কাকরোল
নরম কাঁটাওয়ালা ছোট সবুজ কাকরোল বর্ষার প্রিয় সবজি। এর স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা, আর বীজের চেয়ে মাটির নিচের কন্দ দিয়ে চাষই বেশি নির্ভরযোগ্য।
- নাম
- কাকরোল · Spiny gourd / Teasel gourd · Momordica dioica
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি জাত; মূলত কন্দ দিয়ে বংশবিস্তার, যাতে স্ত্রী-পুরুষ গাছ চেনা থাকে
- মৌসুম
- রবি
- বপন বা রোপণ
- মাঘ–ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য মার্চ)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১.৫–২ মিটার; মাচায়
- ফসল তোলা
- কন্দ লাগানোর প্রায় ৬০–৭০ দিনে প্রথম ফল · জ্যৈষ্ঠ–ভাদ্র
- বীজ সংগ্রহ
- আশ্বিন
- বীজের আয়ু
- কন্দ এক মৌসুম থেকে পরের মৌসুম; জীবন্ত অবস্থায় রাখতে হয়
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
কাকরোল বহুবর্ষজীবী লতা: মৌসুম শেষে লতা মরে যায়, কিন্তু মাটির নিচে কন্দ বেঁচে থাকে, আর পরের বছর আবার গজায়। প্রতিটি গাছ হয় শুধু স্ত্রী ফুলের, নয়তো শুধু পুরুষ ফুলের। ফল ধরে স্ত্রী গাছে, তাই খেতে বেশির ভাগ স্ত্রী গাছ আর কিছু পুরুষ গাছ রাখতে হয়। বীজ থেকে চারা করলে আগে থেকে বোঝা যায় না কোনটি স্ত্রী, কোনটি পুরুষ; তাই কন্দ বা লতার কাটিংই প্রচলিত।
প্রথম কন্দ সংগ্রহ করতে হবে এমন কৃষকের কাছ থেকে, যিনি স্ত্রী ও পুরুষ কন্দ আলাদা চিহ্নিত করে রাখেন।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কাকরোল বোনা বা রোপণ করা হয় মাঘ–ফাল্গুন (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য মার্চ), যা রবি মৌসুমের অংশ।
মাঘ-ফাল্গুনে সংরক্ষিত কন্দ মাদায় লাগানো হয়। প্রতি দশটি স্ত্রী গাছের জন্য অন্তত একটি পুরুষ গাছ রাখতে হয়, মাচার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে। আগের বছরের কন্দ মাটিতে রেখে দিলে সেখান থেকেও আবার গজায়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
মাদায় কম্পোস্ট ও পচা গোবর। কাকরোল একই জায়গায় কয়েক বছর থাকে, তাই মাচা মজবুত ও স্থায়ী হওয়া ভালো, পুকুরপাড়ের এক প্রান্তে আলাদা অংশে। মাদা একটু উঁচু, যাতে বর্ষায় কন্দ পচে না যায়।
পরিচর্যা
- লতা মাচায় তুলে দেওয়া।
- স্ত্রী ও পুরুষ গাছের গোড়ায় আলাদা রঙের খুঁটি বা লেবেল।
- ফল ধরা কম হলে সকালে পুরুষ ফুল ছিঁড়ে স্ত্রী ফুলে পরাগ ঘষে দেওয়া।
- নিয়মিত পানি, তবে গোড়ায় জলাবদ্ধতা নয়।
- মৌসুম শেষে লতা মরে গেলে গোড়া খড়ে ঢেকে কন্দ রক্ষা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় জ্যৈষ্ঠ–ভাদ্র (মধ্য মে – মধ্য সেপ্টেম্বর)।
কচি, সবুজ ফল, কাঁটা নরম থাকতে তোলা হয়। পাকলে হলুদ হয়ে ভেতরের বীজ শক্ত হয়ে যায়। সপ্তাহে দুই-তিনবার তোলা, বর্ষাজুড়ে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাছি পোকা (ফলের মাছি) | কচি ফলে ছিদ্র, ভেতরে পোকা, ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে পড়ে | ফেরোমন ফাঁদ; থেঁতো মিষ্টিকুমড়ার টোপ ফাঁদ; আক্রান্ত ফল তুলে গর্তে পুঁতে ফেলা; বীজের ফল কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা |
| কাঁটালে পোকা (এপিল্যাকনা বিটল) | হলদে-কমলা কালো ফোঁটার পোকা ও কাঁটাওয়ালা কীড়া পাতার সবুজ অংশ চেঁছে খায় | হাতে ধরে ও পাতার নিচের ডিমের গাদা নষ্ট; নিমের নির্যাস স্প্রে |
| কন্দ পচা | বর্ষায় গোড়া নরম হয়ে গাছ মরে যায়, কন্দ পচে | উঁচু মাদা; নিষ্কাশন; সুস্থ কন্দ বাছাই; আক্রান্ত কন্দ সরিয়ে ফেলা |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতার ওপরে হলুদ কোনাকুনি দাগ, নিচে ধূসর ছত্রাক; বর্ষায় বেশি | মাচায় তুলে পাতা মাটি থেকে দূরে রাখা; গোড়ায় পানি দেওয়া, পাতায় নয়; আক্রান্ত পাতা সরানো |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
কাকরোল কন্দ দিয়ে চাষ হয় বলে পরাগায়নের সংকর নিয়ে চিন্তা কম; কন্দ থেকে জন্মানো গাছ মা-গাছের মতোই হয়। মূল কাজ হলো স্ত্রী আর পুরুষ কন্দ আলাদা চিহ্নিত রাখা। বীজ থেকেও চারা করা যায়, তবে তখন গাছগুলো ফুল দেওয়ার পর স্ত্রী-পুরুষ বাছাই করতে হয়।
- মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ও ভালো ফল দেওয়া স্ত্রী গাছ আর সুস্থ পুরুষ গাছ চিহ্নিত করুন।
- আশ্বিনে লতা শুকিয়ে গেলে সাবধানে মাটি খুঁড়ে কন্দ তুলুন; স্ত্রী ও পুরুষ আলাদা বস্তা বা লেবেলে।
- কন্দ ছায়ায় কয়েক দিন শুকিয়ে শুকনো বালি বা ছাইয়ের মধ্যে ঠান্ডা, শুকনো জায়গায় রাখুন।
- মাসে একবার দেখুন; পচা বা নরম কন্দ সরিয়ে ফেলুন।
- অথবা কন্দ মাটিতেই রেখে গোড়া উঁচু করে খড়ে ঢেকে দিন; পরের মৌসুমে সেখান থেকেই গজাবে।
বীজের আয়ু
কাকরোলের কন্দ শুকনো বীজের মতো বছরের পর বছর রাখা যায় না; এটি জীবন্ত উপকরণ। তাই প্রতি বছর নতুন কন্দ রাখা, আর মাটিতে রেখে দেওয়া কন্দের জায়গাগুলো নকশায় চিহ্নিত রাখা জরুরি।
পুষ্টিগুণ
কাকরোলে আঁশ, আমিষ, ভিটামিন সি, ক্যারোটিন ও আয়রনসহ নানা খনিজ আছে। ভাজি, ভর্তা, ডাল দিয়ে বা পুর ভরে রান্না করা যায়। বর্ষার সময় যখন অনেক সবজির টান থাকে, তখন কাকরোল নিয়মিত পাতে থাকে।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।