সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে বছরে প্রচুর বৃষ্টি হয়, কিন্তু তার বেশির ভাগ পড়ে চার-পাঁচ মাসে। বাকি সময় পানির টান। তাই আমাদের পানি ব্যবস্থাপনার মূল কথা: বর্ষার পানি ধরে রাখা, শুকনো মৌসুমে মেপে খরচ করা।
তিন উৎস, তিন কাজ
| উৎস | প্রধান ব্যবহার | মন্তব্য |
|---|---|---|
| নলকূপ ও উঁচু ট্যাংক | খাওয়া, রান্না, গোসল, গোয়াল ও পাখির পানি, সবজির ড্রিপের একাংশ | দুপুরে সোলার পাম্পে ট্যাংক ভরা; বিস্তারিত সোলার পাম্প ও সেচ |
| বড় ও ছোট পুকুর | সবজি, মাচা, ফলগাছ ও ধানের সেচ | বর্ষার পানির মজুদ; মাছের প্রয়োজন আগে |
| বৃষ্টি ও ছাদের পানি | বর্ষায় সব ফসল; ছাদের পানি ড্রাম বা পুকুরে | ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমায় |
মূল নীতি: জমির সেচ যথাসম্ভব পুকুর ও বৃষ্টি থেকে, নলকূপ মানুষ আর পশুর জন্য।
সেচের পদ্ধতি
- ড্রিপ লাইন: সবজির বেডে পাইপের ছোট ছিদ্র দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি সরাসরি গোড়ায়; উঁচু ট্যাংক বা মাচার ওপর রাখা ড্রাম থেকে মাধ্যাকর্ষণে চলে।
- ঝাঁঝরি ও কলস: চারা আর ছোট বেডে; মাটির কলস গাছের পাশে পুঁতে পানি ভরে রাখলে ধীরে চুইয়ে শিকড়ে যায়।
- নালা সেচ: সারির মাঝের নালায় পুকুর থেকে পাম্প করা পানি; বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচে।
- প্লাবন সেচ: শুধু ধানক্ষেতে, আইল দিয়ে নিয়ন্ত্রিত।
- মালচ: খড়, শুকনো পাতা বা কচুরিপানা দিয়ে মাটি ঢাকা; বাষ্পীভবন কমায়, সেচ অনেক কম লাগে।
কখন পানি দেবেন
পাম্প চলবে দুপুরে, যখন সৌর বিদ্যুৎ বেশি; কিন্তু গাছে পানি দেওয়া হবে সকালে বা বিকেলে। তাই দুপুরে পুকুর থেকে পানি তুলে ড্রাম বা ছোট চৌবাচ্চায় রাখা, আর বিকেলে বেডে। মাটি আঙুল দিয়ে দুই কর গভীরে শুকনো লাগলে তবেই পানি; প্রতিদিন রুটিন করে নয়। অতিরিক্ত পানিতে শিকড় পচে আর পুষ্টি ধুয়ে যায়।
ধানে পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো
বোরো ধানে সবচেয়ে বেশি পানি লাগে। ক্ষেতে নিচে ছিদ্রযুক্ত একটি নল পুঁতে তার ভেতরের পানির স্তর দেখা হয়; পানি মাটির নিচে প্রায় এক বিঘত নামলে তবেই আবার সেচ। থোড় থেকে ফুল আসা পর্যন্ত অবশ্য জমিতে পানি রাখতে হয়। এই পদ্ধতিতে পানি উল্লেখযোগ্যভাবে কম লাগে, ফলনে সাধারণত ক্ষতি হয় না। বিস্তারিত ধান চাষ পদ্ধতি পাতায়।
পুকুরের পানির মাপকাঠি
বড় পুকুরে ঘাটের পাশে রং করা একটি খুঁটি থাকবে, তাতে তিনটি দাগ:
- সবুজ দাগের ওপরে: স্বাভাবিক সেচ।
- হলুদ দাগ পর্যন্ত: শুধু সবজি ও চারায় সেচ; বোরোর এলাকা কমানো।
- লাল দাগে: পুকুর থেকে সেচ বন্ধ; মাছের নিরাপত্তা আগে, প্রয়োজনে নলকূপ থেকে পুকুরে কিছু পানি।
দাগগুলোর উচ্চতা প্রথম বছরে মাছের মজুদ আর পুকুরের গভীরতা দেখে ঠিক হবে। বিস্তারিত পানির গুণমান পাতায়।
ছাদের বৃষ্টির পানি
বসতঘর, অতিথিশালা, গোয়াল আর অন্য ঘরের চাল থেকে নালা দিয়ে পানি ড্রাম বা সরাসরি পুকুরে নেওয়া যায়। নিচের যন্ত্রে ছাদের আয়তন আর বৃষ্টির পরিমাণ বসালে আনুমানিক কত লিটার পানি ধরা সম্ভব তা দেখাবে। দেশে অঞ্চলভেদে বছরে প্রায় দেড় থেকে তিন মিটারের মতো বৃষ্টি হয়; নিজের এলাকার গড় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে যাচাই করুন।
হিসাব: প্রতি বর্গমিটার ছাদে এক মিলিমিটার বৃষ্টি প্রায় এক লিটার পানি। প্রথম বৃষ্টির ধুলাবালি মেশানো পানি আলাদা করে ফেলে দেওয়া ভালো; খাওয়ার জন্য ছাদের পানি ব্যবহার করা হবে না।
নিষ্কাশন
সেচের মতোই জরুরি অতিরিক্ত পানি বের করা। সবজির বেড উঁচু, বেডের মাঝে নালা, আর মাঠের ঢাল পুকুরের দিকে। গোয়াল, কম্পোস্ট আর স্লারি পিটের পানি সরাসরি পুকুরে নয়, ঘাসের প্লটে। বর্ষার আগে সব নালা পরিষ্কার, আর সীমানা দেয়ালের নালামুখের জালি খোলা রাখা।
সেচের জন্য নতুন নলকূপ বসানো বা পুকুরের আকার বড় করার আগে উপজেলা সেচ কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতির নিয়ম জেনে নিন।