পেঁয়াজ
প্রতিদিনের রান্নার অপরিহার্য পেঁয়াজ। কন্দ তোলা এক কাজ, আর বীজ রাখা আরেক কাজ: কার্তিকে বাছাই করা পেঁয়াজ আবার লাগিয়ে ফাল্গুন-চৈত্রে ফুলের মাথা থেকে কালো বীজ।
- নাম
- পেঁয়াজ · Onion · Allium cepa
- পরিবার
- পেঁয়াজজাতীয় (অ্যামারিলিডেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
- মৌসুম
- রবি
- বপন বা রোপণ
- কার্তিক–পৌষ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য জানুয়ারি)
- দূরত্ব
- কন্দের জন্য সারি থেকে সারি প্রায় ১৫ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ১০ সেমি; বীজের মা-কন্দ প্রায় ৩০ × ২০ সেমি
- ফসল তোলা
- রোপণ থেকে প্রায় ১০০–১২০ দিন · ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- মাত্র প্রায় এক বছর; প্রতি বছর নতুন বীজ লাগে
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি পেঁয়াজের মধ্যে তাহেরপুরী ও ফরিদপুরী ধরনের জাত পরিচিত: ছোট-মাঝারি, ঝাঁঝালো, ভালো সংরক্ষণযোগ্য। বারির মুক্ত-পরাগায়িত পেঁয়াজের জাতও আছে (যেমন বারি পেঁয়াজ-১)। বাজারের আমদানিকৃত বড় পেঁয়াজের অনেক বীজ হাইব্রিড; সেগুলো আমাদের খামারে নয়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পেঁয়াজ বোনা বা রোপণ করা হয় কার্তিক–পৌষ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য জানুয়ারি), যা রবি মৌসুমের অংশ।
কন্দের জন্য: কার্তিকে বীজতলায় বীজ বোনা, আর চারার বয়স প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ দিনে অগ্রহায়ণ-পৌষে মূল জমিতে রোপণ। বীজ উৎপাদনের জন্য: আগের মৌসুমে তোলা, ঠিকমতো সংরক্ষিত, বাছাই করা মাঝারি আকারের পেঁয়াজ (মা-কন্দ) কার্তিকে আলাদা বেডে লাগানো হয়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
পেঁয়াজ ঝুরঝুরে, উর্বর, ভালো নিষ্কাশনের দোআঁশ মাটি চায়। ভালো পচা কম্পোস্ট মেশানো; কাঁচা গোবর নয়। বেড সমান ও আগাছামুক্ত, কারণ পেঁয়াজের সরু পাতা আগাছার সাথে পাল্লা দিতে পারে না।
পরিচর্যা
- রোপণের পর হালকা সেচ, তারপর মাটি শুকালে নিয়মিত পানি।
- দুই-তিনবার নিড়ানি; আগাছা পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
- কন্দ বড় হওয়ার সময় গোড়ার মাটি আলগা রাখা।
- তোলার দুই-তিন সপ্তাহ আগে সেচ বন্ধ, যাতে কন্দ শক্ত ও সংরক্ষণযোগ্য হয়।
- বীজের বেডে ফুলের ডাঁটা হেলে পড়লে দুই পাশে দড়ি টেনে দেওয়া।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় ফাল্গুন–চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য এপ্রিল)।
ফাল্গুন-চৈত্রে পাতার বেশির ভাগ হলুদ হয়ে নুয়ে পড়লে পেঁয়াজ তোলা হয়। কয়েক দিন মাঠে বা ছায়ায় পাতাসহ শুকিয়ে, পাতা কেটে বাতাস চলাচলের মাচায় পাতলা করে রাখা। শুকনো, সুস্থ পেঁয়াজ কয়েক মাস ভালো থাকে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| পার্পল ব্লচ | পাতায় লম্বাটে বেগুনি দাগ, চারপাশে হলুদ আভা; পরে পাতা ভেঙে পড়ে | ঘন না লাগানো; আক্রান্ত পাতা সরানো; শস্য পর্যায়; সকালে সেচ |
| থ্রিপস | পাতায় রুপালি দাগ ও আঁচড়, পাতার আগা শুকিয়ে কুঁকড়ে যায় | নিমের নির্যাস; নিয়মিত সেচে পাতা সতেজ রাখা; নীল বা সাদা আঠালো ফাঁদ; আগাছা পরিষ্কার |
| কন্দ পচা | গুদামে পেঁয়াজ নরম হয়ে পচে, দুর্গন্ধ | ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ; আঘাতপ্রাপ্ত পেঁয়াজ আলাদা; বাতাস চলাচলের মাচা |
| গোড়া পচা | চারার গোড়া পচে মরে যায় | উঁচু বীজতলা; অতিরিক্ত পানি নয় |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
পেঁয়াজের ফুল মৌমাছি ও অন্য পোকার মাধ্যমে পরপরাগী, আর নিজের পরাগে বীজ কম হয়। তাই অন্তত বিশ-ত্রিশটি মা-কন্দ একসাথে লাগাতে হবে, আর আশপাশে অন্য পেঁয়াজের জাতের ফুল থাকলে সংকর হবে; সম্ভব হলে কয়েকশ মিটার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্ব, অথবা খামারে একটিই জাত।
- আগের মৌসুমে তোলা পেঁয়াজের মধ্য থেকে জাতের মতো আকার ও রঙের, শক্ত, রোগমুক্ত মাঝারি পেঁয়াজ বাছাই করে আলাদা সংরক্ষণ করুন।
- কার্তিকে মা-কন্দের ওপরের অংশ সামান্য কেটে বীজের বেডে লাগান।
- মাঘে ফুলের ডাঁটা আর গোল সাদা ফুলের মাথা আসবে; ফুলে মৌমাছি আসতে দিন।
- ফাল্গুন-চৈত্রে ফুলের মাথায় কয়েকটি ফল ফেটে কালো বীজ দেখা গেলে ডাঁটাসহ মাথা কেটে নিন।
- কাপড় বা কাগজের ওপর ছায়ায় কয়েক দিন শুকিয়ে হাতে ঘষে বীজ ঝরান; পানিতে দিলে ভাসমান খোসা ও হালকা বীজ ফেলে দিন, তারপর আবার শুকান।
- ভালোভাবে শুকিয়ে আর্দ্রতা শোষকসহ বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
বীজের আয়ু
পেঁয়াজের বীজ সবচেয়ে স্বল্পায়ু বীজগুলোর একটি। চৈত্রে সংগ্রহ করা বীজ পরের কার্তিকে বোনার জন্যই, তার বেশি নয়; দ্বিতীয় বছরে অঙ্কুরোদগম অনেক কমে যায়। তাই প্রতি বছর মা-কন্দ লাগিয়ে বীজ উৎপাদন সীড ব্যাংকের অবশ্যকরণীয় কাজ, আর বর্ষাজুড়ে বীজ খুব শুকনো ও বায়ুরোধী রাখতে হবে।
পুষ্টিগুণ
পেঁয়াজে ভিটামিন সি, কিছু ভিটামিন বি, আঁশ আর নানা সালফারযুক্ত উদ্ভিজ্জ উপাদান আছে। প্রায় সব রান্নার ভিত্তি; কাঁচা সালাদেও। পেঁয়াজের কচি পাতা (পেঁয়াজকলি) শীতে আলাদা সবজি হিসেবে রান্না হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।