সীড ব্যাংক পরিচিতি
যে খামার প্রতি বছর বীজ কেনে, সে পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারে না। আমাদের সীড ব্যাংক হলো খামারের স্মৃতিভান্ডার: প্রতি মৌসুমের সেরা গাছের বীজ, শুকিয়ে, লেবেল দিয়ে, পরের মৌসুমের জন্য রাখা।
কেন সীড ব্যাংক
বাজারের বেশির ভাগ সবজি বীজ এখন হাইব্রিড, যার বীজ রেখে পরের বছর বুনলে একই রকম গাছ হয় না। ফলে প্রতি মৌসুমে আবার কিনতে হয়, দাম বাড়ে, আর কোন জাত পাওয়া যাবে তা বিক্রেতার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অথচ আমাদের দাদা-নানিরা প্রতি বছর লাউয়ের খোল, শিমের বিচি আর ধানের বীজ নিজেরাই রাখতেন। আমরা সেই চর্চায় ফিরতে চাই, তবে আধুনিক জ্ঞান দিয়ে: সঠিক শুকানো, বায়ুরোধী পাত্র, অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা আর লিখিত রেজিস্টার।
নিজেদের বীজের আরেকটি বড় সুবিধা হলো অভিযোজন। প্রতি বছর আমাদের মাঠে যে গাছ সবচেয়ে ভালো করে, তার বীজ রাখলে কয়েক প্রজন্মে জাতটি আমাদের মাটি, পানি আর আবহাওয়ার সাথে আরও মানিয়ে নেয়।
সীড ব্যাংকের নীতি
- হাইব্রিড নয়: যে বীজ থেকে একই রকম গাছ হয় না, তা খামারে ঢুকবে না। কারণ বিস্তারিত কেন হাইব্রিড নয় পাতায়।
- জিনগত পরিবর্তিত জাত নয়: বীজ রাখা গেলেও জিনগত প্রকৌশলে তৈরি জাত আমরা ব্যবহার করব না।
- দেশি আগে: স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী জাত প্রথম পছন্দ; না পেলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মুক্ত-পরাগায়িত বা ইনব্রেড জাত।
- প্রতিটি লট লিখিত: কোন গাছ থেকে, কবে, কতটুকু বীজ, আর পরীক্ষায় কত শতাংশ গজাল, সব রেজিস্টারে।
- ভাগ করা বীজ ফেরে: প্রতিবেশী বা আত্মীয়কে বীজ দেওয়া হবে, অনুরোধ থাকবে মৌসুম শেষে কিছু বীজ ফেরত দেওয়ার, যাতে বীজ ছড়ায় আর হারায় না।
বীজের বার্ষিক চক্র
- বাছাইমৌসুমের শুরুতেই সবচেয়ে সুস্থ, জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গাছ চিহ্নিত করা; তাদের ফল খাওয়ার জন্য তোলা হবে না।
- বিশুদ্ধতা রক্ষাঅন্য জাতের সাথে পরাগায়ন ঠেকাতে দূরত্ব, সময়ের ব্যবধান বা ফুল ঢেকে রাখা।
- সংগ্রহফল বা শুঁটি গাছেই পুরোপুরি পাকা ও শুকনো হলে তোলা।
- প্রক্রিয়াজাতভেজা বীজ ধুয়ে বা গাঁজন করে, শুকনো বীজ ঝেড়ে পরিষ্কার; তারপর ছায়ায় ও হালকা রোদে শুকানো।
- সংরক্ষণবায়ুরোধী পাত্রে, শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায়, লেবেল ও লট নম্বরসহ।
- পরীক্ষা ও বপনবোনার আগে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা, তারপর মাঠে; আর চক্র আবার শুরু।
প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত: বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি, সংরক্ষণাগার ও আর্দ্রতা, অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা আর বীজ রেজিস্টার।
প্রথম বীজ কোথা থেকে
শুরুতে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। উৎসগুলো হলো: এলাকার প্রবীণ কৃষক যাঁরা এখনো নিজের বীজ রাখেন, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় বীজ মেলা, দেশি বীজ সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন, আর সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মুক্ত-পরাগায়িত বা ইনব্রেড জাত। প্রতিটি বীজের উৎস রেজিস্টারে লেখা থাকবে, আর কেনা বীজের প্যাকেটে “হাইব্রিড” বা “এফ১” লেখা থাকলে তা ফেরত।
দায়িত্ব
একটি পরিবারের একজন সদস্য সীড ব্যাংকের প্রধান দায়িত্বশীল থাকবেন, সাথে একজন সহকারী, যাতে জ্ঞান একজনের কাছে আটকে না থাকে। প্রতি মৌসুমি পরিকল্পনা সভায় তাঁরা জানাবেন কোন বীজ কতটুকু আছে, কোনটির অঙ্কুরোদগম কমে গেছে, আর এ মৌসুমে কোন ফসলের বীজ রাখতে হবে।
ফসলভিত্তিক বীজ-পরিচিতি
প্রতিটি কার্ডের নিচের ছোট দাগগুলো বারো মাস, বৈশাখ থেকে চৈত্র: সবুজ বপন, হলুদ ফসল তোলা। একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে।
বীজ ব্যবস্থাপনার পাতা
কেন হাইব্রিড নয়
হাইব্রিড, মুক্ত-পরাগায়িত ও ইনব্রেড জাতের পার্থক্য।
বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি
বাছাই, বিশুদ্ধতা, ভেজা ও শুকনো বীজ প্রক্রিয়াকরণ।
সংরক্ষণাগার ও আর্দ্রতা
বীজঘর, পাত্র, শুকানো আর পোকা থেকে রক্ষা।
অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা
ভেজা কাপড় পদ্ধতি ও হিসাব যন্ত্র।
বীজ রেজিস্টার
লট নম্বর, তথ্যের ঘর ও নমুনা খাতা।
শস্য ক্যালেন্ডার
মাস ধরে বপন, ফসল ও বীজ সংগ্রহ।