সীড ব্যাংক · শাক

কলমি শাক

পুকুরপাড়, ভেজা নালা আর কাদামাটিতে আপনা থেকেই বেড়ে ওঠা কলমি শাক। গরম আর বর্ষায় প্রায় যত্ন ছাড়াই বারবার কাটা যায়, আর বীজ ও কাটিং দুভাবেই বংশবিস্তার।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়রবিখরিফ-১
নাম
কলমি শাক · Water spinach / Kangkong · Ipomoea aquatica
পরিবার
কলমিজাতীয় (কনভলভুলেসি)
জাতের ধরন
দেশি জাত; বীজ বা কাটিং দুভাবেই বংশবিস্তার, বীজ রাখা যায়
মৌসুম
রবি, খরিফ-১
বপন বা রোপণ
ফাল্গুন–আষাঢ় (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য জুলাই)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ৩০ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ১৫ সেমি; পুকুরপাড়ে ভেজা মাটিতে
ফসল তোলা
বোনা বা কাটিং থেকে প্রায় ২৫–৩০ দিনে প্রথম কাটা · বৈশাখ–আশ্বিন
বীজ সংগ্রহ
কার্তিক–অগ্রহায়ণ
বীজের আয়ু
প্রায় দুই থেকে তিন বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

দেশে দুই ধরনের কলমি পাওয়া যায়: পানিতে ভাসা, সরু পাতার পুকুরের কলমি, আর শুকনো মাটিতে চাষ উপযোগী চওড়া পাতার কলমি। দুটিই একই প্রজাতির। বারির মুক্ত-পরাগায়িত কলমি শাকের জাতও আছে। আমাদের খামারে ছোট পুকুরের পাড় আর বড় পুকুরের অগভীর কোণে কলমি থাকবে, আর কিছু সবজির বেডে।

পুকুরে কলমি বেশি ছড়ালে পানির ওপর আবরণ তৈরি করে মাছের ক্ষতি করতে পারে, তাই বাঁশের ফ্রেম বা দড়ি দিয়ে কলমির এলাকা সীমিত রাখা হবে।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী কলমি শাক বোনা বা রোপণ করা হয় ফাল্গুন–আষাঢ় (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য জুলাই), যা রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।

ফাল্গুন থেকে আষাঢ় পর্যন্ত বীজ বোনা বা কাটিং লাগানো হয়। বীজ এক রাত ভিজিয়ে সারিতে বোনা; কাটিংয়ের জন্য সুস্থ গাছের এক বিঘত লম্বা ডগা, যার দুই-তিনটি গিঁট ভেজা মাটিতে পুঁতে দিলেই কয়েক দিনে শিকড় হয়।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

কলমি আর্দ্র, উর্বর মাটি পছন্দ করে। বেডে চাষ করলে কম্পোস্ট মিশিয়ে নিয়মিত পানি; পুকুরপাড়ে পানির কিনারায় লাগালে সেচ প্রায় লাগে না। পুকুরে লাগালে ফ্রেমের ভেতরে, যাতে পুরো পুকুরে না ছড়ায়।

পরিচর্যা

  • নিয়মিত পানি বা ভেজা মাটি; শুকিয়ে গেলে কাণ্ড শক্ত হয়।
  • প্রথম কাটার পর গোড়ায় পাতলা স্লারি; দ্রুত নতুন ডগা আসে।
  • পুকুরের কলমি নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলে তুলে ফেলা।
  • শুঁয়োপোকা আর পাতা খাওয়া পোকা দেখলে হাতে বেছে ফেলা।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় বৈশাখ–আশ্বিন (মধ্য এপ্রিল – মধ্য অক্টোবর)।

কচি ডগা পাতাসহ, মাটি বা পানির কয়েক সেমি ওপর থেকে কাটা হয়, যাতে গিঁট থেকে নতুন শাখা বের হয়। বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে কাটা যায়। পুকুরের কলমি তোলার আগে পানি পরিষ্কার কি না দেখুন; শাক ভালো করে ধুয়ে রান্না করতে হবে।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

কলমি শাক-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
শুঁয়োপোকা ও লেদা পোকাপাতা ঝাঁঝরা, কখনো রাতারাতি অনেক পাতা খেয়ে ফেলেসকালে হাতে বেছে নষ্ট; ডিমের গাদা পাতা থেকে তুলে ফেলা; নিমের নির্যাস; পাখি বসার জায়গা রাখা
সাদা মরিচা রোগপাতার নিচে সাদা ফোসকার মতো দাগ, পাতা বিকৃতআক্রান্ত অংশ কেটে ফেলা; ঘন না রাখা
জাব পোকাকচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমেসাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ
শামুকরাতে কচি পাতা ও ডগা খায়সন্ধ্যায় হাতে তোলা; পুকুরে হাঁস শামুক খায়

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

কলমি সকালে ফোটা ফুলে মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়িত হয়, তবে নিজের পরাগেও বীজ হয়। খামারে একটিই জাত রাখলে বিশুদ্ধতা নিয়ে চিন্তা কম। কাটিং থেকে জন্মানো গাছ মা-গাছের মতোই হয়।

  1. বর্ষার শেষে বেডের কয়েকটি সতেজ গাছ কাটা বন্ধ করুন; শরতে দিন ছোট হলে সাদা বা হালকা বেগুনি ফুল আসবে।
  2. কার্তিক-অগ্রহায়ণে ফলগুলো বাদামি ও শুকনো হলে তুলুন; প্রতিটি ফলে কয়েকটি বীজ।
  3. ফল ভেঙে বীজ বের করে কয়েক দিন হালকা রোদে শুকান।
  4. বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
  5. সাথে কয়েকটি গাছ পুকুরপাড়ে জীবিত রাখুন; শীতে বৃদ্ধি থেমে গেলেও বসন্তে আবার কাটিংয়ের উৎস হবে।

বীজের আয়ু

কলমির বীজ শক্ত খোসার, শুকনো অবস্থায় দুই-তিন বছর ভালো থাকে। তবে কাটিং থেকে চাষ এত সহজ যে বীজ হারালেও জাত হারানোর ঝুঁকি কম।

পুষ্টিগুণ

কলমি শাকে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম আর আঁশ আছে। গ্রামবাংলায় দরিদ্র পরিবারের সহজলভ্য পুষ্টির উৎস। কলমি শাক ভাজি, রসুন দিয়ে, বা ডালে। পুকুরের দূষিত পানির কলমি খাওয়া উচিত নয়।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।