আউশ ধান (দেশি)
চৈত্র-বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বোনা, আষাঢ়-শ্রাবণে কাটা স্বল্পমেয়াদি ধান। খরা সহ্য করে, সেচ কম লাগে, আর আমনের আগে জমি খালি থাকার সময়টা কাজে লাগায়।
- নাম
- আউশ ধান (দেশি) · Local Aus rice · Oryza sativa
- পরিবার
- ঘাসজাতীয় (পোয়েসি)
- জাতের ধরন
- দেশি আউশ, অথবা ব্রি-র ইনব্রেড আউশ; বীজ রাখা যায়
- মৌসুম
- খরিফ-১
- বপন বা রোপণ
- চৈত্র–বৈশাখ (মধ্য মার্চ – মধ্য মে)
- দূরত্ব
- সারিতে বুনলে সারি থেকে সারি প্রায় ২০–২৫ সেমি; রোপণে ২০ × ১৫ সেমি
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ১০০–১১৫ দিন · আষাঢ়–শ্রাবণ
- বীজ সংগ্রহ
- আষাঢ়–শ্রাবণ
- বীজের আয়ু
- বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় এক বছর বা কিছু বেশি
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি আউশের মধ্যে কটকতারা, হাশিকলমি, দুলারের মতো জাত পরিচিত; এলাকাভেদে আরও নানা নাম আছে। এরা দ্রুত বাড়ে, খরা আর অনিয়মিত বৃষ্টি সহ্য করে, আর আলোক-সংবেদনশীল নয়, তাই বোনার তারিখ ধরে মোটামুটি একই সময়ে পাকে। ফলন মাঝারি, তবে কম খরচ আর কম পানিতে চাষ হয়।
বিকল্প হিসেবে ব্রি-র ইনব্রেড আউশ জাত, যেমন ব্রি ধান৪৮, বীজ রেখে চাষ করা যায়। আমাদের খামারে আউশ মূলত এক বা দুই খণ্ডে, যাতে এরপর আমনের জন্য জমি সময়মতো খালি হয়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আউশ ধান (দেশি) বোনা বা রোপণ করা হয় চৈত্র–বৈশাখ (মধ্য মার্চ – মধ্য মে), যা খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।
চৈত্র-বৈশাখে প্রথম কালবৈশাখী বা ভালো বৃষ্টির পর মাটিতে জো এলে সরাসরি ছিটিয়ে বা সারিতে বোনা হয়; চাইলে বীজতলায় চারা করে রোপণও করা যায়। ছিটিয়ে বুনলে প্রতি শতাংশে আনুমানিক ৩০০–৩৫০ গ্রাম বীজ, সারিতে বুনলে কম।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
শুকনো জমি কয়েকবার চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে করা হয়, শেষ চাষে কম্পোস্ট। সরাসরি বোনা আউশে আগাছাই সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাই সারিতে বোনা ভালো: দুই সারির মাঝে নিড়ানি যন্ত্র বা হাত চালানো যায়। বোনার পর হালকা মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিলে পাখি কম খায়।
পরিচর্যা
- বোনার দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম নিড়ানি, আর এক মাস পর দ্বিতীয়বার; আউশের জন্য এটাই সবচেয়ে জরুরি কাজ।
- বৃষ্টি দেরিতে এলে পুকুর থেকে এক-দুটি হালকা সেচ।
- চারা ঘন হলে পাতলা করা; তুলে ফেলা চারা দিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ।
- জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে হেলে পড়া গাছ দ্রুত সোজা করে বেঁধে দেওয়া।
- পাকার সময় বর্ষা শুরু হয়, তাই কাটার জন্য রোদের দিনের পূর্বাভাস দেখা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় আষাঢ়–শ্রাবণ (মধ্য জুন – মধ্য আগস্ট)।
আষাঢ়-শ্রাবণে আউশ পাকে, তখন বর্ষা চলছে। তাই কাটার পর শুকানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বারান্দা বা ছাউনির নিচে মাচায় আঁটি শুকানো, রোদ উঠলে দ্রুত মাড়াই। বীজের অংশ আরও যত্ন করে শুকাতে হবে; প্রয়োজনে কয়েক দিন ধরে অল্প অল্প রোদে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| আগাছা | ধানের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ধানের চারা ঢেকে ফেলে | সারিতে বোনা; সময়মতো দুইবার নিড়ানি; বোনার আগে কয়েকবার চাষ দিয়ে আগাছা গজাতে দিয়ে নষ্ট করা |
| মাজরা পোকা | কুশি অবস্থায় মাঝের ডগা শুকিয়ে যায় (মরা ডিগ); পরে শিষ সাদা হয়ে চিটা হয় | আলোর ফাঁদ; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা (পার্চিং); ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট; ফসল কাটার পর নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া |
| পাতা পোড়া (ব্যাকটেরিয়াজনিত) | পাতার আগা থেকে কিনারা ধরে হলুদ থেকে শুকিয়ে যায় | সুস্থ বীজ; ঝড়ের পর আক্রান্ত জমির পানি অন্য জমিতে না যাওয়া; পরিমিত নাইট্রোজেন |
| ইঁদুর | গাছ কেটে ফেলে, শিষ খায় | আইল পরিষ্কার ও সরু রাখা; গর্ত বন্ধ; বাঁশের ফাঁদ; পেঁচার বসার জায়গা |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
স্বপরাগী, তাই মাঠে সংকরের ঝুঁকি কম। প্রধান সতর্কতা হলো বর্ষায় ভেজা অবস্থায় বীজ একসাথে জমা না রাখা, কারণ তাতে গজিয়ে যায় বা ছত্রাক ধরে।
- জমির সবচেয়ে সুস্থ ও সমান অংশ বীজের জন্য আলাদা চিহ্নিত করুন।
- ফুল আসার সময় আর পাকার আগে জাতের সাথে না মেলা গাছ (বেশি লম্বা, ভিন্ন রঙের, আগে বা পরে পাকা) গোড়া থেকে তুলে ফেলুন।
- শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ দানা সোনালি হলে বীজের অংশ আলাদা করে কাটুন, অন্য ধানের সাথে মেশাবেন না।
- পরিষ্কার পলিথিন বা চাটাইয়ের ওপর আলাদা মাড়াই করুন।
- বর্ষার মধ্যে শুকাতে হয়, তাই ছাউনির নিচে মাচায় পাতলা করে ছড়ান, আর রোদ উঠলেই রোদে দিন; ভেজা বীজ গাদা করে রাখবেন না।
- দাঁতে কামড়ে শক্ত হলে কুলায় ঝেড়ে বায়ুরোধী পাত্রে নিমপাতাসহ রাখুন।
- বোনার আগে লবণ পানিতে (যেখানে একটি ডিম ভাসে) বীজ দিলে হালকা চিটা ভেসে ওঠে; শুধু ডুবে থাকা ভারী বীজ ধুয়ে বীজতলায় দিন।
বীজের আয়ু
আউশের বীজ শ্রাবণে সংগ্রহ হয়ে পরের চৈত্র পর্যন্ত রাখতে হয়। বর্ষায় সংগ্রহ বলে শুরুতে আর্দ্রতা বেশি থাকে; ভালোভাবে শুকানো না হলে আয়ু অনেক কমে। তাই প্রতি বছর নতুন বীজ, আর বোনার আগে অবশ্যই অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা।
পুষ্টিগুণ
আউশের চাল সাধারণত একটু মোটা, কিছু দেশি জাতে লালচে। শর্করার সাথে আমিষ, আর লাল বা কম ছাঁটা চালে আঁশ, বি ভিটামিন ও খনিজ বেশি। বর্ষার শুরুতে ঘরে নতুন চাল আসে বলে আমন পর্যন্ত সংসার চালাতে আউশ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।