কালিজিরা ধান
ছোট দানার সুগন্ধি আমন ধান, যার দানা কালোজিরার মতো ছোট বলেই এই নাম। পোলাও, পায়েস আর উৎসবের রান্নায় বাংলার অন্যতম প্রিয় চাল।
- নাম
- কালিজিরা ধান · Kalijira rice · Oryza sativa
- পরিবার
- ঘাসজাতীয় (পোয়েসি)
- জাতের ধরন
- ঐতিহ্যবাহী দেশি সুগন্ধি জাত; ধান স্বপরাগী, তাই বীজ রাখলে একই রকম গাছ হয়
- মৌসুম
- খরিফ-২
- বপন বা রোপণ
- শ্রাবণ–ভাদ্র (মধ্য জুলাই – মধ্য সেপ্টেম্বর)
- দূরত্ব
- সারি থেকে সারি প্রায় ২৫ সেমি, গোছা থেকে গোছা প্রায় ২০ সেমি; প্রতি গোছায় ২–৩টি চারা
- ফসল তোলা
- বীজতলা থেকে প্রায় ১৪০–১৫০ দিন · অগ্রহায়ণ
- বীজ সংগ্রহ
- অগ্রহায়ণ
- বীজের আয়ু
- ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় এক থেকে দুই বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
কালিজিরা দেশের পুরোনো সুগন্ধি জাতগুলোর একটি। গাছ লম্বা, দানা খুব ছোট ও সরু, রান্নার সময় মিষ্টি সুবাস ছড়ায়। ফলন আধুনিক জাতের তুলনায় কম, কিন্তু স্বাদ আর ঘ্রাণের জন্য পারিবারিক খামারে এর জায়গা আলাদা। জাতটি আলোক-সংবেদনশীল: দিনের দৈর্ঘ্য কমে এলে, কার্তিক-অগ্রহায়ণে, ফুল আসে, তাই রোপণ কিছুটা দেরি হলেও প্রায় একই সময়ে পাকে।
বীজের উৎস: যে এলাকায় এখনো কৃষকেরা কালিজিরা চাষ করেন, সেখানকার বিশ্বস্ত কৃষকের কাছ থেকে প্রথম বীজ। কালিজিরার ধরনে ব্রি-র একটি সুগন্ধি ইনব্রেড জাতও (ব্রি ধান৩৪) আছে, যার বীজও রাখা যায়; দুটি একসাথে চাষ করলে আলাদা খণ্ডে রাখতে হবে যাতে বীজ মিশে না যায়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কালিজিরা ধান বোনা বা রোপণ করা হয় শ্রাবণ–ভাদ্র (মধ্য জুলাই – মধ্য সেপ্টেম্বর), যা খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।
শ্রাবণের শুরুতে উঁচু, শুকনো বীজতলায় বীজ ফেলা হয়। চারার বয়স প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ দিন হলে ভাদ্রে মূল জমিতে রোপণ। মূল জমির প্রতি শতাংশের জন্য আনুমানিক ৮০–১০০ গ্রাম বীজ লাগে। বীজতলায় পচা গোবর বা কেঁচো সার মেশালে চারা সবল হয়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
রোপণের আগে জমি দুই-তিনবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা করা হয়, আর শেষ চাষের সময় কম্পোস্ট বা শুকনো বায়োগ্যাস স্লারি মেশানো হয়। লম্বা জাত বলে খুব ঘন রোপণ করলে গাছ হেলে পড়ে আর রোগ বাড়ে, তাই আধুনিক জাতের চেয়ে একটু ফাঁকা করে লাগানো ভালো। আইল মজবুত রাখতে হবে, যাতে বর্ষার পানি ধরে রাখা যায়।
পরিচর্যা
- রোপণের পর প্রথম সপ্তাহ জমিতে অল্প পানি; তারপর কুশি আসা পর্যন্ত কয়েক সেমি পানি রাখা।
- রোপণের প্রায় ২০–২৫ ও ৪০–৪৫ দিনে নিড়ানি বা আগাছা পরিষ্কার।
- জৈব সার পরিমিত; অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে গাছ বেশি লম্বা হয়ে হেলে পড়ে আর ব্লাস্ট রোগ বাড়ে।
- থোড় ও ফুল আসার সময় জমিতে পানি যেন না শুকায়।
- দানা পাকার সময় পাখি তাড়ানো; প্রয়োজনে ঝুনঝুনি বা কাকতাড়ুয়া।
- হেলে পড়া গাছ কয়েকটি করে একসাথে বেঁধে দেওয়া।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর)।
শিষের বেশির ভাগ দানা সোনালি আর শক্ত হলে কাটা হয়। কাটার পর কয়েক দিন ভালো করে শুকিয়ে তবেই ভাঙানো বা গুদামজাত। সুগন্ধি চাল বেশি ছাঁটলে ঘ্রাণ আর পুষ্টি কমে, তাই হালকা ছাঁটা বা ঢেঁকিছাঁটা চাল ভালো। নতুন চালের চেয়ে কয়েক মাস রাখা চালে রান্না ঝরঝরে হয়।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাজরা পোকা | কুশি অবস্থায় মাঝের ডগা শুকিয়ে যায় (মরা ডিগ); পরে শিষ সাদা হয়ে চিটা হয় | আলোর ফাঁদ; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা (পার্চিং); ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট; ফসল কাটার পর নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া |
| পাতা মোড়ানো পোকা | পাতা লম্বালম্বি মুড়িয়ে ভেতরে সবুজ অংশ খায়, পাতায় সাদা দাগ | পার্চিং; অতিরিক্ত নাইট্রোজেন না দেওয়া; আক্রমণ বেশি হলে দড়ি টেনে পাতা ঝাঁকিয়ে পোকা পানিতে ফেলা |
| ব্লাস্ট রোগ | পাতায় চোখের মতো দাগ; পরে শিষের গোড়া পচে শিষ ভেঙে পড়ে (গিঁট ব্লাস্ট) | সুস্থ বীজ; অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নয়; জমিতে পানি ধরে রাখা; আক্রান্ত খড় পুড়িয়ে নয়, কম্পোস্টে গভীরে পচানো |
| গান্ধি পোকা | দুধ অবস্থায় দানা থেকে রস শুষে নেয়; দানা চিটা ও দাগযুক্ত, বিশেষ গন্ধ | আইল ও আশপাশের ঘাস পরিষ্কার; সকালে হাতজাল দিয়ে ধরা; শামুকের খোল বা পচা মাছের টোপে আকৃষ্ট করে ধরা |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
ধান স্বপরাগী, তাই আলাদা জাতের মধ্যে সংকর খুব কম হয়। তবে পাশাপাশি খণ্ডে ভিন্ন জাত থাকলে মাড়াই, শুকানো আর বস্তায় ভরার সময় বীজ মিশে যেতে পারে; এটাই প্রধান ঝুঁকি।
- জমির সবচেয়ে সুস্থ ও সমান অংশ বীজের জন্য আলাদা চিহ্নিত করুন।
- ফুল আসার সময় আর পাকার আগে জাতের সাথে না মেলা গাছ (বেশি লম্বা, ভিন্ন রঙের, আগে বা পরে পাকা) গোড়া থেকে তুলে ফেলুন।
- শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ দানা সোনালি হলে বীজের অংশ আলাদা করে কাটুন, অন্য ধানের সাথে মেশাবেন না।
- পরিষ্কার পলিথিন বা চাটাইয়ের ওপর আলাদা মাড়াই করুন।
- দুই-তিন দিন রোদে শুকান, যতক্ষণ না দাঁতে কামড় দিলে দানা শক্ত লাগে আর কট করে ভাঙে।
- কুলায় ঝেড়ে চিটা ও ধুলা বাদ দিন, ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী ড্রাম বা টিনে শুকনো নিমপাতাসহ রাখুন।
- বোনার আগে লবণ পানিতে (যেখানে একটি ডিম ভাসে) বীজ দিলে হালকা চিটা ভেসে ওঠে; শুধু ডুবে থাকা ভারী বীজ ধুয়ে বীজতলায় দিন।
বীজের আয়ু
ধানের বীজ সাধারণ ঘরে খোলা অবস্থায় রাখলে বর্ষার আর্দ্রতায় কয়েক মাসেই দুর্বল হয়। ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে এক মৌসুম থেকে পরের মৌসুম পর্যন্ত ভালো থাকে, আর দুই বছর পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হার পাওয়া যায়। প্রতি বছর নতুন বীজ রাখাই নিরাপদ, আর নিরাপত্তা মজুদে একটি ছোট নমুনা।
পুষ্টিগুণ
চালের মূল উপাদান শর্করা, সাথে কিছু আমিষ। হালকা ছাঁটা বা ঢেঁকিছাঁটা চালে কুঁড়ার অংশ থেকে যায়, যাতে বি ভিটামিন, খনিজ আর আঁশ বেশি। কালিজিরার আসল মূল্য তার ঘ্রাণ আর স্বাদে, যা উৎসবের রান্নাকে আলাদা করে। নিজেদের জৈব খেতের সুগন্ধি চাল পরিবারের জন্য বড় প্রাপ্তি।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।