মিষ্টিকুমড়া
পাকা মিষ্টিকুমড়া ঘরের কোণে মাসের পর মাস ভালো থাকে, তাই এটি খামারের “জমা রাখার সবজি”। শীতে বুনে বসন্তে তোলা কুমড়া বর্ষার সবজির টানের সময় কাজে আসে।
- নাম
- মিষ্টিকুমড়া · Pumpkin · Cucurbita moschata
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
- মৌসুম
- রবি
- বপন বা রোপণ
- কার্তিক–অগ্রহায়ণ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ডিসেম্বর)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ২ মিটার, সারি থেকে সারি প্রায় ২ মিটার; মাটিতে বা মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে পাকা ফল প্রায় ৯০–১১০ দিনে · মাঘ–চৈত্র
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- চার থেকে ছয় বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি মিষ্টিকুমড়া আকারে বড়, গায়ে খাঁজ, ভেতরে গাঢ় হলুদ থেকে কমলা শাঁস। বারির মুক্ত-পরাগায়িত মিষ্টিকুমড়ার জাতও (যেমন বারি মিষ্টিকুমড়া-১) পাওয়া যায়, যার বীজ রাখা যায়। বাজারে হাইব্রিড কুমড়ার বীজও প্রচুর; প্যাকেট দেখে বাদ দিতে হবে।
প্রথম বীজের সহজ উৎস হলো বাজার বা প্রতিবেশীর কাছ থেকে কেনা একটি দেশি পাকা কুমড়া, যার উৎস জানা। তবে বাজারের কুমড়ার বীজ হাইব্রিড গাছেরও হতে পারে, তাই প্রথম বছর পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি গাছে দেখে তবেই বীজ রাখা।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মিষ্টিকুমড়া বোনা বা রোপণ করা হয় কার্তিক–অগ্রহায়ণ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ডিসেম্বর), যা রবি মৌসুমের অংশ।
প্রধান মৌসুমে কার্তিক-অগ্রহায়ণে মাদায় বীজ বোনা হয়, ফল তোলা হয় মাঘ থেকে চৈত্রে। ফাল্গুন-চৈত্রে আরেক দফা বুনে বর্ষার শুরুতেও ফল পাওয়া যায়। বীজ এক রাত পানিতে ভিজিয়ে প্রতি মাদায় তিন-চারটি, পরে একটি-দুটি সবল চারা রাখা।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
মাদা প্রায় আধা মিটার চওড়া ও গভীর, পচা গোবর বা কম্পোস্ট দিয়ে ভরা। মিষ্টিকুমড়া মাটিতে লতিয়েই ভালো হয়; নিচে খড় বিছিয়ে দিলে ফল মাটির সংস্পর্শে পচে না। জায়গা বাঁচাতে পুকুরপাড়ের ঢাল বা ধানক্ষেতের আইলের পাশও ব্যবহার করা যায়।
পরিচর্যা
- লতা ছড়ানোর সময় প্রধান লতার গিঁটে মাটি চাপা দিলে সেখান থেকে নতুন শিকড় হয়, গাছ শক্ত হয়।
- শুকনো মৌসুমে সপ্তাহে দুবার গোড়ায় পানি।
- প্রতিটি ফলের নিচে খড় বা কাঠের টুকরো।
- একটি গাছে চার-পাঁচটির বেশি ফল রাখলে ফল ছোট হয়; বাড়তি কচি ফল তুলে রান্নায়।
- ফুল আসার সময় পাতলা স্লারি; মৌমাছির আনাগোনা নিশ্চিত করতে আশপাশে ফুলের গাছ।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় মাঘ–চৈত্র (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য এপ্রিল)।
কচি কুমড়া যেকোনো সময় রান্নার জন্য তোলা যায়। জমা রাখার কুমড়া তোলা হয় যখন বোঁটা শুকিয়ে বাদামি আর শক্ত, গায়ের রং গাঢ়, আর নখ দিয়ে চাপ দিলে দাগ বসে না। বোঁটাসহ কেটে কয়েক দিন রোদে রেখে তারপর ঘরের ঠান্ডা, শুকনো জায়গায় তাকে বা মাচায়, একটির ওপর আরেকটি না রেখে। এভাবে কয়েক মাস ভালো থাকে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাছি পোকা (ফলের মাছি) | কচি ফলে ছিদ্র, ভেতরে পোকা, ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে পড়ে | ফেরোমন ফাঁদ; থেঁতো মিষ্টিকুমড়ার টোপ ফাঁদ; আক্রান্ত ফল তুলে গর্তে পুঁতে ফেলা; বীজের ফল কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা |
| লাল পামকিন বিটল | চারা ও কচি পাতায় ছোট লাল-কমলা পোকা, পাতা ঝাঁঝরা করে | সকালে শিশির থাকতে পাতায় ছাই ছিটানো; হাতে ধরে নষ্ট; চারা অবস্থায় হালকা জাল দিয়ে ঢেকে রাখা |
| পাউডারি মিলডিউ | পাতার ওপরে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ, পরে পাতা শুকায় | ঘন না লাগানো, বাতাস চলাচল; আক্রান্ত পাতা কেটে ফেলা; পাতলা দুধ-পানির দ্রবণ (এক ভাগ দুধ, নয় ভাগ পানি) রোদেলা সকালে স্প্রে |
| মোজাইক ভাইরাস | পাতা কুঁকড়ে যায়, হলুদ-সবুজ ছোপ; গাছ বাড়ে না | জাব ও সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ (সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস); আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা; এই গাছের বীজ রাখবেন না |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
মিষ্টিকুমড়া পোকার মাধ্যমে পরপরাগী। একই প্রজাতির অন্য জাত, এমনকি প্রতিবেশীর জমির হাইব্রিড, কাছাকাছি ফুটলে সংকর হতে পারে। তাই হয় এক মৌসুমে একটিই জাত, নয়তো বীজের ফলের জন্য হাতে পরাগায়ন করে ফুল ঢেকে রাখা (পদ্ধতি বীজ সংরক্ষণ পাতায়)। অন্তত কয়েকটি গাছ থেকে বীজ রাখুন, যাতে জাতের বৈচিত্র্য থাকে।
- সুস্থ, ফলনশীল গাছের একটি-দুটি সুন্দর গড়নের ফল বীজের জন্য চিহ্নিত করুন।
- ফল পুরোপুরি পাকিয়ে তুলুন, তারপর আরও দুই-তিন সপ্তাহ ঘরে রেখে দিন; এতে বীজ আরও পরিপক্ব হয়।
- কুমড়া কেটে বীজ বের করুন (শাঁস রান্নায় যাবে), পানিতে ধুয়ে আঁশ ছাড়ান।
- পানিতে দিলে ভেসে থাকা চ্যাপ্টা, ফাঁপা বীজ বাদ দিন।
- কাপড় বা ট্রেতে ছায়ায় দুই-তিন দিন, তারপর হালকা রোদে শুকান; বাঁকালে না বেঁকে ভাঙলে তৈরি।
- বায়ুরোধী বয়ামে লেবেলসহ রাখুন।
বীজের আয়ু
মিষ্টিকুমড়ার বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে কয়েক বছর ভালো থাকে। প্রতি দুই বছরে নতুন বীজ রাখলে জাতটি সতেজ থাকে।
পুষ্টিগুণ
কমলা শাঁসে প্রচুর বিটা ক্যারোটিন, যা শরীরে ভিটামিন এ হয়; চোখ ও রোগ প্রতিরোধের জন্য উপকারী। আঁশ, পটাশিয়াম আর ভিটামিন সিও আছে। বীজ ভেজে খাওয়া যায়, যাতে আমিষ, ভালো চর্বি ও জিংক থাকে। কুমড়ার কচি ডগা আর ফুলও ভাজি বা বড়া করে খাওয়া হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।