ধান চাষ পদ্ধতি
বীজতলা থেকে মাড়াই পর্যন্ত, রাসায়নিক ছাড়া। আমাদের চার খণ্ডের ধানক্ষেতে আমন প্রতিটি খণ্ডে, আউশ এক খণ্ডে, আর পুকুরে পানি থাকলে এক খণ্ডে বোরো; বাকি সময় ডাল, সরিষা ও সবুজ সার।
তিন মৌসুমের ধান
| বিষয় | আউশ | আমন | বোরো |
|---|---|---|---|
| বোনা বা বীজতলা | চৈত্র–বৈশাখ, সরাসরি বা রোপণ | আষাঢ়–শ্রাবণ বীজতলা, শ্রাবণ–ভাদ্র রোপণ | অগ্রহায়ণ–পৌষ বীজতলা, পৌষ–মাঘ রোপণ |
| কাটা | আষাঢ়–শ্রাবণ | কার্তিক–অগ্রহায়ণ | বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ |
| পানি | বৃষ্টি, প্রয়োজনে হালকা সেচ | বর্ষার বৃষ্টি | নিয়মিত সেচ |
| প্রধান চ্যালেঞ্জ | আগাছা, বর্ষায় শুকানো | জলাবদ্ধতা, পোকা | ঠান্ডা, পানির খরচ, শিলাবৃষ্টি |
| আমাদের খামারে | এক খণ্ড | চার খণ্ড (একটিতে সুগন্ধি) | পানি থাকলে এক খণ্ড |
প্রতিটি জাতের বিস্তারিত বীজের পাতায়: আউশ, আমন, কালিজিরা, চিনিগুড়া, বোরো।
বীজ বাছাই ও শোধন
নিজেদের সীড ব্যাংকের বীজ, বোনার দুই-তিন সপ্তাহ আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করা। তারপর লবণ পানিতে বাছাই: এক বালতি পানিতে এতটা লবণ গোলানো যাতে একটি ডিম ভেসে ওঠে; বীজ ঢাললে চিটা আর হালকা দানা ভাসবে, সেগুলো ফেলে দিয়ে ডুবে থাকা বীজ পরিষ্কার পানিতে কয়েকবার ধুয়ে নেওয়া। তারপর এক দিন ভিজিয়ে, দুই দিন ভেজা বস্তায় জাগ দিলে অঙ্কুর বের হয়।
বীজতলা
- উঁচু, রোদ পড়ে এমন জায়গা, যেখানে বর্ষায় পানি দাঁড়ায় না।
- মাটি কাদা করে প্রায় এক মিটার চওড়া বেড, মাঝে নালা; বেডে পচা গোবর বা কেঁচো সার মেশানো।
- অঙ্কুরিত বীজ সমানভাবে ছিটানো; প্রথম কয়েক দিন পাখি তাড়ানো।
- বোরোর বীজতলায় রাতে স্বচ্ছ পলিথিনের ঢাকনা, সকালে খোলা।
- বন্যার ঝুঁকিতে আমনের কিছু চারা পরে রোপণের জন্য আলাদা বীজতলায় রাখা।
জমি তৈরি ও রোপণ
দুই-তিনবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা, শেষ চাষে কম্পোস্ট বা শুকনো স্লারি; আগের মৌসুমে ধৈঞ্চা থাকলে ফুল আসার আগে তা মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া। চারার বয়স আউশ-আমনে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ দিন, বোরোতে প্রায় পঁয়ত্রিশ-পঁয়তাল্লিশ দিন। সোজা সারিতে, প্রতি গোছায় দুই-তিনটি চারা, অগভীর করে লাগানো। দূরত্ব জাতভেদে, সাধারণত সারি থেকে সারি ২০–২৫ সেমি, গোছা থেকে গোছা ১৫–২০ সেমি; লম্বা দেশি জাতে একটু ফাঁকা।
জৈব পুষ্টি
- কম্পোস্ট ও স্লারি: শেষ চাষে মূল সার; কুশি আসার সময় পাতলা তরল স্লারি নালা দিয়ে।
- সবুজ সার: আউশ বা বোরোর পর জমি খালি থাকলে ধৈঞ্চা, ছয়-সাত সপ্তাহে মাটিতে মেশানো।
- ডালের পালা: আমনের আগে মুগ বা আমনের পরে মসুর-খেসারি।
- আজোলা: ধানক্ষেতের পানিতে ভাসমান এই ছোট ফার্ন বাতাসের নাইট্রোজেন ধরে; ছোট পুকুরের কোণে চাষ করে ধানক্ষেতে ছাড়া যায়, আর হাঁসের খাবারও হয়।
- হাঁস: চারা শক্ত হওয়ার পর দিনের বেলায় কয়েকটি হাঁস ধানক্ষেতে চরলে আগাছা আর পোকা খায়, বিষ্ঠা সার হয়; শিষ আসার পর হাঁস সরিয়ে নেওয়া।
অতিরিক্ত নাইট্রোজেন জৈব সারেও ক্ষতিকর: গাছ বেশি লম্বা হয়ে হেলে পড়ে আর ব্লাস্ট রোগ বাড়ে।
আগাছা দমন
রোপণের প্রায় ২০–২৫ আর ৪০–৪৫ দিনে নিড়ানি। সোজা সারিতে লাগালে হাতে চালানো নিড়ানি যন্ত্র ব্যবহার করা যায়, যা মাটিও আলগা করে। সরাসরি বোনা আউশে আগাছা সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাই সেখানে বোনার আগে কয়েকবার চাষ দিয়ে আগাছা গজাতে দিয়ে নষ্ট করা।
পানি: পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো
রোপণের পর প্রথম দুই সপ্তাহ অল্প পানি রাখা। তারপর জমিতে নিচে ছিদ্রযুক্ত একটি প্লাস্টিক বা বাঁশের নল পোঁতা হয়; নলের ভেতরে পানি মাটির নিচে প্রায় এক বিঘত নেমে গেলে আবার সেচ। এতে বোরোতে উল্লেখযোগ্য পানি বাঁচে, আর শিকড় গভীরে যায়। তবে থোড় থেকে ফুল আসা পর্যন্ত জমিতে পানি রাখতেই হবে। বিস্তারিত সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা পাতায়।
পোকা দমন
ধানক্ষেতের মাকড়সা, ড্যামসেল মাছি, লেডিবার্ড বিটল পোকা খায়; রাসায়নিক না দিলে এরা প্রাকৃতিকভাবেই অনেক পোকা নিয়ন্ত্রণ করে। এর সাথে জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা, রাতে আলোর ফাঁদ, মাজরার ডিমের গাদা হাতে তোলা, আর বাদামি গাছফড়িং দেখা দিলে কয়েক দিন পানি নামিয়ে রাখা। প্রতি সপ্তাহে ক্ষেতের কয়েকটি জায়গায় গোড়া ফাঁক করে দেখা হবে।
কাটা, মাড়াই ও শুকানো
শিষের চার ভাগের তিন ভাগ সোনালি হলে কাটা। বীজের অংশ আগে আলাদা কেটে আলাদা মাড়াই। মাড়াইয়ের পর রোদে শুকিয়ে, দাঁতে কামড়ে শক্ত হলে গোলায় বা বায়ুরোধী ড্রামে। খড় শুকিয়ে উঁচু মাচায় গরুর জন্য; কিছু খড় কম্পোস্ট আর সবজির মালচে। নাড়া পুড়িয়ে নয়, মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া।