সীড ব্যাংক · সবজি

বেগুন

দেশে সবচেয়ে বেশি খাওয়া সবজির একটি বেগুন। গোল-লম্বা, বেগুনি-সবুজ-সাদা, দেশি জাতের বৈচিত্র্য অসাধারণ। আমাদের খামারে বেগুন হবে পুরোপুরি জৈব উপায়ে, আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-২রবি
নাম
বেগুন · Brinjal / Eggplant · Solanum melongena
পরিবার
বেগুনজাতীয় (সোলানেসি)
জাতের ধরন
দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; হাইব্রিড ও জিনগত পরিবর্তিত (বিটি) বেগুন বাদ
মৌসুম
খরিফ-২, রবি
বপন বা রোপণ
ভাদ্র–কার্তিক (মধ্য আগস্ট – মধ্য নভেম্বর)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ৭৫ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ৬০ সেমি
ফসল তোলা
রোপণ থেকে প্রথম ফল প্রায় ৬০–৭৫ দিনে · অগ্রহায়ণ–চৈত্র
বীজ সংগ্রহ
ফাল্গুন–চৈত্র
বীজের আয়ু
প্রায় তিন থেকে চার বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

দেশি বেগুনের জাতের নাম এলাকাভেদে নানা: লম্বা বেগুনি “ঝুমকি” বা “শিংনাথ” ধরনের, গোল বড় “খটখটিয়া” বা “ইসলামপুরী” ধরনের, সবুজ-সাদা ডোরাকাটা বা সাদা বেগুন। বারির কিছু মুক্ত-পরাগায়িত বেগুনের জাতও আছে (যেমন বারি বেগুন-১, উত্তরা)। জাতের নাম ও ধরন কেনার আগে প্রতিষ্ঠানের তথ্যে যাচাই করতে হবে।

দেশে অনুমোদিত জিনগত পরিবর্তিত বিটি বেগুনের জাতগুলোর বীজ রাখা গেলেও আমাদের জৈব খামারের নীতিতে এগুলো ব্যবহার হবে না। হাইব্রিড বেগুনও নয়। দুই-তিনটি দেশি জাত বেছে নিয়ে প্রতি বছর নিজেদের বীজ রাখা হবে।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বেগুন বোনা বা রোপণ করা হয় ভাদ্র–কার্তিক (মধ্য আগস্ট – মধ্য নভেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।

শীতের বেগুনের জন্য ভাদ্র-আশ্বিনে বীজতলায় বীজ বোনা হয়, আর চারার বয়স প্রায় এক মাস, চার-পাঁচ পাতা হলে আশ্বিন-কার্তিকে মূল জমিতে রোপণ। বীজতলা উঁচু, ঝুরঝুরে, ওপরে বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য চালা। বর্ষাকালীন বেগুনও হয়, তবে তখন রোগ-পোকা বেশি।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

বেগুন দীর্ঘদিন জমিতে থাকে আর অনেক খাবার চায়, তাই বেডে প্রচুর কম্পোস্ট বা কেঁচো সার আর কিছু ছাই মেশানো হয়। প্রতিটি গর্তে এক মুঠো কেঁচো সার দিয়ে চারা লাগানো। আগের মৌসুমে টমেটো, মরিচ বা আলু ছিল এমন জায়গায় বেগুন নয়; একই পরিবারের ফসলে মাটিবাহিত রোগ জমে।

পরিচর্যা

  • রোপণের পর কয়েক দিন বিকেলে হালকা পানি, চারা দাঁড়িয়ে গেলে নিয়মিত সেচ।
  • চারা বড় হলে গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া আর খুঁটি দিয়ে বেঁধে দেওয়া।
  • প্রতি সপ্তাহে ডগা দেখে নুয়ে পড়া আক্রান্ত ডগা কেটে পুড়িয়ে বা পুঁতে ফেলা; এটাই ডগা-ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের মূল কাজ।
  • মাসে একবার গোড়ায় কম্পোস্ট বা পাতলা স্লারি।
  • বেগুন বেডের চারপাশে গাঁদা বা ধনিয়ার মতো ফুলের গাছ, যা উপকারী পোকা টানে।
  • নিচের হলুদ পাতা ছেঁটে ফেলা।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় অগ্রহায়ণ–চৈত্র (মধ্য নভেম্বর – মধ্য এপ্রিল)।

ফল চকচকে, শক্ত, আর ভেতরের বীজ নরম থাকতে তোলা হয়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে ফিরে আসা মানে উপযোগী; নিস্তেজ রং বা হলদে ভাব মানে বেশি পেকে গেছে। অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত সপ্তাহে একবার-দুবার তোলা যায়। গাছ ভালো থাকলে ছেঁটে দিয়ে দ্বিতীয় দফা ফলনও নেওয়া যায়।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

বেগুন-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকাকচি ডগা হঠাৎ নুয়ে শুকিয়ে যায়; ফলে ছোট ছিদ্র, ভেতরে কীড়া ও বিষ্ঠাপ্রতি সপ্তাহে আক্রান্ত ডগা ও ফল কেটে নষ্ট; প্রতি কয়েক শতাংশে একটি ফেরোমন ফাঁদ; ফসল শেষে গাছের অবশিষ্টাংশ সরানো; শস্য পর্যায়
ঢলে পড়া রোগদুপুরে গাছ হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে, পরে আর সোজা হয় নাশস্য পর্যায়; জলাবদ্ধতা নয়; আক্রান্ত গাছ শিকড়সহ তুলে ফেলা; ভালো পচা কম্পোস্ট ব্যবহার
জাব ও সাদা মাছিপাতার নিচে ছোট পোকা, পাতা কুঁকড়ানোসাবান-পানি বা নিমের নির্যাস; হলুদ আঠালো ফাঁদ
কাঁটালে পোকা (এপিল্যাকনা বিটল)পাতার সবুজ অংশ চেঁছে খায়, পাতা জালির মতোহাতে ধরা; ডিমের গাদা নষ্ট; নিমের নির্যাস

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

বেগুন মূলত স্বপরাগী, তবে পোকার মাধ্যমে কিছু সংকর হয়। দুটি জাত থাকলে অন্তত কয়েক দশ মিটার দূরে, অথবা বীজের গাছের কয়েকটি ফুল ফোটার আগে পাতলা কাপড়ে ঢেকে রাখা।

  1. জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, ফলনশীল আর পোকা কম লাগা কয়েকটি গাছ চিহ্নিত করুন।
  2. প্রতিটি গাছের একটি-দুটি সুগঠিত ফল গাছেই পুরো পাকতে দিন, যতক্ষণ না রং হলুদ বা বাদামি হয় আর ফল কিছুটা নরম হয়।
  3. তুলে আরও এক সপ্তাহ রেখে দিন, তারপর ফল টুকরো করে পানিতে চটকে শাঁস থেকে বীজ আলাদা করুন।
  4. পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে ভাসমান বীজ ফেলে দিন; ডুবে থাকা বীজ রাখুন।
  5. ছাঁকনিতে পানি ঝরিয়ে কাপড়ে ছায়ায়, তারপর হালকা রোদে কয়েক দিন শুকান।
  6. বায়ুরোধী পাত্রে লেবেলসহ রাখুন।

বীজের আয়ু

বেগুনের বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে কয়েক বছর ভালো থাকে। প্রতি দুই বছরে নতুন বীজ রাখুন, আর প্রতি বছর বীজের জন্য সেই গাছগুলো বাছুন যেগুলো আমাদের জৈব ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে ভালো করেছে।

পুষ্টিগুণ

বেগুনে আঁশ, পটাশিয়াম, কিছু ভিটামিন বি আর খোসার বেগুনি রঙে নানা উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান আছে; ক্যালরি কম। বেগুন ভাজি, ভর্তা, মাছের ঝোল, নানা রান্না। যাঁদের বেগুনে অ্যালার্জি আছে, তাঁরা সাবধান থাকবেন।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।