প্রাণিসম্পদ

দেশি গরু ও রেড চিটাগং

দেশি গরু ছোট, কিন্তু শক্ত, কম খাবারে চলে, আর আমাদের গরম-আর্দ্র আবহাওয়া সহ্য করে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের লালচে রেড চিটাগং জাত দেশি গরুর মধ্যেও দুধের জন্য সুপরিচিত।

≈ ৫টিশুরুতে গাভী ও বাছুর মিলিয়ে
১৪ × ১০ মিখোলা বাতাসের গোয়ালঘর
≈ ৫০ কেজিদৈনিক গোবর, বায়োগ্যাসের জন্য
বছরে ২ক্ষুরা রোগের টিকা

জাত বাছাই

আমাদের খামারে থাকবে দেশি গরু, যার মধ্যে রেড চিটাগং ক্যাটল (লাল চাটগাঁইয়া) প্রাধান্য পাবে। এরা আকারে ছোট থেকে মাঝারি, গায়ের রং লালচে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো আর দেশি গরুর মধ্যে তুলনামূলক বেশি দুধ দেয়। বিদেশি বা সংকর জাতের গাভী বেশি দুধ দিলেও তাদের দানাদার খাবার, ঠান্ডা ঘর আর চিকিৎসার খরচ অনেক বেশি; জৈব, অল্প খরচের পারিবারিক খামারের সাথে তা মেলে না।

গরু কেনা হবে বিশ্বস্ত খামারি বা পরিচিত কৃষকের কাছ থেকে, হাট থেকে নয়, যাতে বয়স, স্বাস্থ্য আর টিকার ইতিহাস জানা যায়। নতুন গরু খামারে আনার পর অন্তত দুই সপ্তাহ আলাদা রেখে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

কয়টি গরু

শুরুতে প্রায় পাঁচটি: দুই-তিনটি গাভী, একটি বকনা আর বাছুর। এই সংখ্যার পেছনে দুটি হিসাব। প্রথমত, বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের হিসাবে প্রায় পাঁচটি গরুর গোবরে, দিনে আনুমানিক ৫০ কেজি, পারিবারিক রান্নার গ্যাস হয়। দ্বিতীয়ত, ঘাসের জোগান। একটি দেশি গরুর দিনে কয়েক আঁটি কাঁচা ঘাস লাগে, আর খামারের ঘাসের প্লট একা তা মেটাতে পারে না; তাই ধানের খড়, আইল ও পুকুরপাড়ের ঘাস আর কেটে আনা ঘাস মিলিয়ে চলতে হবে। হিসাব ঘাস ও গো-খাদ্য পাতার যন্ত্রে।

গোয়ালঘর

  • মাপ: প্রায় ১৪ × ১০ মিটার, খোলা পাশ, তিন দিকে এক মিটার উঁচু ইটের দেয়াল, ওপরে টিনের দোচালা ছাদ। প্রতিটি বড় গরুর জন্য ছাদের নিচে অন্তত আড়াই-তিন বর্গমিটার, বাকিটা বাছুর ও চলাফেরার জায়গা।
  • মেঝে: পাকা, সামান্য ঢালু, যাতে প্রস্রাব ও পানি নালা দিয়ে বের হয়; পিচ্ছিল না হওয়ার জন্য খাঁজকাটা।
  • নালা ও গোবর: পেছনের দিকে নালা, যেখান থেকে গোবর সরাসরি পাশের বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের ইনলেটে যায়।
  • চাড়ি ও পানি: সামনের দিকে পাকা খাবারের চাড়ি, আলাদা পানির পাত্র, সবসময় পরিষ্কার পানি।
  • বাতাস ও আলো: খোলা পাশ দিয়ে বাতাস চলে; গরমে দুপুরে পাখা, রাতে একটি বাতি। শীতের রাতে উত্তর দিক চট দিয়ে ঢাকা।
  • বাইরে চলাফেরা: দিনে কয়েক ঘণ্টা গোয়ালের সামনের মাঠে বা আইলে বেঁধে চরানো; সারাদিন বেঁধে রাখা নয়।

খাদ্য

প্রাপ্তবয়স্ক দেশি গাভীর আনুমানিক দৈনিক খাদ্য
খাদ্যপ্রাপ্তবয়স্ক গাভী, দিনে (আনুমানিক)উৎস
কাঁচা ঘাসপ্রায় ১৫–২০ কেজিনেপিয়ার, পারা, আইল ও পাড়ের ঘাস
শুকনো খড়প্রায় ৩–৫ কেজিনিজেদের ধানের খড়
দানাদার মিশ্রণপ্রায় ১–২ কেজি; দুধের গাভীতে বেশিচালের কুঁড়া, গমের ভুসি, ভাঙা চাল, সরিষার খৈল, ডালের ভুসি
লবণ ও খনিজঅল্প, প্রতিদিনখাবার লবণ, খনিজ মিশ্রণ (চিকিৎসকের পরামর্শে)
পানিযত চায়; গরমে অনেক বেশিট্যাংকের পরিষ্কার পানি

খড় ইউরিয়া দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করার প্রচলিত পদ্ধতি আমরা ব্যবহার করব না, কারণ খামার রাসায়নিকমুক্ত। খড়ের পুষ্টি বাড়াতে কাঁচা ঘাস আর ডালের ভুসির সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো হবে। হঠাৎ খাবার বদলালে পেট ফাঁপা হতে পারে, তাই নতুন খাবার ধীরে ধীরে।

প্রজনন

গাভী গরম হলে (ডাকাডাকি, অস্থিরতা, যোনিপথ থেকে স্বচ্ছ শ্লেষ্মা) ১২–১৮ ঘণ্টার মধ্যে পাল দিতে হয়। আমরা দেশি বা রেড চিটাগং ষাঁড়ের সিমেন দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন, অথবা প্রতিবেশীর ভালো দেশি ষাঁড় ব্যবহার করব, যাতে জাতটি দেশিই থাকে। গর্ভকাল প্রায় নয় মাস দশ দিন। বাচ্চা জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাছুরকে শাল দুধ খাওয়ানো অপরিহার্য। প্রজননের তারিখ খাতায় লেখা থাকবে।

স্বাস্থ্য ও টিকা

গরুর টিকা ও কৃমিনাশকের সাধারণ সূচি
রোগকখন (সাধারণ সূচি)মন্তব্য
ক্ষুরা রোগ (এফএমডি)বছরে দুবার, ফাল্গুন ও ভাদ্রেমুখ ও খুরে ঘা, জ্বর; ছোঁয়াচে
তড়কা (অ্যানথ্রাক্স)বছরে একবার, চৈত্রেহঠাৎ মৃত্যু; মৃতদেহ খোলা যাবে না, মানুষেও ছড়ায়
বাদলা (ব্ল্যাক কোয়ার্টার)বর্ষার আগে, বৈশাখে; বিশেষত তরুণ গরুতেপেশি ফুলে যায়, খোঁড়ানো
গলাফোলা (হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া)বর্ষার আগে, বৈশাখেগলা ফোলা, শ্বাসকষ্ট, দ্রুত মৃত্যু
লাম্পি স্কিন রোগউপজেলা অফিসের পরামর্শেচামড়ায় গুটি; মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ জরুরি
কৃমিনাশকপ্রতি চার মাস অন্তর: জ্যৈষ্ঠ, আশ্বিন, মাঘবাছুরে বেশি জরুরি; মাত্রা ওজন অনুযায়ী
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে মিলিয়ে নিন

টিকার নাম, বয়স, মাত্রা ও পুনরাবৃত্তির সময় এলাকা, রোগের প্রাদুর্ভাব আর টিকার ধরন অনুযায়ী বদলায়। এখানে দেওয়া সূচি সাধারণ পরিকল্পনা; চূড়ান্ত সূচি উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বা নিবন্ধিত পশু চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক হবে। সরকারি টিকা সাধারণত উপজেলা অফিসে স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়।

অ্যান্টিবায়োটিক নীতি: নিয়মিত বা রোগ প্রতিরোধের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন বা বৃদ্ধিবর্ধক কখনো নয়। কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা হবে, কারণ কষ্ট দেখেও চিকিৎসা না করা পশু কল্যাণের পরিপন্থী। চিকিৎসার পর ওষুধের নির্ধারিত “প্রত্যাহার সময়” পর্যন্ত সেই প্রাণীর দুধ, ডিম বা মাংস খাওয়া হবে না, আর বিষয়টি চিকিৎসার খাতায় লেখা থাকবে।

প্রতিদিনের কাজ

  1. ভোরে গোবর পরিষ্কার করে বায়োগ্যাসের ইনলেটে, মেঝে ধোয়া।
  2. দোহন, পরিষ্কার হাতে ও পরিষ্কার পাত্রে; বিস্তারিত দুধ ও দুগ্ধজাত পাতায়।
  3. সকাল ও বিকেলে কাটা ঘাস, খড় আর দানাদার; সারাদিন পানি।
  4. দুপুরে ছায়া ও প্রয়োজনে পাখা; গা ধোয়ানো গরমের দিনে।
  5. খাওয়া, জাবর কাটা, গোবরের ধরন আর চলাফেরা দেখে অসুস্থতার লক্ষণ খোঁজা।