করলা
তিতা স্বাদের করলা অনেক পরিবারের পাতে প্রথম পদ। গরমের শুরু থেকে বর্ষা পর্যন্ত ফল দেয়, আর পাকলে কমলা হয়ে ফেটে লাল আবরণের বীজ বের হয়।
- নাম
- করলা · Bitter gourd · Momordica charantia
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; ছোট উচ্ছে ও বড় করলা দুই রকম
- বপন বা রোপণ
- মাঘ–চৈত্র (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য এপ্রিল)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১–১.৫ মিটার, সারি থেকে সারি প্রায় ১.৫ মিটার; মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনার প্রায় ৫০–৬০ দিনে প্রথম ফল · বৈশাখ–শ্রাবণ
- বীজ সংগ্রহ
- শ্রাবণ–ভাদ্র
- বীজের আয়ু
- তিন থেকে চার বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি করলার দুই ধরন: ছোট, কাঁটাওয়ালা, বেশি তিতা উচ্ছে, আর বড়, লম্বা, তুলনামূলক কম তিতা করলা। দুটি একই প্রজাতি, তাই পাশাপাশি লাগালে সংকর হবে। বারির মুক্ত-পরাগায়িত করলার জাতও আছে; বাজারের অনেক প্যাকেট হাইব্রিড, সতর্ক থাকতে হবে।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী করলা বোনা বা রোপণ করা হয় মাঘ–চৈত্র (মধ্য জানুয়ারি – মধ্য এপ্রিল), যা রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।
মাঘ থেকে চৈত্রে মাদায় বীজ বোনা। শক্ত খোসার বীজ এক রাত পানিতে ভিজিয়ে নিলে দ্রুত গজায়। প্রতি মাদায় দুই-তিনটি বীজ, পরে একটি-দুটি চারা। শীতের শেষে বুনলে গরমের শুরুতেই ফল আসে।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
করলার লতা ঝিঙা-লাউয়ের চেয়ে হালকা, তাই নিচু মাচা বা জাল টানা বেড়াও চলে। মাদায় কম্পোস্ট ও পচা গোবর, কিছু ছাই। সবজির বেডের পাশে বা পুকুরপাড়ের পূর্ব মাচায়।
পরিচর্যা
- লতা জালে বা মাচায় তুলে দেওয়া।
- গরমে নিয়মিত পানি, গোড়ায় খড়ের মালচ।
- প্রতি দুই সপ্তাহে পাতলা স্লারি।
- কচি ফল নিয়মিত তোলা, যাতে নতুন ফল আসে।
- কাঁটালে পোকা আর মাছি পোকার জন্য নিয়মিত পরিদর্শন।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় বৈশাখ–শ্রাবণ (মধ্য এপ্রিল – মধ্য আগস্ট)।
ফল সবুজ ও শক্ত থাকতে, কাঁটাগুলো স্পষ্ট আর ভেতরের বীজ নরম সাদা অবস্থায় তোলা হয়। ফল হলুদ হতে শুরু করলে তিতা ও আঁশ বাড়ে, আর কয়েক দিনে ফেটে যায়। সপ্তাহে দুই-তিনবার তোলা।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাছি পোকা (ফলের মাছি) | কচি ফলে ছিদ্র, ভেতরে পোকা, ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে পড়ে | ফেরোমন ফাঁদ; থেঁতো মিষ্টিকুমড়ার টোপ ফাঁদ; আক্রান্ত ফল তুলে গর্তে পুঁতে ফেলা; বীজের ফল কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা |
| কাঁটালে পোকা (এপিল্যাকনা বিটল) | হলদে-কমলা কালো ফোঁটার পোকা ও কাঁটাওয়ালা কীড়া পাতার সবুজ অংশ চেঁছে খায় | হাতে ধরে ও পাতার নিচের ডিমের গাদা নষ্ট; নিমের নির্যাস স্প্রে |
| পাউডারি মিলডিউ | পাতার ওপরে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ, পরে পাতা শুকায় | ঘন না লাগানো, বাতাস চলাচল; আক্রান্ত পাতা কেটে ফেলা; পাতলা দুধ-পানির দ্রবণ (এক ভাগ দুধ, নয় ভাগ পানি) রোদেলা সকালে স্প্রে |
| মোজাইক ভাইরাস | পাতা কুঁকড়ে যায়, হলুদ-সবুজ ছোপ; গাছ বাড়ে না | জাব ও সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ (সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস); আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা; এই গাছের বীজ রাখবেন না |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
করলা পোকার মাধ্যমে পরপরাগী। একই প্রজাতির অন্য জাত, এমনকি প্রতিবেশীর জমির হাইব্রিড, কাছাকাছি ফুটলে সংকর হতে পারে। তাই হয় এক মৌসুমে একটিই জাত, নয়তো বীজের ফলের জন্য হাতে পরাগায়ন করে ফুল ঢেকে রাখা (পদ্ধতি বীজ সংরক্ষণ পাতায়)। অন্তত কয়েকটি গাছ থেকে বীজ রাখুন, যাতে জাতের বৈচিত্র্য থাকে।
- সুস্থ গাছের কয়েকটি সুগঠিত ফল বীজের জন্য চিহ্নিত করে কাগজের ব্যাগে ঢেকে দিন (মাছি পোকা থেকে রক্ষা)।
- ফল কমলা হয়ে ফাটার ঠিক আগে বা সবে ফাটতে শুরু করলে তুলুন।
- লাল, পিচ্ছিল আবরণসহ বীজ বের করে পানিতে ঘষে আবরণ তুলে ফেলুন।
- ধুয়ে ছায়ায় ও হালকা রোদে কয়েক দিন শুকান।
- বায়ুরোধী পাত্রে লেবেলসহ রাখুন; লেবেলে লিখুন উচ্ছে না বড় করলা।
বীজের আয়ু
করলার বীজ শক্ত খোসার, শুকনো অবস্থায় কয়েক বছর ভালো থাকে। প্রতি দুই বছরে নবায়ন। পুরোনো বীজ বোনার আগে ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম ভালো হয়।
পুষ্টিগুণ
করলায় ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ফোলেট, আঁশ আর নানা উদ্ভিজ্জ উপাদান আছে; ক্যালরি কম। লোকজ চর্চায় করলা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে উপকারী বলে বিবেচিত, তবে ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়। করলা ভাজি, শুক্তো, বা ভর্তা জনপ্রিয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।