সীড ব্যাংক · ডাল

খেসারি

আমন ধান কাটার আগেই ভেজা মাটিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয় খেসারি, আর ধান কাটার পর জমি সবুজ হয়ে ওঠে কোনো চাষ ছাড়াই। খরা সহনশীল, কম খরচের ডাল আর গবাদিপশুর খাবার।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-২রবি
নাম
খেসারি · Grass pea · Lathyrus sativus
পরিবার
শিমজাতীয় (ফ্যাবেসি)
জাতের ধরন
মুক্ত-পরাগায়িত (মূলত স্বপরাগী) জাত; কম ওডিএপি-যুক্ত বারির জাত অগ্রাধিকার
মৌসুম
খরিফ-২, রবি
বপন বা রোপণ
আশ্বিন–কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য নভেম্বর)
দূরত্ব
দাঁড়ানো আমন ধানের মধ্যে ছিটিয়ে বোনা
ফসল তোলা
বোনা থেকে প্রায় ১১০–১২০ দিন · ফাল্গুন–চৈত্র
বীজ সংগ্রহ
ফাল্গুন–চৈত্র
বীজের আয়ু
বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় দুই থেকে তিন বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

খেসারিতে ওডিএপি নামের একটি প্রাকৃতিক উপাদান থাকে, যা দীর্ঘদিন প্রধান খাবার হিসেবে বেশি পরিমাণে খেলে পায়ের স্নায়ুর ক্ষতি (ল্যাথিরিজম) করতে পারে। তাই বারির কম ওডিএপি-যুক্ত মুক্ত-পরাগায়িত জাত (যেমন বারি খেসারি-২, বারি খেসারি-৩) আমাদের অগ্রাধিকার; জাতের সর্বশেষ তথ্য প্রতিষ্ঠানে যাচাই করে নিতে হবে। দেশি পুরোনো জাতে ওডিএপি বেশি থাকতে পারে।

আমাদের খামারে খেসারির মূল উদ্দেশ্য মাটির উর্বরতা আর গরুর খাবার; ডাল হিসেবে পরিবারের খাদ্যতালিকায় থাকবে পরিমিত পরিমাণে, মসুর-মুগের পাশাপাশি।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খেসারি বোনা বা রোপণ করা হয় আশ্বিন–কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য নভেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।

আশ্বিন-কার্তিকে, আমন ধান কাটার দুই-তিন সপ্তাহ আগে, জমিতে যখন পানি নেমে মাটি কাদা-ভেজা, তখন দাঁড়ানো ধানের মধ্যে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয় (সাথী বা রিলে চাষ)। চাষের প্রয়োজন নেই। প্রতি শতাংশে আনুমানিক ১৫০–২০০ গ্রাম বীজ।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

বিনা চাষে ভেজা মাটিতে বীজ পড়ে নিজেই গজায়। ধান কাটার সময় খেসারির চারা যাতে বেশি মাড়ানো না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা; ধানের নাড়া কিছুটা উঁচু রেখে কাটলে খেসারির চারা ছায়া ও সুরক্ষা পায়।

পরিচর্যা

  • সাধারণত সেচ বা সার লাগে না; মাটির অবশিষ্ট আর্দ্রতায় চলে।
  • ধান কাটার পর জমিতে গবাদিপশু ছেড়ে না দেওয়া, অন্তত ফুল আসা পর্যন্ত।
  • জাব পোকা দেখলে সাবান-পানি।
  • পশুখাদ্যের জন্য কিছু অংশ সবুজ অবস্থায় কেটে গরুকে দেওয়া যায়।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় ফাল্গুন–চৈত্র (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য এপ্রিল)।

ফাল্গুন-চৈত্রে গাছ শুকিয়ে শুঁটি বাদামি হলে কাটা হয়। রোদে শুকিয়ে মাড়াই; খড় গবাদিপশুর খাবার। খেসারির শিকড়ের গুটি মাটিতে থেকে যায়, যা পরের ফসলের জন্য নাইট্রোজেন যোগ করে।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

খেসারি-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
জাব পোকাকচি ডগা, ফুল ও শুঁটিতে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; গাছ দুর্বল হয়সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস; সময়মতো আগাম বোনা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ
পাউডারি মিলডিউপাতা ও কাণ্ডে সাদা পাউডারঘন না বোনা; আক্রান্ত অংশ সরানো
ডাউনি মিলডিউপাতার ওপর হলুদ দাগ, নিচে ছত্রাকসময়মতো বোনা; সহনশীল জাত
ফল ছিদ্রকারী পোকাফুল ও শুঁটিতে ছিদ্র, ভেতরে কীড়া দানা খায়আক্রান্ত শুঁটি তুলে নষ্ট; জমিতে ডাল পুঁতে পাখি বসার জায়গা; নিমের নির্যাস ফুল আসার সময়

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

খেসারি মূলত স্বপরাগী, তবে মৌমাছির মাধ্যমে কিছু সংকর হয়। কম ওডিএপি জাতের বিশুদ্ধতা রাখতে দেশি জাতের খেসারির থেকে আলাদা খণ্ডে, কয়েক দশ মিটার দূরে রাখা।

  1. জমির সবচেয়ে সুস্থ, সমান পাকা অংশ বীজের জন্য চিহ্নিত করুন; ভিন্ন রকম বা রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ফেলুন।
  2. বেশির ভাগ শুঁটি বাদামি ও শুকনো হলে, ফেটে দানা ঝরার আগে, সকালে শিশির থাকতে গাছ কাটুন বা তুলুন।
  3. কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে কাপড় বা ত্রিপলের ওপর লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মাড়াই করুন।
  4. কুলায় ঝেড়ে খোসা, ধুলা আর ভাঙা দানা বাদ দিন।
  5. আরও দুই-তিন দিন রোদে শুকান; দাঁতে চাপ দিলে কট করে ভাঙলে তৈরি।
  6. ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী পাত্রে নিমপাতা বা ছাইসহ রাখুন; ঢোরা পোকার জন্য মাসে একবার দেখুন।

বীজের আয়ু

খেসারির বীজ চৈত্রে সংগ্রহ হয়ে পরের আশ্বিন পর্যন্ত রাখতে হয়। শক্ত দানা, তবে ঢোরা পোকা ধরে; ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে দুই-তিন বছর চলে।

পুষ্টিগুণ

খেসারিতে প্রচুর আমিষ আর আঁশ আছে, আর এটি সস্তা আমিষের উৎস। তবে ওডিএপির কারণে প্রধান খাবার হিসেবে প্রতিদিন বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়; অন্য ডাল ও শস্যের সাথে পরিমিতভাবে, আর কম ওডিএপি জাত ব্যবহার করে। ডাল সারারাত ভিজিয়ে পানি ফেলে দিয়ে রান্না করলে ওডিএপি কিছুটা কমে। খেসারি ডালের বড়া ও ডাল-পুরি জনপ্রিয়।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।