সীড ব্যাংক · ধান

আমন ধান (দেশি)

বর্ষার পানিতে বেড়ে ওঠা আমন ধান বাংলার প্রধান ধান। খামারের বেশির ভাগ প্রতিদিনের চাল আসবে এই মৌসুম থেকে, দেশি জাতে।

দেশি ও ইনব্রেড · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-১খরিফ-২
নাম
আমন ধান (দেশি) · Local Aman rice (e.g. Nizershail) · Oryza sativa
পরিবার
ঘাসজাতীয় (পোয়েসি)
জাতের ধরন
দেশি জাত, অথবা ব্রি-র ইনব্রেড আমন; উভয়ের বীজ রাখা যায়
মৌসুম
খরিফ-১, খরিফ-২
বপন বা রোপণ
আষাঢ়–ভাদ্র (মধ্য জুন – মধ্য সেপ্টেম্বর)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ২০–২৫ সেমি, গোছা থেকে গোছা প্রায় ১৫–২০ সেমি; প্রতি গোছায় ২–৩টি চারা
ফসল তোলা
জাতভেদে বীজতলা থেকে প্রায় ১৩০–১৫০ দিন · কার্তিক–অগ্রহায়ণ
বীজ সংগ্রহ
কার্তিক–অগ্রহায়ণ
বীজের আয়ু
বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় এক থেকে দুই বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

আমন মৌসুমের দেশি জাতের মধ্যে নাইজারশাইল সবচেয়ে পরিচিত: চিকন, সুস্বাদু দানা, লম্বা জীবনকাল। এ ছাড়া এলাকাভেদে রাজাশাইল, বাদশাভোগের মতো জাত টিকে আছে। দেশি আমন সাধারণত আলোক-সংবেদনশীল, গাছ লম্বা, বর্ষার হঠাৎ জলাবদ্ধতা কিছুটা সহ্য করতে পারে, আর কম সারেও চলে।

দেশি জাত না পেলে বা জমির একাংশে বাড়তি ফলন দরকার হলে ব্রি-র ইনব্রেড আমন জাত, যেমন ব্রি ধান৪৯ বা জলমগ্নতা সহনশীল কোনো জাত, ব্যবহার করা যায়; এদের বীজও রাখা যায়। নামের সাথে “হাইব্রিড” থাকা কোনো জাত নয়। কোন জাত বাছাই হলো, তা মৌসুমি পরিকল্পনা সভায় ঠিক হবে।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমন ধান (দেশি) বোনা বা রোপণ করা হয় আষাঢ়–ভাদ্র (মধ্য জুন – মধ্য সেপ্টেম্বর), যা খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।

আষাঢ়-শ্রাবণে বীজতলা, চারার বয়স প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ দিনে শ্রাবণ-ভাদ্রে রোপণ। দেরিতে রোপণের জন্য দেশি জাত তুলনামূলক উপযোগী। মূল জমির প্রতি শতাংশে আনুমানিক ৮০–১২০ গ্রাম বীজ। বর্ষার ভারী বৃষ্টিতে বীজতলা যাতে না ডোবে, তাই উঁচু জায়গায়; প্রয়োজনে ভাসমান বা দাপোগ বীজতলা।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

আমন জমিতে বর্ষার বৃষ্টির পানিই প্রধান সেচ। জমি কাদা করে চাষ, আইল উঁচু ও মজবুত, যাতে পানি ধরে রাখা যায় আবার অতিরিক্ত পানি বের করা যায়। শেষ চাষে কম্পোস্ট বা শুকনো স্লারি। আগের রবি মৌসুমে ডাল (মসুর বা খেসারি) থাকলে মাটিতে নাইট্রোজেন বাড়ে, আমনের জন্য তা উপকারী।

পরিচর্যা

  • রোপণের পর আগাছা ছোট থাকতেই দুইবার নিড়ানি।
  • বর্ষায় জমিতে অতিরিক্ত পানি জমলে আইলের নালা দিয়ে বের করা।
  • কুশি আসার সময় জৈব তরল সার (পাতলা স্লারি) দেওয়া যায়।
  • পার্চিং আর আলোর ফাঁদে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকা নিয়ন্ত্রণ।
  • ধান কাটার এক-দুই সপ্তাহ আগে খেসারির বীজ ছিটিয়ে সাথী ফসল (রিলে চাষ) শুরু করা যায়।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–অগ্রহায়ণ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ডিসেম্বর)।

কার্তিক-অগ্রহায়ণে, নবান্নের মৌসুমে আমন কাটা হয়। শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ পাকলে কাটা, তারপর দ্রুত মাড়াই আর রোদে শুকানো। খড় আঁটি বেঁধে উঁচু মাচায় রাখা হবে গরুর খাবারের জন্য; কিছু খড় কম্পোস্ট আর মালচিংয়ে যাবে।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

আমন ধান (দেশি)-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
মাজরা পোকাকুশি অবস্থায় মাঝের ডগা শুকিয়ে যায় (মরা ডিগ); পরে শিষ সাদা হয়ে চিটা হয়আলোর ফাঁদ; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা (পার্চিং); ডিমের গাদা হাতে তুলে নষ্ট; ফসল কাটার পর নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া
পাতা মোড়ানো পোকাপাতা লম্বালম্বি মুড়িয়ে ভেতরে সবুজ অংশ খায়, পাতায় সাদা দাগপার্চিং; অতিরিক্ত নাইট্রোজেন না দেওয়া; আক্রমণ বেশি হলে দড়ি টেনে পাতা ঝাঁকিয়ে পোকা পানিতে ফেলা
বাদামি গাছফড়িংগাছের গোড়ায় বাদামি পোকা; চক্রাকারে গাছ শুকিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায়ঘন করে রোপণ না করা; গোড়া দেখে নিয়মিত পরিদর্শন; জমির পানি কয়েক দিন নামিয়ে রাখা; মাকড়সা ও উপকারী পোকা রক্ষা
বাকানি রোগকিছু চারা অস্বাভাবিক লম্বা, ফ্যাকাশে; পরে মরে যায়বীজবাহিত রোগ: সুস্থ জমির বীজ, লবণ পানিতে বীজ বাছাই; আক্রান্ত চারা তুলে ফেলা

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

স্বপরাগী ধানে মাঠে সংকরের ঝুঁকি কম। দেশি আর ব্রি-র জাত দুটোই চাষ করলে আলাদা খণ্ডে রাখুন, আর বীজের অংশ আলাদা কেটে আলাদা মাড়াই করুন।

  1. জমির সবচেয়ে সুস্থ ও সমান অংশ বীজের জন্য আলাদা চিহ্নিত করুন।
  2. ফুল আসার সময় আর পাকার আগে জাতের সাথে না মেলা গাছ (বেশি লম্বা, ভিন্ন রঙের, আগে বা পরে পাকা) গোড়া থেকে তুলে ফেলুন।
  3. শিষের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ দানা সোনালি হলে বীজের অংশ আলাদা করে কাটুন, অন্য ধানের সাথে মেশাবেন না।
  4. পরিষ্কার পলিথিন বা চাটাইয়ের ওপর আলাদা মাড়াই করুন।
  5. দুই-তিন দিন রোদে শুকান, যতক্ষণ না দাঁতে কামড় দিলে দানা শক্ত লাগে আর কট করে ভাঙে।
  6. কুলায় ঝেড়ে চিটা ও ধুলা বাদ দিন, ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী ড্রাম বা টিনে শুকনো নিমপাতাসহ রাখুন।
  7. বোনার আগে লবণ পানিতে (যেখানে একটি ডিম ভাসে) বীজ দিলে হালকা চিটা ভেসে ওঠে; শুধু ডুবে থাকা ভারী বীজ ধুয়ে বীজতলায় দিন।

বীজের আয়ু

আমনের বীজ অগ্রহায়ণে সংগ্রহ হয়ে পরের আষাঢ় পর্যন্ত, প্রায় সাত-আট মাস রাখতে হয়, যার মধ্যে বর্ষার শুরুর আর্দ্র সময়ও পড়ে। তাই শুকানো আর বায়ুরোধী পাত্র এখানে সবচেয়ে জরুরি। বোনার দুই-তিন সপ্তাহ আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করুন।

পুষ্টিগুণ

আমনের চাল খামারের প্রতিদিনের ভাতের প্রধান উৎস। শর্করার পাশাপাশি আমিষ, আর কম ছাঁটা চালে বি ভিটামিন, ম্যাগনেশিয়াম ও আঁশ। সেদ্ধ (পারবয়েল্ড) চালে কিছু পুষ্টি দানার ভেতরে চলে যায়, তাই পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী সেদ্ধ বা আতপ দুই রকমই করা যাবে।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।