ঢেঁড়স
গরম আর বর্ষায় যখন অন্য সবজি কম, তখন ঢেঁড়স গাছ প্রতিদিন নতুন ফল দেয়। কম যত্নে বেশি ফলন, আর বীজ রাখা খুব সহজ।
- নাম
- ঢেঁড়স · Okra / Lady's finger · Abelmoschus esculentus
- পরিবার
- জবাজাতীয় (ম্যালভেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
- বপন বা রোপণ
- ফাল্গুন–জ্যৈষ্ঠ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য জুন)
- দূরত্ব
- সারি থেকে সারি প্রায় ৬০ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ৪০ সেমি
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ৪০–৫০ দিনে প্রথম ফল · বৈশাখ–ভাদ্র
- বীজ সংগ্রহ
- শ্রাবণ–ভাদ্র
- বীজের আয়ু
- প্রায় দুই থেকে তিন বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি ঢেঁড়স সবুজ বা লালচে, পাঁচ বা ছয় শিরের, কোনো জাত লম্বা ও সরু, কোনোটা খাটো মোটা। বারির মুক্ত-পরাগায়িত ঢেঁড়সের জাত (যেমন বারি ঢেঁড়স-১) পাওয়া যায়, যার বীজ রাখা যায়; বাজারের অনেক প্যাকেট হাইব্রিড, তাই যাচাই জরুরি। হলুদ শিরা মোজাইক রোগ ঢেঁড়সের বড় সমস্যা, তাই বীজ রাখার সময় যে গাছগুলো এই রোগ সহ্য করেছে, সেগুলোই বাছাই করা হবে।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঢেঁড়স বোনা বা রোপণ করা হয় ফাল্গুন–জ্যৈষ্ঠ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য জুন), যা রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।
ফাল্গুন থেকে জ্যৈষ্ঠে সরাসরি বেডে বোনা হয়। বীজের খোসা শক্ত, তাই বোনার আগে এক রাত পানিতে ভিজিয়ে নিলে দ্রুত ও একসাথে গজায়। প্রতি জায়গায় দুই-তিনটি বীজ, পরে একটি সবল চারা। কয়েক সপ্তাহ পরপর ছোট ছোট দফায় বুনলে ফলন একটানা থাকে।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
বেড ঝুরঝুরে করে কম্পোস্ট মিশিয়ে তৈরি। ঢেঁড়সের শিকড় গভীরে যায়, তাই ভালো চাষ দরকার। বর্ষায় বেড উঁচু ও নালা পরিষ্কার রাখতে হয়, কারণ গোড়ায় পানি জমলে গাছ হলুদ হয়ে যায়। সারির মাঝে লালশাক বা ডাঁটার মতো দ্রুত বাড়া শাক সাথী ফসল হিসেবে বোনা যায়।
পরিচর্যা
- চারা দুই-তিন সপ্তাহের হলে নিড়ানি ও গোড়ায় হালকা মাটি তুলে দেওয়া।
- গরমে সপ্তাহে দুই-তিনবার পানি; ফল ধরার সময় পানির টান নয়।
- ফল ধরা শুরু হলে মাসে একবার পাতলা স্লারি বা কম্পোস্ট-চা।
- হলুদ শিরা মোজাইকে আক্রান্ত গাছ দেখামাত্র তুলে ফেলা।
- প্রতিদিন বা এক দিন পরপর ফল তোলা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় বৈশাখ–ভাদ্র (মধ্য এপ্রিল – মধ্য সেপ্টেম্বর)।
ফুল ফোটার চার-ছয় দিনের মধ্যে, ফল যখন কচি আর আগা সহজে ভাঙে, তখন তোলা হয়। দেরি হলে ফল শক্ত ও আঁশযুক্ত হয়। ঢেঁড়সের গায়ে সূক্ষ্ম লোম চুলকানি দিতে পারে, তাই তোলার সময় হাতমোজা ভালো।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| হলুদ শিরা মোজাইক | পাতার শিরা হলুদ জালের মতো, পরে পুরো পাতা হলুদ; ফল ছোট ও বিকৃত | সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ; আক্রান্ত গাছ দ্রুত তুলে ফেলা; সহনশীল গাছ থেকে বীজ রাখা |
| সাদা মাছি | পাতার নিচে ছোট সাদা পোকা, ঝাঁকালে উড়ে যায়; ভাইরাস ছড়ায় | হলুদ আঠালো ফাঁদ; নিমের নির্যাস পাতার নিচে স্প্রে; আগাছা পরিষ্কার; আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা |
| ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা | ডগা নুয়ে শুকিয়ে যায়, ফলে ছিদ্র | আক্রান্ত ডগা ও ফল কেটে নষ্ট; ফেরোমন ফাঁদ; নিমের নির্যাস |
| জাব পোকা | কচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমে | সাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
ঢেঁড়স মূলত স্বপরাগী, তবে মৌমাছি ফুলে প্রচুর আসে বলে কিছুটা সংকর হয়। দুটি জাত থাকলে অন্তত কয়েক দশ মিটার, ভালো হয় কয়েকশ মিটার দূরে; নয়তো বীজের গাছের ফুল কাগজের ব্যাগে ফোটার আগের দিন ঢেকে রাখা।
- মৌসুমের প্রথম দিকের কয়েকটি সুস্থ, রোগমুক্ত গাছ বীজের জন্য চিহ্নিত করুন।
- প্রতিটি বীজ-গাছের নিচের দিকের দুই-তিনটি ফল গাছেই রেখে দিন, বাকি ফল খাওয়ার জন্য তুলুন।
- ফল গাছেই শুকিয়ে বাদামি হয়ে আগায় ফাটতে শুরু করলে তুলুন।
- শুকনো ফল হাতে চেপে বা আলতো পিটিয়ে গোল, ধূসর-সবুজ বীজ বের করুন।
- কয়েক দিন হালকা রোদে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
বীজের আয়ু
ঢেঁড়সের বীজ শ্রাবণ-ভাদ্রে সংগ্রহ হয়, বর্ষার আর্দ্রতায়। ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে দুই-তিন বছর ভালো থাকে। পুরোনো বীজ বোনার আগে ভিজিয়ে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা করুন।
পুষ্টিগুণ
ঢেঁড়সে আঁশ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফোলেট আর ম্যাগনেশিয়াম আছে। পিচ্ছিল অংশটি দ্রবণীয় আঁশ, যা হজমে সাহায্য করে। ঢেঁড়স ভাজি, ভর্তা, মাছের ঝোল বা ডাল দিয়ে রান্না করা যায়; ধুয়ে মুছে শুকিয়ে কাটলে কম পিচ্ছিল হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।