চিচিঙ্গা
সাপের মতো লম্বা, সাদা-সবুজ ডোরাকাটা চিচিঙ্গা গরম ও বর্ষার মাচার সবজি। লম্বা ফল সোজা রাখতে মাচা থেকে ঝুলিয়ে চাষ করতে হয়।
- নাম
- চিচিঙ্গা · Snake gourd · Trichosanthes cucumerina
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত
- বপন বা রোপণ
- ফাল্গুন–বৈশাখ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মে)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১.৫–২ মিটার; উঁচু মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনার প্রায় ৫০–৬০ দিনে প্রথম ফল · জ্যৈষ্ঠ–ভাদ্র
- বীজ সংগ্রহ
- ভাদ্র–আশ্বিন
- বীজের আয়ু
- তিন থেকে চার বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি চিচিঙ্গার ফল লম্বা, কোনো জাতে এক মিটারেরও বেশি, গায়ে সাদা ও সবুজ ডোরা। কিছু জাত খাটো ও মোটা। সাদা, ঝালরের মতো সূক্ষ্ম ফুল রাতে ফোটে। দেশি বীজ গ্রামে সহজলভ্য, বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চিচিঙ্গা বোনা বা রোপণ করা হয় ফাল্গুন–বৈশাখ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মে), যা রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।
ফাল্গুন থেকে বৈশাখে মাদায় সরাসরি বোনা। বীজের খোসা শক্ত, তাই বোনার আগে এক রাত বা এক দিন পানিতে ভেজানো। প্রতি মাদায় দুই-তিনটি বীজ, পরে একটি-দুটি চারা।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
মাচা অন্তত দুই মিটার উঁচু, যাতে লম্বা ফল মাটি না ছোঁয়। মাদায় কম্পোস্ট আর পচা গোবর। পুকুরপাড়ের মাচায় ঝিঙার পাশে চিচিঙ্গা লাগানো যায়।
পরিচর্যা
- লতা মাচায় তুলে দেওয়া; মাচার নিচে ফল যাতে সোজা ঝুলতে পারে, সেজন্য মাচার ফাঁক রাখা।
- কচি ফলের আগায় ছোট একটি ঢিল বা মাটির দলা সুতায় বেঁধে দিলে ফল সোজা হয়।
- নিয়মিত পানি; বর্ষায় গোড়ায় পানি জমতে না দেওয়া।
- প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে গোড়ায় পাতলা স্লারি বা কম্পোস্ট।
- মাছি পোকার জন্য ফেরোমন ফাঁদ আর আক্রান্ত ফল সরানো।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় জ্যৈষ্ঠ–ভাদ্র (মধ্য মে – মধ্য সেপ্টেম্বর)।
ফুল ফোটার প্রায় দশ-বারো দিনে কচি ফল তোলা হয়, যখন ফল নরম আর নখে দাগ বসে। নিয়মিত তুললে গাছ দীর্ঘদিন ফল দেয়। দেরি হলে ফল শক্ত ও আঁশযুক্ত হয়ে যায়।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাছি পোকা (ফলের মাছি) | কচি ফলে ছিদ্র, ভেতরে পোকা, ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে পড়ে | ফেরোমন ফাঁদ; থেঁতো মিষ্টিকুমড়ার টোপ ফাঁদ; আক্রান্ত ফল তুলে গর্তে পুঁতে ফেলা; বীজের ফল কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা |
| লাল পামকিন বিটল | চারা ও কচি পাতায় ছোট লাল-কমলা পোকা, পাতা ঝাঁঝরা করে | সকালে শিশির থাকতে পাতায় ছাই ছিটানো; হাতে ধরে নষ্ট; চারা অবস্থায় হালকা জাল দিয়ে ঢেকে রাখা |
| কাঁটালে পোকা (এপিল্যাকনা বিটল) | হলদে-কমলা কালো ফোঁটার পোকা ও কাঁটাওয়ালা কীড়া পাতার সবুজ অংশ চেঁছে খায় | হাতে ধরে ও পাতার নিচের ডিমের গাদা নষ্ট; নিমের নির্যাস স্প্রে |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতার ওপরে হলুদ কোনাকুনি দাগ, নিচে ধূসর ছত্রাক; বর্ষায় বেশি | মাচায় তুলে পাতা মাটি থেকে দূরে রাখা; গোড়ায় পানি দেওয়া, পাতায় নয়; আক্রান্ত পাতা সরানো |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
চিচিঙ্গা পোকার মাধ্যমে পরপরাগী। একই প্রজাতির অন্য জাত, এমনকি প্রতিবেশীর জমির হাইব্রিড, কাছাকাছি ফুটলে সংকর হতে পারে। তাই হয় এক মৌসুমে একটিই জাত, নয়তো বীজের ফলের জন্য হাতে পরাগায়ন করে ফুল ঢেকে রাখা (পদ্ধতি বীজ সংরক্ষণ পাতায়)। অন্তত কয়েকটি গাছ থেকে বীজ রাখুন, যাতে জাতের বৈচিত্র্য থাকে।
- সুস্থ গাছের একটি-দুটি সুগঠিত ফল বীজের জন্য রাখুন।
- ফল গাছেই পাকতে দিন: রং কমলা-লাল হয়ে যাবে, ভেতরে লাল শাঁসে বীজ থাকবে।
- পাকা ফল কেটে লাল শাঁস থেকে বীজ বের করুন, পানিতে ঘষে ধুয়ে পরিষ্কার।
- ছায়ায় ও হালকা রোদে কয়েক দিন শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
বীজের আয়ু
চিচিঙ্গার বীজ শক্ত খোসার, শুকনো অবস্থায় কয়েক বছর ভালো থাকে। প্রতি দুই বছরে নবায়ন।
পুষ্টিগুণ
চিচিঙ্গায় পানি আর আঁশ বেশি, ক্যালরি কম; কিছু ভিটামিন এ, সি ও খনিজ আছে। হালকা ও সহজপাচ্য। চিচিঙ্গা ভাজি, চিংড়ি বা ডাল দিয়ে রান্না জনপ্রিয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।