মসুর
বাঙালির প্রতিদিনের ডাল। আমন ধান কাটার পর রবি মৌসুমে বোনা মসুর কম পানিতে হয়, আর শিকড়ের গুটিতে বাতাসের নাইট্রোজেন ধরে পরের ধানের জন্য মাটি উর্বর করে।
- নাম
- মসুর · Lentil · Lens culinaris
- পরিবার
- শিমজাতীয় (ফ্যাবেসি)
- জাতের ধরন
- মুক্ত-পরাগায়িত (স্বপরাগী) জাত; দেশি ও বারির জাত
- মৌসুম
- রবি
- বপন বা রোপণ
- কার্তিক–অগ্রহায়ণ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ডিসেম্বর)
- দূরত্ব
- সারিতে বুনলে সারি থেকে সারি প্রায় ৩০ সেমি; ছিটিয়েও বোনা যায়
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ১০০–১১০ দিন · ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় দুই থেকে তিন বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি মসুরের দানা ছোট, লালচে, স্বাদে ভালো। বারির মুক্ত-পরাগায়িত মসুরের জাত (যেমন বারি মসুর-৬, বারি মসুর-৮) রোগ সহনশীল ও তুলনামূলক বেশি ফলনশীল, বিএডিসি থেকে বীজ পাওয়া যায়। মসুর স্বপরাগী, তাই যেকোনো জাতের বীজ রেখে একই রকম গাছ পাওয়া যায়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মসুর বোনা বা রোপণ করা হয় কার্তিক–অগ্রহায়ণ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ডিসেম্বর), যা রবি মৌসুমের অংশ।
কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণের শুরুতে, মাটিতে জো থাকতে বোনা হয়। দেরিতে বুনলে ফলন কমে আর রোগ বাড়ে। ছিটিয়ে বা সারিতে; প্রতি শতাংশে আনুমানিক ১৩০–১৫০ গ্রাম বীজ।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
আমন কাটার পর এক-দুটি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করা। মসুর বেশি সার চায় না; আগের ফসলের অবশিষ্ট উর্বরতা আর সামান্য কম্পোস্টই যথেষ্ট। ধানক্ষেতের এক বা দুই খণ্ডে আর আইলের পাশেও বোনা যায়।
পরিচর্যা
- বোনার তিন-চার সপ্তাহে একবার নিড়ানি।
- সাধারণত সেচ লাগে না; খুব শুকনো বছরে ফুল আসার আগে একটি হালকা সেচ।
- জমিতে পানি জমলে দ্রুত নিষ্কাশন; মসুর জলাবদ্ধতা সহ্য করে না।
- কুয়াশার দিনে পাতা ঝলসানো রোগের দিকে নজর।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় ফাল্গুন–চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য এপ্রিল)।
ফাল্গুন-চৈত্রে গাছ হলুদ-বাদামি আর বেশির ভাগ শুঁটি শুকনো হলে, সকালে শিশির থাকতে গাছ তুলে বা কেটে নেওয়া হয়। কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে মাড়াই, কুলায় ঝেড়ে পরিষ্কার।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| পাতা ঝলসানো (স্টেমফাইলিয়াম ব্লাইট) | কুয়াশার পর পাতায় বাদামি দাগ, পাতা ঝরে গাছ পোড়ার মতো দেখায় | সময়মতো বোনা; ঘন না বোনা; সহনশীল জাত; আক্রান্ত গাছ সরানো |
| গোড়া পচা | গাছ হলুদ হয়ে নেতিয়ে পড়ে, গোড়া পচা | ভালো নিষ্কাশন; শস্য পর্যায়; সুস্থ বীজ |
| জাব পোকা | কচি ডগা, ফুল ও শুঁটিতে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; গাছ দুর্বল হয় | সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস; সময়মতো আগাম বোনা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ |
| ফল ছিদ্রকারী পোকা | ফুল ও শুঁটিতে ছিদ্র, ভেতরে কীড়া দানা খায় | আক্রান্ত শুঁটি তুলে নষ্ট; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা; নিমের নির্যাস ফুল আসার সময় |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
মসুর স্বপরাগী, তাই দুটি জাত পাশাপাশি খণ্ডে থাকলেও সংকর প্রায় হয় না। তবে মাড়াই ও শুকানোর সময় জাত মিশে না যায়, সেজন্য আলাদা কাটা ও আলাদা পাত্র।
- জমির সবচেয়ে সুস্থ, সমান পাকা অংশ বীজের জন্য চিহ্নিত করুন; ভিন্ন রকম বা রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ফেলুন।
- বেশির ভাগ শুঁটি বাদামি ও শুকনো হলে, ফেটে দানা ঝরার আগে, সকালে শিশির থাকতে গাছ কাটুন বা তুলুন।
- কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে কাপড় বা ত্রিপলের ওপর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মাড়াই করুন।
- কুলায় ঝেড়ে খোসা, ধুলা আর ভাঙা দানা বাদ দিন।
- আরও দুই-তিন দিন রোদে শুকান; দাঁতে চাপ দিলে কট করে ভাঙলে তৈরি।
- ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী পাত্রে নিমপাতা বা ছাইসহ রাখুন; ঢোরা পোকার জন্য মাসে একবার দেখুন।
বীজের আয়ু
মসুরের বীজ চৈত্রে সংগ্রহ হয়ে পরের কার্তিক পর্যন্ত রাখতে হয়। ঢোরা পোকা আর বর্ষার আর্দ্রতা দুই শত্রু; ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে দুই-তিন বছর চলে।
পুষ্টিগুণ
মসুর ডাল আমিষ, আঁশ, আয়রন, ফোলেট আর পটাশিয়ামের ভালো উৎস। ভাত-ডাল মিলে আমিষের মান আরও ভালো হয়। মসুরের কচি গাছও শাক হিসেবে খাওয়া যায়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।