রুই
বাঙালির পাতে মাছ মানেই প্রায়শ রুই। আমাদের বড় পুকুরের মিশ্র চাষে রুই হবে প্রধান মাছ, মাঝের স্তরের খাবার কাজে লাগিয়ে।
- নাম
- রুই · Rohu · Labeo rohita
- পরিবার
- কার্পজাতীয় (সাইপ্রিনিডি)
- পানির স্তর
- মাঝের স্তর
- কোন পুকুরে
- বড় পুকুর
- খাদ্যাভ্যাস
- উদ্ভিদকণা, পচা জৈব কণা ও সম্পূরক খাবার
- মজুদ ঘনত্ব
- প্রতি শতাংশে প্রায় ৮–১০টি পোনা (৮–১০ সেমি)
- বৃদ্ধি ও আহরণ
- এক বছরে প্রায় ১–১.৫ কেজি
পরিচিতি
রুই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্প মাছ। শরীর লম্বাটে, আঁশ লালচে-রুপালি, মুখ সামান্য নিচের দিকে। নদী থেকে আসা দেশি রুইয়ের স্বাদ বিখ্যাত, তবে পুকুরে চাষের পোনা আসে মূলত হ্যাচারি থেকে। রুই পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে ডিম পাড়ে না; তাই প্রতি বছর বা দুই বছরে বিশ্বস্ত হ্যাচারি বা নার্সারি থেকে সুস্থ পোনা কিনতে হবে।
আমাদের খামারে রুই বড় পুকুরের মিশ্র চাষের কেন্দ্র। উপরের স্তরে কাতলা আর তলায় মৃগেল-কালিবাউশের সাথে একসাথে থাকলে পুকুরের প্রতিটি স্তরের খাবার কাজে লাগে, আর কেউ কারও সাথে বেশি প্রতিযোগিতা করে না।
কোন পুকুরে, কোন স্তরে
রুই পানির মাঝের স্তরে চলাফেরা করে আর সেখানে ভাসমান উদ্ভিদকণা, পচা জৈব কণা ও জলজ উদ্ভিদের নরম অংশ খায়। প্রায় দুই মিটার গভীর বড় পুকুর তার জন্য আদর্শ। ছোট পুকুর জিওল মাছ আর হাঁসের জন্য রাখা, তাই রুই সেখানে নয়।
মজুদ ঘনত্ব
জৈব, কম খরচের ব্যবস্থায় প্রতি শতাংশে প্রায় ৮–১০টি আঙুলের মাপের (৮–১০ সেমি) পোনা। আমাদের প্রায় ২৫ শতাংশের বড় পুকুরে সেই হিসেবে মোটামুটি ২০০–২৫০টি রুই। খুব ছোট রেণু বা ধানি পোনা সরাসরি বড় পুকুরে ছাড়লে শোল বা অন্য শিকারি মাছে খেয়ে ফেলে, আর মৃত্যুহারও বেশি। মোট সংখ্যা ঠিক করতে মিশ্র চাষের হিসাব যন্ত্র ব্যবহার করুন।
খাবার
প্রাকৃতিক খাবারই প্রধান: পুকুরে পরিমিত পচা গোবর বা স্লারি দিলে উদ্ভিদকণা বাড়ে। সম্পূরক খাবার হিসেবে চালের কুঁড়া আর আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা সরিষার খৈল, দিনে একবার, নির্দিষ্ট জায়গায়। পরিমাণ মাছের মোট ওজনের প্রায় ২–৩ শতাংশ, শীতে কম। খাবারের থালা বা ট্রে দিয়ে দেখুন খাবার শেষ হচ্ছে কি না; বেঁচে গেলে পরের দিন কমান। বিস্তারিত জৈব খাদ্য পাতায়।
বৃদ্ধি ও আহরণ
ভালো পানি আর পরিমিত খাবারে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে ছাড়া পোনা পরের শীতের মধ্যে প্রায় এক থেকে দেড় কেজি হতে পারে; জৈব ব্যবস্থায় বৃদ্ধি কিছুটা ধীর হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা পুরো পুকুর একবারে খালি করব না; কার্তিক থেকে পৌষে বড় মাছগুলো জাল টেনে আংশিক আহরণ করব, ছোটগুলো আরও বড় হতে থাকবে, আর আহরণের সমান সংখ্যক নতুন পোনা পরের বসন্তে ছাড়া হবে।
প্রজনন ও পোনা
রুই বদ্ধ পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে না; হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননে পোনা তৈরি হয়। তাই পোনা কেনার সময় সরকারি মৎস্য খামার বা সুনামধারী হ্যাচারি বেছে নিন, যারা ভালো মা-মাছ ব্যবহার করে। পোনা আনার পর পুকুরের পানির সাথে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে (পোনার পাত্রে অল্প অল্প পুকুরের পানি মিশিয়ে) তারপর ছাড়তে হবে।
কার সাথে চলে
| সঙ্গী | সামঞ্জস্য | কারণ |
|---|---|---|
| কাতলা | একসাথে চলে | উপরের স্তরে থাকে, প্রতিযোগিতা কম |
| মৃগেল ও কালিবাউশ | একসাথে চলে | তলার স্তরে থাকে |
| গলদা | একসাথে চলে | সীমিত সংখ্যায় একসাথে চলে |
| পুঁটি, মলা, টেংরা | একসাথে চলে | ছোট মাছ, খাবার আলাদা |
| তেলাপিয়া | সতর্কতায় চলে | বেশি বাচ্চা দিয়ে খাবারে ভাগ বসায় |
| শোল | সতর্কতায় চলে | ছোট পোনা খেয়ে ফেলে; বড় পোনা ছাড়তে হবে |
রোগ ও জৈব প্রতিরোধ
| সমস্যা | লক্ষণ | প্রতিরোধ ও করণীয় |
|---|---|---|
| ক্ষত রোগ (লাল দাগ) | শীতে গায়ে লাল দাগ, পরে গভীর ক্ষত; মাছ দুর্বল | শীতের আগে চুন দিয়ে পিএইচ ঠিক রাখা; তলার পচা কাদা কমানো; শীতে খাবার ও সার কমানো; আক্রান্ত মাছ তুলে ফেলা |
| উকুন (আর্গুলাস) | গায়ে চ্যাপ্টা স্বচ্ছ পরজীবী, মাছ পাড়ে গা ঘষে | মজুদের আগে পুকুর শুকিয়ে চুন দেওয়া; পোনা লবণ পানিতে ধুয়ে ছাড়া; আক্রমণ বেশি হলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ |
| ফুলকা পচা | ফুলকা ফ্যাকাশে বা পচা, মাছ পানির ওপরে খাবি খায় | অতিরিক্ত খাবার ও সার বন্ধ; নতুন পানি দেওয়া; পানি নাড়িয়ে অক্সিজেন বাড়ানো |
| অক্সিজেন ঘাটতি | ভোরে মাছ পানির ওপরে মুখ তুলে খাবি খায় | খাবার ও সার বন্ধ; নতুন পানি; বাঁশ দিয়ে পানি পেটানো; মেঘলা গুমোট দিনে বিশেষ সতর্কতা |
খামারে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন বা রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার হবে না; প্রতিরোধের মূল উপায় পানির মান, সঠিক ঘনত্ব আর সুস্থ পোনা। রোগ ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিন। বিস্তারিত পানির গুণমান পাতায়।
পুষ্টিগুণ ও রান্না
রুই উচ্চমানের আমিষের ভালো উৎস, সাথে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম আর কিছু ওমেগা-৩ চর্বি। মাথা ও কাঁটার কাছের অংশে ক্যালসিয়াম আর চর্বি বেশি। ঝোল, কালিয়া, দই-রুই, মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট, নানা রান্না। জৈব পুকুরের মাছে কাদার গন্ধ এড়াতে আহরণের কয়েক দিন আগে থেকে খাবার কমিয়ে পরিষ্কার পানি দেওয়া ভালো।
কোন মাছ কোন অনুপাতে একসাথে থাকবে, তার হিসাব মিশ্র চাষ মডেল পাতায়; খাবার তৈরির পদ্ধতি জৈব খাদ্য পাতায়।