সীড ব্যাংক · ধান

বোরো ধান

শীতে রোপণ, গ্রীষ্মে কাটা সেচনির্ভর ধান। দেশে সবচেয়ে বেশি চাল আসে বোরো থেকে, কিন্তু পানি লাগে অনেক; তাই আমাদের খামারে বোরো থাকবে ছোট এক খণ্ডে।

দেশি ও ইনব্রেড · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়রবি
নাম
বোরো ধান · Boro rice (local and inbred) · Oryza sativa
পরিবার
ঘাসজাতীয় (পোয়েসি)
জাতের ধরন
হাওরের দেশি বোরো বা ব্রি-র ইনব্রেড বোরো; হাইব্রিড বোরো বাদ
মৌসুম
রবি
বপন বা রোপণ
অগ্রহায়ণ–মাঘ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ২০ সেমি, গোছা থেকে গোছা প্রায় ১৫ সেমি; প্রতি গোছায় ২–৩টি চারা
ফসল তোলা
বীজতলা থেকে প্রায় ১৪০–১৬০ দিন · বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ
বীজ সংগ্রহ
বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ
বীজের আয়ু
বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় এক থেকে দুই বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

হাওর অঞ্চলে কিছু দেশি বোরো জাত (যেমন টেপি বোরো, রাতা বোরো) এখনো টিকে আছে, তবে বিরল। দেশের বেশির ভাগ বোরো এখন ব্রি-র ইনব্রেড জাত (যেমন ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯ বা নতুন অনুমোদিত ইনব্রেড জাত), যাদের বীজ রাখা যায়। বাজারে বোরো মৌসুমে প্রচুর হাইব্রিড ধানের বীজ বিক্রি হয়; প্যাকেটে “হাইব্রিড” লেখা থাকলে সেটি আমাদের খামারে চলবে না।

বোরোতে সবচেয়ে বেশি সেচ লাগে। আমাদের পুকুর আর নলকূপের পানির হিসাব দেখে প্রতি বছর ঠিক হবে বোরো কতটুকু জমিতে হবে; শুকনো বছরে বোরোর জায়গায় মসুর বা সরিষাও থাকতে পারে।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বোরো ধান বোনা বা রোপণ করা হয় অগ্রহায়ণ–মাঘ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি), যা রবি মৌসুমের অংশ।

অগ্রহায়ণ-পৌষে বীজতলা। পৌষ-মাঘের শৈত্যপ্রবাহে চারা হলুদ হয়ে মরে যেতে পারে, তাই রাতে বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিনে ঢেকে সকালে খুলে দেওয়া, আর বীজতলায় সবসময় পানি রাখা। চারার বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ-পঁয়তাল্লিশ দিনে পৌষ-মাঘে রোপণ। মূল জমির প্রতি শতাংশে আনুমানিক ১০০–১২০ গ্রাম বীজ।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

জমি কাদা করে চাষ, শেষ চাষে কম্পোস্ট। বোরোর জমিতে আইল খুব ভালো করে মেরামত করতে হবে, যাতে সেচের পানি চুইয়ে না যায়। পুকুর থেকে নালা বা পাইপে পানি আনার পথ আগে থেকে তৈরি রাখা।

পরিচর্যা

  • পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতি: জমিতে একটি ছিদ্রযুক্ত পাইপ পুঁতে পানির স্তর দেখা; পানি মাটির নিচে কিছুটা নামলে তবেই আবার সেচ। এতে উল্লেখযোগ্য পানি বাঁচে।
  • ফুল আসার সময় জমিতে পানি রাখা জরুরি; তখন শুকাতে দেওয়া যাবে না।
  • দুইবার নিড়ানি; সেচের জমিতে আগাছা দ্রুত বাড়ে।
  • চৈত্রের গরমে বাদামি গাছফড়িংয়ের দিকে নজর; গোড়ায় পোকা দেখলে পানি নামিয়ে রাখা।
  • পুকুরের পানির মাপকাঠি নির্দিষ্ট দাগের নিচে নামলে বোরোতে সেচ কমানো, মাছকে অগ্রাধিকার।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ (মধ্য এপ্রিল – মধ্য জুন)।

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বোরো পাকে, ঠিক কালবৈশাখী আর আগাম বৃষ্টির সময়। তাই শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ পাকলেই দেরি না করে কাটা, আর দ্রুত মাড়াই করে রোদে শুকানো। খড় শুকিয়ে মাচায়।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

বোরো ধান-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
মাজরা পোকাকুশি অবস্থায় মাঝের ডগা শুকিয়ে যায় (মরা ডিগ); পরে শিষ সাদা হয়ে চিটা হয়আলোর ফাঁদ; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা (পার্চিং); ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট; ফসল কাটার পর নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া
বাদামি গাছফড়িংগাছের গোড়ায় বাদামি পোকা; চক্রাকারে গাছ শুকিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়ঘন করে রোপণ না করা; গোড়া দেখে নিয়মিত পরিদর্শন; জমির পানি কয়েক দিন নামিয়ে রাখা; মাকড়সা ও উপকারী পোকা রক্ষা
ঠান্ডাজনিত ক্ষতিবীজতলায় চারা হলুদ, বৃদ্ধি থেমে যায়রাতে পলিথিনে ঢাকা; বীজতলায় পানি রাখা; সকালে পানি বদলে দেওয়া
ব্লাস্ট রোগপাতায় চোখের মতো দাগ; শিষের গোড়া পচে যায়সুস্থ বীজ; সুষম জৈব সার; ফুল আসার সময় পানি ধরে রাখা

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

স্বপরাগী, তাই বিশুদ্ধতা রক্ষা সহজ। একাধিক বোরো জাত থাকলে আলাদা খণ্ডে, আর বীজের জন্য আলাদা কাটা ও মাড়াই।

  1. জমির সবচেয়ে সুস্থ ও সমান অংশ বীজের জন্য আলাদা চিহ্নিত করুন।
  2. ফুল আসার সময় আর পাকার আগে জাতের সাথে না মেলা গাছ (বেশি লম্বা, ভিন্ন রঙের, আগে বা পরে পাকা) গোড়া থেকে তুলে ফেলুন।
  3. শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ দানা সোনালি হলে বীজের অংশ আলাদা করে কাটুন, অন্য ধানের সাথে মেশাবেন না।
  4. পরিষ্কার পলিথিন বা চাটাইয়ের ওপর আলাদা মাড়াই করুন।
  5. দুই-তিন দিন রোদে শুকান, যতক্ষণ না দাঁতে কামড় দিলে দানা শক্ত লাগে আর কট করে ভাঙে।
  6. কুলায় ঝেড়ে চিটা ও ধুলা বাদ দিন, ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী ড্রাম বা টিনে শুকনো নিমপাতাসহ রাখুন।
  7. বোনার আগে লবণ পানিতে (যেখানে একটি ডিম ভাসে) বীজ দিলে হালকা চিটা ভেসে ওঠে; শুধু ডুবে থাকা ভারী বীজ ধুয়ে বীজতলায় দিন।

বীজের আয়ু

বোরোর বীজ বৈশাখে সংগ্রহ হয়ে পরের অগ্রহায়ণ পর্যন্ত, পুরো বর্ষা পার করে রাখতে হয়। তাই বায়ুরোধী পাত্র আর আর্দ্রতা শোষক এখানে অপরিহার্য। বীজতলায় দেওয়ার আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা।

পুষ্টিগুণ

প্রতিদিনের ভাতের চাল: শর্করা, আমিষ, আর কম ছাঁটা হলে বি ভিটামিন ও আঁশ। বৈশাখে ঘরে নতুন চাল আসায় আমনের আগের মাসগুলোতে বোরো খাদ্য নিরাপত্তা দেয়। তবে পানির খরচ বিবেচনায় আমাদের খামারে আমন আর আউশই প্রধান।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।