লালশাক
বীজ ছিটালে এক মাসের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগী লালশাক। শীতের প্রধান শাক, আর ছোট বেডে বারবার বোনা যায়। খুব ছোট বীজ, কিন্তু একটি গাছই হাজার হাজার বীজ দেয়।
- নাম
- লালশাক · Red amaranth · Amaranthus tricolor
- পরিবার
- নটেজাতীয় (অ্যামারান্থেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
- বপন বা রোপণ
- আশ্বিন–মাঘ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)
- দূরত্ব
- ছিটিয়ে বা সারিতে; সারি থেকে সারি প্রায় ২০ সেমি, পরে গাছ পাতলা করা
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ২৫–৩৫ দিন · কার্তিক–ফাল্গুন
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি লালশাকের পাতা পুরো লাল, লাল-সবুজ মেশানো বা মাঝখানে লাল ছোপ। বারির মুক্ত-পরাগায়িত লালশাকের জাত (যেমন বারি লালশাক-১) আছে। লালশাক, ডাঁটা আর কাঁটানটে একই গণের বিভিন্ন প্রজাতি বা জাত; কাছাকাছি ফুল ফুটলে নিজেদের মধ্যে কিছু সংকর হতে পারে, তাই বীজের গাছ আলাদা রাখতে হবে।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লালশাক বোনা বা রোপণ করা হয় আশ্বিন–মাঘ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।
আশ্বিন থেকে মাঘ পর্যন্ত প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে একটি ছোট বেডে বোনা হয়, যাতে সারা শীত টাটকা শাক পাওয়া যায়। বীজ খুব ছোট, তাই শুকনো বালি বা ছাইয়ের সাথে মিশিয়ে ছিটালে সমানভাবে পড়ে। গরমের দিনেও লালশাক হয়, তবে তখন দ্রুত ফুল এসে যায়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
বেডের মাটি খুব মিহি ও ঝুরঝুরে করতে হয়, কারণ বীজ ছোট। কম্পোস্ট বা কেঁচো সার মিশিয়ে, বোনার পর ওপরে হালকা মাটি বা কম্পোস্টের পাতলা স্তর। ঝাঁঝরি দিয়ে হালকা পানি, যাতে বীজ ধুয়ে না যায়। লালশাক অন্য ফসলের সারির ফাঁকে সাথী ফসল হিসেবেও বোনা যায়।
পরিচর্যা
- গজানোর এক-দুই সপ্তাহে ঘন জায়গা থেকে চারা তুলে পাতলা করা; তুলে ফেলা চারাই প্রথম শাক।
- নিয়মিত হালকা পানি; শুকনো মাটিতে গাছ দ্রুত ফুলে চলে যায়।
- আগাছা ছোট থাকতেই হাতে তুলে ফেলা।
- শুঁয়োপোকা ও পাতা মোড়ানো পোকা হাতে বেছে ফেলা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–ফাল্গুন (মধ্য অক্টোবর – মধ্য মার্চ)।
গাছ এক বিঘত উঁচু হলে পুরো গাছ শিকড়সহ তোলা যায়, অথবা গোড়া রেখে কেটে নিলে আবার নতুন পাতা গজায়। কার্তিক থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত বিভিন্ন বেড থেকে তোলা। সকালে তোলা শাক বেশি সতেজ থাকে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| শুঁয়োপোকা ও লেদা পোকা | পাতা ঝাঁঝরা, কখনো রাতারাতি অনেক পাতা খেয়ে ফেলে | সকালে হাতে বেছে নষ্ট; ডিমের গাদা পাতা থেকে তুলে ফেলা; নিমের নির্যাস; পাখি বসার জায়গা রাখা |
| পাতা মোড়ানো পোকা | কচি পাতা জাল দিয়ে মুড়িয়ে ভেতরে কীড়া | আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে নষ্ট; নিমের নির্যাস |
| সাদা মরিচা রোগ | পাতার নিচে সাদা ফোসকার মতো দাগ | আক্রান্ত গাছ সরানো; ঘন না বোনা; শস্য পর্যায় |
| চারা ঢলে পড়া | চারার গোড়া পানিতে ভেজা মতো হয়ে সরু হয়, চারা মাটিতে শুয়ে পড়ে | বীজতলা উঁচু ও ঝুরঝুরে; অতিরিক্ত পানি নয়; বীজতলার মাটি রোদে শুকিয়ে বা পুড়িয়ে নেওয়া; ঘন করে না বোনা |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
লালশাক বাতাস ও পোকার মাধ্যমে পরাগায়িত হয়। বীজের জন্য অন্তত দশ-পনেরোটি গাছ একসাথে রাখুন, আর একই সময়ে ডাঁটা বা অন্য লালশাকের জাত কাছাকাছি ফুল ফোটাতে দেবেন না; সম্ভব হলে কয়েকশ মিটার দূরত্ব, নয়তো ফুল ফোটার সময় আলাদা করে বোনা।
- শীতের মাঝামাঝি একটি ছোট বেডের সবচেয়ে সুন্দর রঙের, সতেজ গাছগুলো তোলা বন্ধ করুন।
- গাছে লম্বা ফুলের মঞ্জরি আসবে; ফাল্গুন-চৈত্রে মঞ্জরি শুকিয়ে বাদামি হলে আর ঝাঁকালে কালো বীজ ঝরলে তৈরি।
- মঞ্জরি কেটে কাগজের ব্যাগ বা কাপড়ের ওপর উপুড় করে কয়েক দিন শুকান।
- হাতে ঘষে বা আলতো পিটিয়ে বীজ ঝরান; কুলায় বা হালকা বাতাসে খোসা উড়িয়ে চকচকে কালো বীজ রাখুন।
- খুব ছোট বীজ, তাই কাগজের খামে লেবেল দিয়ে বায়ুরোধী বয়ামে রাখুন।
বীজের আয়ু
লালশাকের ছোট বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে কয়েক বছর ভালো থাকে। এক মৌসুমের অল্প কয়েকটি গাছই কয়েক বছরের বীজ দেয়।
পুষ্টিগুণ
লালশাকে ভিটামিন এ (বিটা ক্যারোটিন), ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম আর আঁশ আছে। দেশে রক্তস্বল্পতা ও ভিটামিন এ-র ঘাটতি দূর করতে লালশাক খুবই উপকারী। লালশাক ভাজি, রসুন দিয়ে, বা ডালে। বেশি সেদ্ধ না করে অল্প সময়ে রান্না করলে পুষ্টি বেশি থাকে।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।