সীড ব্যাংক

বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি

ভালো বীজ রাখা শুরু হয় ফসল তোলার দিন নয়, বোনার দিন থেকে। কোন গাছের বীজ রাখবেন, কোন জাতের পাশে লাগাবেন, আর কখন তুলবেন, এই তিন সিদ্ধান্তেই বীজের মান ঠিক হয়।

১. গাছ বাছাই

  • মৌসুমের শুরুতেই সবচেয়ে সুস্থ, রোগমুক্ত, জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করুন: রঙিন সুতা বা কাঠি দিয়ে।
  • শুধু সবচেয়ে বড় ফল দেখে নয়; আগাম ফলন, স্বাদ, রোগ সহনশীলতা আর গাছের সামগ্রিক গঠন দেখুন।
  • যে গাছ জাতের সাথে মেলে না (ভিন্ন রং, আকার বা সময়), তা বীজের জন্য বাদ, প্রয়োজনে ফুল আসার আগেই তুলে ফেলুন।
  • বীজের গাছ থেকে খাওয়ার জন্য ফল তোলা যাবে না; পুষ্টি বীজে যাক।

২. কয়টি গাছ রাখবেন

মাত্র একটি-দুটি গাছ থেকে বীজ রাখলে কয়েক প্রজন্মে জাতের বৈচিত্র্য কমে যায়, গাছ দুর্বল হয়। সাধারণ নিয়ম:

  • স্বপরাগী ফসল (ধান, শিম, বরবটি, মসুর, মুগ, খেসারি, টমেটো): অন্তত ৫–১০টি গাছ বা গোছা থেকে।
  • পরপরাগী ফসল (লাউ, কুমড়া, মুলা, সরিষা, পালং, ধনিয়া, পেঁয়াজ): অন্তত ১৫–২০টি গাছ, সম্ভব হলে আরও বেশি, আর সবার বীজ মিশিয়ে একটি লট।

৩. পরাগায়ন ও দূরত্ব

একই প্রজাতির দুটি জাত কাছাকাছি ফুটলে মৌমাছি বা বাতাস এক জাতের পরাগ অন্য জাতে নিয়ে যায়। খাওয়ার ফলে তখন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না, কিন্তু সেই ফলের বীজ থেকে পরের বছর মিশ্র গাছ হয়। নিচের দূরত্বগুলো সাধারণ পরামর্শ; ছোট খামারে এত দূরত্ব রাখা কঠিন হলে বাকি তিনটি উপায় আছে।

ফসলভেদে পরাগায়ন ও পরামর্শকৃত দূরত্ব
ফসলপরাগায়নভিন্ন জাত থেকে দূরত্ব (সাধারণ পরামর্শ)
ধান, মসুর, মুগ, খেসারি, শিম, বরবটি, টমেটো, কালোজিরামূলত স্বপরাগীকয়েক মিটার; পাশাপাশি সারিতেও প্রায় নিরাপদ
মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, তিলস্বপরাগী, তবে পোকার মাধ্যমে কিছু সংকর হয়কয়েক দশ থেকে কয়েকশ মিটার
লাউ, কুমড়া, চালকুমড়া, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, করলা, শসা, কাকরোলপোকার মাধ্যমে পরপরাগীকয়েকশ মিটার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার, অথবা হাতে পরাগায়ন
মুলা, সরিষা (টরি), ধনিয়া, পেঁয়াজপোকার মাধ্যমে পরপরাগীকয়েকশ মিটার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার
পালংশাক, লালশাক, ডাঁটাবাতাস ও পোকার মাধ্যমেকয়েকশ মিটার বা বেশি
আদা, হলুদ, রসুন, মুখীকচু, মিষ্টি আলু, কলমি (কাটিং)কন্দ, কোয়া বা কাটিং দিয়ে বংশবিস্তারদূরত্বের প্রয়োজন নেই

দূরত্ব না রাখা গেলে: (ক) একই মৌসুমে একটি প্রজাতির একটিই জাত লাগানো; (খ) দুই জাতের ফুল ফোটার সময় আলাদা করে বোনা; (গ) হাতে পরাগায়ন আর ফুল ঢেকে রাখা। প্রতিবেশীর জমিতে একই ফসলের হাইব্রিড থাকলে সেটাও মাথায় রাখতে হবে।

হাতে পরাগায়ন (কুমড়াজাতীয় ফসলে)

  1. বিকেলে পরের দিন ফুটবে এমন একটি পুরুষ আর একটি স্ত্রী কুঁড়ি খুঁজুন (স্ত্রী ফুলের নিচে ছোট ফল থাকে)।
  2. দুটোর মুখ সুতা বা কাগজের ক্লিপ দিয়ে বন্ধ করুন, যাতে পোকা না ঢোকে।
  3. পরদিন সকালে পুরুষ ফুলটি ছিঁড়ে পাপড়ি সরিয়ে, পরাগ স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে ঘষে দিন।
  4. স্ত্রী ফুলের মুখ আবার বন্ধ করুন, আর বোঁটায় রঙিন সুতা বেঁধে চিহ্ন দিন। এই ফলটিই বীজের জন্য।

৪. কখন তুলবেন

বীজের ফল খাওয়ার ফলের চেয়ে অনেক বেশি পাকতে হয়। লাউ, কুমড়া, ঝিঙা গাছেই শুকিয়ে শক্ত বা বাদামি হবে; শিম-বরবটির শুঁটি গাছেই শুকিয়ে খড়খড়ে হবে; টমেটো, বেগুন, মরিচ পুরোপুরি পাকা রং ধরবে। ধান ও ডালে দানা শক্ত হলে, ঝরে পড়ার আগে। বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে একটু আগে তুলে ছায়ায় পাকানো যায়।

৫. প্রক্রিয়াকরণ

ভেজা বীজ

টমেটো, শসা, বেগুন, করলার মতো রসালো ফলের বীজ।

  1. ফল কেটে বীজসহ শাঁস একটি পাত্রে।
  2. টমেটো-শসায় সামান্য পানি দিয়ে দুই-তিন দিন রেখে গাঁজন; ওপরে সাদা স্তর পড়বে।
  3. পানি দিয়ে বারবার ধোয়া; ভালো বীজ তলায় ডোবে, ভাসমান বীজ ফেলে দেওয়া।
  4. ছাঁকনিতে পানি ঝরিয়ে কাপড় বা ট্রেতে শুকানো।

শুকনো বীজ

ধান, ডাল, শিম, সরিষা, শাক, লাউ-কুমড়ার শুকনো খোলের বীজ।

  1. শুকনো শুঁটি বা মাথা কাপড়ে রেখে লাঠি দিয়ে আলতো পিটিয়ে বা হাতে ঘষে বীজ ছাড়ানো।
  2. কুলায় ঝেড়ে বা হালকা বাতাসে খোসা ও ধুলা আলাদা।
  3. ভাঙা, ছোট, পোকা খাওয়া বীজ বেছে ফেলা।

৬. শুকানো

বীজ নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ আর্দ্রতা। প্রথম দুই-তিন দিন ছায়ায় বাতাসে, তারপর সকালের হালকা রোদে কাপড় বা চাটাইয়ের ওপর পাতলা করে ছড়িয়ে শুকাতে হবে। দুপুরের কড়া রোদে গরম পাকা মেঝেতে সরাসরি শুকালে ভ্রূণ মরে যেতে পারে। সন্ধ্যায় তুলে ঘরে রাখতে হবে, নইলে রাতের শিশিরে আবার ভিজে যাবে।

শুকনো হয়েছে কি না বুঝবেন কীভাবে

  • ভাঙার পরীক্ষা: বড় বীজ (শিম, কুমড়া) দাঁতে বা দুই আঙুলে চাপলে বাঁকে না, খটখট করে ভাঙে; ধান কামড়ালে শক্ত লাগে।
  • লবণের পরীক্ষা: একটি শুকনো কাচের বয়ামে এক মুঠো বীজ আর এক চামচ শুকনো লবণ রেখে ঢাকনা বন্ধ করুন, কয়েক ঘণ্টা ঝাঁকিয়ে রাখুন। লবণ দলা পাকালে বীজে এখনো আর্দ্রতা বেশি; আরও শুকাতে হবে।

৭. লেবেল ও রেজিস্টার

প্রতিটি পাত্রে ভেতরে ও বাইরে লেবেল: ফসল, জাত, লট নম্বর, সংগ্রহের তারিখ, কয়টি গাছ থেকে। একই তথ্য বীজ রেজিস্টারে। তারপর পাত্র যাবে বীজঘরে, আর বোনার আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা।

প্রতিটি ফসলের নিজস্ব খুঁটিনাটি, যেমন লাউয়ের খোল কতদিন শুকাতে হয় বা পেঁয়াজের বীজ কেন বেশিদিন টেকে না, তার নিজের পাতায় “বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ” অংশে।