মূল পরিকল্পনা

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

আমরা কেন একটি খামার করছি, কাদের জন্য করছি, আর কয়েক বছর পরে কীভাবে বুঝব যে কাজটা ঠিক পথে এগোচ্ছে।

কেন এই খামার

আমাদের পাঁচ পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের প্রায় সবটাই আসে বাজার থেকে। চাল কোন জমিতে, কোন সারে হয়েছে; সবজিতে কতবার কীটনাশক পড়েছে; মাছ বা মুরগি কী খেয়ে বড় হয়েছে, এসবের কোনো উত্তর আমাদের কাছে নেই। দামও প্রতি বছর বাড়ছে, আর মৌসুম বদলালে ভালো জিনিস খুঁজে পাওয়াও কঠিন।

এই অনিশ্চয়তা থেকেই সিদ্ধান্ত: শহরের কাছে একখণ্ড জমিতে নিজেদের খাবার নিজেরা ফলাব। এটি কোনো ব্যবসায়িক প্রকল্প নয়। লাভের হিসাব নয়, বরং পরিবারের পাতে নিরাপদ খাবার, সন্তানদের মাটির সাথে পরিচয়, আর আল্লাহর দেওয়া জমির যত্ন, এই তিনটিই মূল কারণ।

ছয়টি মূল লক্ষ্য

  1. খাদ্যে স্বনির্ভরতা: চাল, ডাল, মৌসুমি সবজি, মাছ, ডিম ও দুধের বড় অংশ নিজেদের খামার থেকে আসবে। তেল, লবণ, চিনির মতো জিনিস বাইরে থেকে কেনা চলবে, তবে সরিষা আর তিল থেকে কিছু তেলও নিজেরা করার চেষ্টা থাকবে।
  2. সম্পূর্ণ জৈব উৎপাদন: রাসায়নিক সার, কীটনাশক, আগাছানাশক বা হরমোন কোনোটাই ব্যবহার হবে না। মাটির উর্বরতা আসবে গোবর, কম্পোস্ট, কেঁচো সার ও বায়োগ্যাস স্লারি থেকে।
  3. বীজে স্বাধীনতা: কোনো হাইব্রিড জাত নয়। দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাতের বীজ প্রতি মৌসুমে নিজেরা রেখে পরের মৌসুমে বুনব, নিজেদের সীড ব্যাংকে।
  4. শক্তিতে স্বনির্ভরতা: বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ নেওয়া হবে না। প্রথমে ৫ কিলোওয়াট, পরে ১০ কিলোওয়াট সৌর ব্যবস্থা; রান্নার জন্য গোবরের বায়োগ্যাস।
  5. পরিবারগুলোর বন্ধন ও শিক্ষা: পাঁচ পরিবার একসাথে কাজ, পরামর্শ ও হিসাবের মধ্য দিয়ে একটি ছোট সম্প্রদায় হয়ে উঠবে। শিশুরা হাতে-কলমে চাষ, পশুপালন আর দায়িত্ব শিখবে।
  6. আমানতের যত্ন ও সদকা: মাটি, পানি, গাছ আর প্রাণীর প্রতি দায়িত্বশীল থাকা; পাশের ওয়াকফ জমিতে একটি মসজিদ, আর উদ্বৃত্ত খাবার প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের সাথে ভাগ করা।

কীভাবে মাপব

লক্ষ্য শুধু ভালো কথা হয়ে থাকলে চলবে না। প্রতিটি লক্ষ্যের পাশে একটি সহজ মাপকাঠি রাখা হলো। নিচের লক্ষ্যমাত্রাগুলো আমাদের নিজেদের ঠিক করা; প্রথম বছরের অভিজ্ঞতার পরে বার্ষিক সভায় সেগুলো সংশোধন হবে।

লক্ষ্য, মাপকাঠি ও লক্ষ্যমাত্রা
লক্ষ্যকীভাবে মাপবপ্রথম তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা
খাদ্যে স্বনির্ভরতাপ্রতি মাসে প্রতিটি পরিবারের চাল, সবজি, মাছ, ডিম, দুধের কত অংশ খামার থেকে এলো, তার খাতাসবজি ও ডিমের বেশির ভাগ; চাল ও মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ
জৈব উৎপাদনখামারে ঢোকা প্রতিটি উপকরণের তালিকা; কোনো রাসায়নিক কেনা হয়নি তার নিশ্চয়তাশুরু থেকেই শূন্য রাসায়নিক
বীজে স্বাধীনতাবীজ রেজিস্টারে কতটি ফসলের বীজ নিজেদের সংগ্রহ থেকে বোনা হলোতৃতীয় বছরের মধ্যে প্রধান সব ফসলের বীজ নিজেদের
শক্তিতে স্বনির্ভরতাকত দিন জেনারেটর বা বাইরের জ্বালানি লেগেছে; গ্যাস সিলিন্ডার কেনা হয়েছে কি নারান্না ও আলোর জন্য বাইরের জ্বালানি প্রায় শূন্য
মাটির স্বাস্থ্যপ্রতি বছর মাটি পরীক্ষা: জৈব পদার্থ, পিএইচজৈব পদার্থ ধীরে ধীরে বাড়ছে
পরিবারের অংশগ্রহণরোস্টার অনুযায়ী উপস্থিতি, মাসিক সভায় উপস্থিতিপ্রতিটি পরিবার নিয়মিত অংশ নিচ্ছে

কাদের জন্য

খামারটি প্রথমত পাঁচটি অংশীদার পরিবারের জন্য। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিবারের অংশ ৬০ শতাংশ, বাকি চার পরিবারের প্রত্যেকের ১০ শতাংশ। খাবারের ভাগ, খরচের ভাগ আর সিদ্ধান্তের নিয়ম মালিকানা ও পরিচালনা পাতায় বিস্তারিত।

দ্বিতীয়ত, খামারে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের পরিবার। তাঁরা ন্যায্য মজুরি পাবেন, আর খামারের খাবারে তাঁদেরও হক থাকবে। তৃতীয়ত, প্রতিবেশী ও এলাকার মানুষ: মসজিদ সবার জন্য খোলা, দেশি বীজ চাইলে বিনিময় বা উপহার, আর উদ্বৃত্ত খাবারের একটি অংশ তাঁদের জন্য।

যা আমাদের লক্ষ্য নয়

কী করব না, সেটা স্পষ্ট থাকলে ভবিষ্যতে অনেক বিতর্ক এড়ানো যায়।

  • বাজারে বিক্রির জন্য উৎপাদন বা লাভের লক্ষ্যে ফসল বাছাই।
  • বেশি ফলনের লোভে হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার।
  • বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ নেওয়া, এমনকি জরুরি মুহূর্তেও।
  • ঋণ নিয়ে খামার বড় করা বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ।
  • শখের প্রাণী (ময়ূর, হরিণ) অনুমতি ছাড়া বা প্রাণীর কষ্ট হয় এমনভাবে পালন।
  • খামারকে বিনোদনকেন্দ্র বা পিকনিক স্পট বানানো।

পাঁচ বছর পরে সাফল্য দেখতে কেমন

পাঁচ বছর পরে আমরা নিজেদের সফল বলব, যদি:

  • পরিবারগুলোর রান্নাঘরে সপ্তাহের বেশির ভাগ সবজি, ডিম আর মাছ খামার থেকে আসে।
  • সীড ব্যাংকে অন্তত ত্রিশটি ফসলের দেশি বীজ নিয়মিত নবায়ন হচ্ছে।
  • মাটি পরীক্ষায় জৈব পদার্থ শুরুর চেয়ে বেশি, আর জমিতে কেঁচো ও উপকারী পোকা সহজে চোখে পড়ে।
  • সৌর ব্যবস্থা ১০ কিলোওয়াটে উন্নীত, আর বায়োগ্যাসে রান্না নিয়মিত।
  • হিসাব প্রতি মাসে সবার সামনে, আর কোনো পরিবার নিজেকে বঞ্চিত মনে করে না।
  • মসজিদে নিয়মিত জামাত হয়, আর প্রতিবেশীরা খামারকে নিজেদের অংশ মনে করেন।

পর্যালোচনা

প্রতি বছর রবি মৌসুম শেষে, চৈত্র মাসে, একটি বার্ষিক সভা হবে। সেখানে ওপরের প্রতিটি মাপকাঠি দেখা হবে, কোথায় পিছিয়ে আছি তা খোলাখুলি আলোচনা হবে, আর পরের বছরের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক হবে। লক্ষ্য বদলানো যাবে, কিন্তু মৌলিক নীতি (জৈব, হাইব্রিডমুক্ত, অবাণিজ্যিক, গ্রিডমুক্ত) বদলাতে হলে সব পরিবারের সর্বসম্মতি লাগবে।

পরের পাতা

লক্ষ্য থেকে দূরের ছবিটা দেখতে পড়ুন ভিশন; আর কাজ কোন ক্রমে শুরু হবে তা দেখুন রোডম্যাপে।