চিনিগুড়া ধান
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি আমন ধান। ছোট, সাদা, গোলগাল দানা আর মিষ্টি ঘ্রাণের জন্য পোলাও, বিরিয়ানি আর পায়েসে বিশেষ জনপ্রিয়।
- নাম
- চিনিগুড়া ধান · Chinigura rice · Oryza sativa
- পরিবার
- ঘাসজাতীয় (পোয়েসি)
- জাতের ধরন
- ঐতিহ্যবাহী দেশি সুগন্ধি জাত; স্বপরাগী, বীজ রাখলে একই রকম গাছ
- মৌসুম
- খরিফ-২
- বপন বা রোপণ
- শ্রাবণ–ভাদ্র (মধ্য জুলাই – মধ্য সেপ্টেম্বর)
- দূরত্ব
- সারি থেকে সারি প্রায় ২০–২৫ সেমি, গোছা থেকে গোছা প্রায় ১৫–২০ সেমি; প্রতি গোছায় ২–৩টি চারা
- ফসল তোলা
- বীজতলা থেকে প্রায় ১৪০–১৫০ দিন · অগ্রহায়ণ
- বীজ সংগ্রহ
- অগ্রহায়ণ
- বীজের আয়ু
- বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় এক থেকে দুই বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
চিনিগুড়া মূলত দিনাজপুর, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরের জেলাগুলোতে চাষ হয়ে আসছে। দানা কালিজিরার চেয়ে একটু মোটা ও সাদা, রান্নার পর নরম আর সুগন্ধি। গাছ মাঝারি থেকে লম্বা, আলোক-সংবেদনশীল, তাই কার্তিকের শেষ থেকে অগ্রহায়ণে পাকে। ফলন কম হলেও বাজারে চালের দাম বেশি; আমাদের খামারে অবশ্য বিক্রি নয়, পরিবারের উৎসব আর অতিথি আপ্যায়নের জন্য।
প্রথম বীজ উত্তরের কোনো অভিজ্ঞ কৃষক বা বিশ্বস্ত বীজ সংরক্ষণকারী সংগঠন থেকে। বাজারে “চিনিগুড়া” নামে নানা জাত বিক্রি হয়, তাই প্রথম মৌসুমে অল্প জমিতে চাষ করে দানা আর ঘ্রাণ মিলিয়ে নিশ্চিত হতে হবে।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চিনিগুড়া ধান বোনা বা রোপণ করা হয় শ্রাবণ–ভাদ্র (মধ্য জুলাই – মধ্য সেপ্টেম্বর), যা খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।
শ্রাবণে বীজতলা, আর চারার বয়স প্রায় এক মাস হলে ভাদ্রে রোপণ। দেরিতে, আশ্বিনে রোপণ করলেও গাছ ফুল দেয়, তবে কুশি কম হয় আর ফলন কমে। বীজতলা উঁচু জায়গায়, যাতে ভারী বৃষ্টিতে ডুবে না যায়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
জমি কাদা করে চাষ, শেষ চাষে কম্পোস্ট বা স্লারি। মাটির উর্বরতা মাঝারি থাকলেই চিনিগুড়া ভালো হয়; খুব উর্বর জমিতে গাছ ঝোপালো হয়ে হেলে পড়তে পারে। সারি সোজা রাখলে নিড়ানি সহজ হয় আর বাতাস চলাচলে রোগ কম হয়।
পরিচর্যা
- কুশি আসা পর্যন্ত অল্প পানি, তারপর পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো, যাতে শিকড় গভীরে যায়।
- দুইবার নিড়ানি; আগাছা ছোট থাকতেই।
- থোড় অবস্থা থেকে দানা শক্ত হওয়া পর্যন্ত জমিতে পানি রাখা।
- পাতা মোড়ানো বা মাজরা পোকা দেখা দিলে প্রথমেই পার্চিং ও আলোর ফাঁদ।
- পাকার সময় পাখি ও ইঁদুর থেকে রক্ষা; আইলে ইঁদুরের গর্ত বন্ধ।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় অগ্রহায়ণ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর)।
অগ্রহায়ণে শিষ সোনালি হলে কাটা। কাটার পর আঁটি বেঁধে মাঠে ফেলে না রেখে দ্রুত মাড়াই ও শুকানো, কারণ শিশিরে ভিজলে দানার রং আর ঘ্রাণ নষ্ট হয়। চাল ভাঙানোর পর ঠান্ডা, শুকনো জায়গায় বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে সুগন্ধ বেশিদিন থাকে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাজরা পোকা | কুশি অবস্থায় মাঝের ডগা শুকিয়ে যায় (মরা ডিগ); পরে শিষ সাদা হয়ে চিটা হয় | আলোর ফাঁদ; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা (পার্চিং); ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট; ফসল কাটার পর নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া |
| গান্ধি পোকা | দুধ অবস্থায় দানা থেকে রস শুষে নেয়; দানা চিটা ও দাগযুক্ত, বিশেষ গন্ধ | আইল ও আশপাশের ঘাস পরিষ্কার; সকালে হাতজাল দিয়ে ধরা; শামুকের খোল বা পচা মাছের টোপে আকৃষ্ট করে ধরা |
| খোলপোড়া রোগ | পানির কাছাকাছি খোলে ধূসর-সবুজ ছোপ, পরে বড় হয়ে পাতা শুকায় | ঘন রোপণ না করা; অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নয়; মাঝে মাঝে জমির পানি নামিয়ে শুকানো |
| ব্লাস্ট রোগ | পাতায় চোখের মতো দাগ; শিষের গোড়া কালো হয়ে ভেঙে যায় | সুস্থ বীজ; পরিমিত জৈব সার; পানি ধরে রাখা |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
ধান স্বপরাগী, তাই বিশুদ্ধতার প্রধান ঝুঁকি মাঠে সংকর নয়, বরং মাড়াই ও শুকানোর সময় অন্য ধানের সাথে মিশে যাওয়া। চিনিগুড়ার বীজ সবসময় আলাদা পলিথিনে মাড়াই করে আলাদা পাত্রে রাখুন।
- জমির সবচেয়ে সুস্থ ও সমান অংশ বীজের জন্য আলাদা চিহ্নিত করুন।
- ফুল আসার সময় আর পাকার আগে জাতের সাথে না মেলা গাছ (বেশি লম্বা, ভিন্ন রঙের, আগে বা পরে পাকা) গোড়া থেকে তুলে ফেলুন।
- শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ দানা সোনালি হলে বীজের অংশ আলাদা করে কাটুন, অন্য ধানের সাথে মেশাবেন না।
- পরিষ্কার পলিথিন বা চাটাইয়ের ওপর আলাদা মাড়াই করুন।
- দুই-তিন দিন রোদে শুকান, যতক্ষণ না দাঁতে কামড় দিলে দানা শক্ত লাগে আর কট করে ভাঙে।
- কুলায় ঝেড়ে চিটা ও ধুলা বাদ দিন, ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী ড্রাম বা টিনে শুকনো নিমপাতাসহ রাখুন।
- বোনার আগে লবণ পানিতে (যেখানে একটি ডিম ভাসে) বীজ দিলে হালকা চিটা ভেসে ওঠে; শুধু ডুবে থাকা ভারী বীজ ধুয়ে বীজতলায় দিন।
বীজের আয়ু
সুগন্ধি ধানের বীজ সাধারণ ধানের মতোই আচরণ করে। প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ রাখা হবে; আগের বছরের বীজ নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে, বোনার আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করে।
পুষ্টিগুণ
শর্করার প্রধান উৎস, সাথে আমিষ ও সামান্য খনিজ। কম ছাঁটা চালে বি ভিটামিন ও আঁশ বেশি থাকে। সুগন্ধি চাল সাধারণত অল্প পরিমাণে, বিশেষ রান্নায় খাওয়া হয়, তাই প্রতিদিনের ভাতের জন্য খামারের অন্য আমন ও আউশ চাল।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।