা শোষক
ধাতব টিন বা কৌটাডাল, ধানইঁদুর-প্রতিরোধী; মরিচা থেকে বাঁচাতে শুকনো জায়গায়
মাটির মটকাঐতিহ্যবাহী ধানবীজমুখ ভালোভাবে বন্ধ করে আলকাতরা বা মোম লেপে; ভেজা মেঝেতে নয়
কাপড় বা চটের থলেশুধু স্বল্প সময়ের জন্যবাতাসের আর্দ্রতা শোষণ করে; দীর্ঘ সংরক্ষণে নয়

ছোট ছোট লটের বীজ কাগজের খামে লেবেল দিয়ে, কয়েকটি খাম একসাথে একটি বড় বায়ুরোধী বয়ামে রাখা সুবিধাজনক। এতে প্রতিবার বয়াম খুললে সব বীজ আর্দ্র বাতাস পায় না।

আর্দ্রতা শোষক

  • রং বদলানো সিলিকা জেল: শুকনো অবস্থায় এক রং, আর্দ্রতা টানলে আরেক রং হয়। রং বদলালে কড়াইয়ে বা রোদে গরম করে আবার শুকিয়ে ব্যবহার করা যায়।
  • ভাজা চাল বা পোড়া কাঠকয়লা: সহজলভ্য দেশি বিকল্প; কাপড়ের ছোট থলেতে ভরে পাত্রে।
  • ছাই: ডাল ও ধানের বীজে মিশিয়ে রাখলে আর্দ্রতা আর পোকা দুটোই কমে; বোনার আগে ঝেড়ে নেওয়া যায়।

পোকা ও ইঁদুর

ডালের বীজে ঢোরা পোকা (ব্রুকিড) আর ধানে সুরুই পোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। জৈব উপায়ে প্রতিরোধ:

  1. বীজ ভালোভাবে শুকানো; শুকনো বীজে পোকা কম বাড়ে।
  2. বায়ুরোধী পাত্র পুরো ভরা রাখা; ভেতরে অক্সিজেন কম থাকলে পোকা টেকে না।
  3. শুকনো নিমপাতা, নিশিন্দা পাতা বা ছাই পাত্রে মিশিয়ে রাখা।
  4. অল্প ডালের বীজে সামান্য সরিষার তেল মেখে রাখার প্রচলিত পদ্ধতি; বোনার আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করে নিতে হবে।
  5. মাসে একবার পাত্র খুলে দেখা; পোকা পেলে সেই লট আলাদা করে রোদে দিয়ে চালুনি দিয়ে ছেঁকে পরিষ্কার।
  6. ঘরে ইঁদুরের পথ বন্ধ; তাক দেয়াল থেকে দূরে।

রাসায়নিক কীটনাশক বা ফিউমিগেশন বড়ি বীজঘরে একেবারেই ব্যবহার হবে না।

দুই স্তরের মজুদ

কাজের মজুদ

পরের মৌসুমে বোনার জন্য পর্যাপ্ত বীজ, সহজে হাতের কাছে। প্রতি মৌসুমে নবায়ন।

নিরাপত্তা মজুদ

প্রতিটি মূল্যবান জাতের ছোট একটি নমুনা, বিশেষভাবে শুকিয়ে, বায়ুরোধী ছোট বয়ামে সিলিকা জেলসহ। চাইলে খামারের ফ্রিজের এক কোণে বা একটি পরিবারের বাসার ফ্রিজে, যাতে বন্যা, আগুন বা ফসলহানিতেও জাতটি হারিয়ে না যায়। ফ্রিজ থেকে বের করে বয়াম খোলার আগে কয়েক ঘণ্টা ঘরের তাপমাত্রায় আসতে দিতে হবে, নইলে ভেতরে পানি জমে।

কোন বীজ কতদিন টেকে

ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় আনুমানিক আয়ু। খোলা অবস্থায় বা আর্দ্র ঘরে আয়ু অনেক কম। প্রতিটি ফসলের পাতায় আলাদা করে লেখা আছে।

ফসলভেদে বীজের আনুমানিক আয়ু
আয়ুফসলযা করতে হবে
স্বল্প (প্রায় এক বছর)পেঁয়াজ, কিছুটা পালং ও ধনিয়াপ্রতি বছর নতুন বীজ রাখা
মাঝারি (দুই-তিন বছর)ধান, মরিচ, ঢেঁড়স, সরিষা, তিল, ডাল, শিম, বরবটি, পুঁই, কালোজিরাপ্রতি বছর বা এক বছর অন্তর নবায়ন
দীর্ঘ (চার বছর বা বেশি)লাউ, কুমড়া, চালকুমড়া, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শসা, টমেটো, বেগুন, মুলা, লালশাকদুই-তিন বছর অন্তর নবায়ন যথেষ্ট
বীজ নয়, জীবন্ত উপকরণআদা, হলুদ, রসুন, মুখীকচু, মিষ্টি আলুর লতা, কাকরোলের কন্দমৌসুম থেকে মৌসুম জীবিত অবস্থায় রাখা; বিস্তারিত প্রতিটি পাতায়

মাসিক পরিদর্শন

  • ঘরের আর্দ্রতা মিটারের পাঠ খাতায় লেখা।
  • সিলিকা জেলের রং দেখা; বদলালে শুকানো।
  • কয়েকটি পাত্র খুলে পোকা, ছত্রাক বা গন্ধ আছে কি না দেখা।
  • যে বীজের মৌসুম আসছে, তার অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা শুরু।
  • রেজিস্টারে মজুদের পরিমাণ হালনাগাদ।