গোবর ব্যবস্থাপনা
জৈব খামারে গোবর বর্জ্য নয়, সম্পদ। প্রতিদিনের গোবর ঠিক পথে গেলে রান্নার গ্যাস, ক্ষেতের সার আর কেঁচোর খাবার হয়; ভুল পথে গেলে হয় দুর্গন্ধ, মাছি আর দূষিত পানি।
কোথা থেকে কত
| উৎস | দৈনিক পরিমাণ (আনুমানিক) | প্রধান গন্তব্য |
|---|---|---|
| গরু (৫টি) | প্রায় ৪০–৬০ কেজি সংগ্রহযোগ্য গোবর, দেশি গরুর আকার ও খাবার অনুযায়ী | বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট |
| ছাগল (৬টি) | অল্প, শুকনো গুটি | কেঁচো সার ও কম্পোস্ট |
| মুরগি ও হাঁস | অল্প, লিটারের সাথে মেশানো | কম্পোস্ট (নাইট্রোজেন বেশি) |
| গোয়ালের খড় ও উচ্ছিষ্ট ঘাস | পরিবর্তনশীল | কম্পোস্টের শুকনো স্তর |
গরুর গোবরের পরিমাণ বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের হিসাব যন্ত্রের ভিত্তি। প্রথম কয়েক সপ্তাহ প্রতিদিন গোবর মেপে খাতায় লিখলে প্ল্যান্টের সঠিক মাপ বোঝা যাবে।
গোবরের পথ
- সংগ্রহ: ভোরে আর বিকেলে গোয়ালের মেঝে থেকে বেলচা দিয়ে গোবর, খড় আলাদা করে।
- বায়োগ্যাস: প্রতিদিনের নির্দিষ্ট পরিমাণ গোবর সমান পানিতে মিশিয়ে ইনলেটে। গোয়াল প্ল্যান্টের পাশে বলে এই পথ কয়েক মিটার।
- বাড়তি গোবর: প্ল্যান্টের চাহিদার বাইরের অংশ সরাসরি কম্পোস্টের স্তূপে।
- স্লারি: প্ল্যান্ট থেকে বের হওয়া স্লারি ঘাসের প্লট, কম্পোস্ট বা শুকানোর বেডে; বিস্তারিত স্লারি সার পাতায়।
- ছাগল ও মুরগির বিষ্ঠা: সপ্তাহে একবার মাচার নিচ আর মুরগির ঘর থেকে লিটারসহ তুলে কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের হাউজে।
- প্রস্রাব: গোয়ালের নালা দিয়ে একটি ছোট ঢাকা গর্তে; পানিতে পাতলা করে ঘাস বা ফলগাছের গোড়ায়, অথবা কম্পোস্টের স্তূপ ভেজাতে।
পানি রক্ষা
- কাঁচা গোবর বা প্রস্রাব সরাসরি পুকুরে নয়; মাছের জন্য শুধু ভালোভাবে পচা স্লারি বা কম্পোস্ট, অল্প পরিমাণে।
- গোবরের স্তূপ ও স্লারি পিট নলকূপ থেকে নিরাপদ দূরত্বে আর নিচু দিকে।
- স্তূপ ঢাকা, যাতে বৃষ্টির পানি ধুয়ে পুকুরে না নিয়ে যায়।
- গোয়ালের নালার শেষ মাথা খোলা মাটিতে নয়, ঢাকা গর্তে।
গন্ধ ও মাছি
প্রতিদিন গোবর সরানোই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। গোয়ালের মেঝে শুকনো রাখা, কম্পোস্ট স্তূপে প্রতিবার গোবরের ওপর শুকনো খড়, পাতা বা মাটির পাতলা স্তর দেওয়া, আর স্তূপ নিয়মিত উল্টানো। বায়োগ্যাসে যাওয়া গোবর বাতাসহীন অবস্থায় থাকে, তাই এটি মাছি আর গন্ধ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়ও। মাছি বেশি হলে মাছির ফাঁদ, আর মুরগিকে তদারকিতে স্তূপের কাছে চরতে দিলে তারা কীড়া খেয়ে ফেলে।
অসুস্থ প্রাণীর গোবর
অসুস্থ বা চিকিৎসাধীন প্রাণীর গোবর আলাদা স্তূপে, পুরোপুরি পচিয়ে তবেই ব্যবহার; অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার সময় বায়োগ্যাসে কম দেওয়া, কারণ তা প্ল্যান্টের জীবাণুর ক্ষতি করতে পারে। তড়কার মতো রোগে মৃত প্রাণী বা তার গোবর কখনো খোলা জায়গায় নয়; প্রাণিসম্পদ অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা।
গোবর কতটা মূল্যবান
একটি দেশি গরুর বছরের গোবর খামারের কয়েক শতাংশ জমির বার্ষিক জৈব সারের চাহিদা মেটাতে পারে, আর বায়োগ্যাসে গেলে তার আগে রান্নার গ্যাসও দেয়। তাই গোবর বিক্রি বা ঘুঁটে বানিয়ে পোড়ানো হবে না; ঘুঁটে পোড়ালে মাটির পুষ্টি ধোঁয়া হয়ে হারিয়ে যায়। প্রতিবেশী কৃষকের কাছ থেকে খড় নিলে বিনিময়ে কিছু কম্পোস্ট বা কেঁচো সার দেওয়া হবে, যাতে আশপাশের জমিও উপকৃত হয়।
খাতা
প্রতিদিন কত কেজি গোবর বায়োগ্যাসে গেল, কতটা কম্পোস্টে, আর মাসে কত বস্তা শুকনো স্লারি বা কম্পোস্ট তৈরি হলো, তা খাতায় লেখা থাকবে। এই হিসাব থেকেই বোঝা যাবে কোন জমিতে কতটুকু জৈব সার দেওয়া সম্ভব, আর রাসায়নিক সার ছাড়া খামার চালাতে আর কী লাগবে।
কাজের স্বাস্থ্যবিধি
গোবর নিয়ে কাজের সময় বুট আর দস্তানা, কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। হাতে কাটা-ছেঁড়া থাকলে ঢেকে কাজ। শিশুরা গোবরের স্তূপ ও স্লারি পিটের কাছে একা যাবে না।