লাউ শাক
লাউয়ের কচি ডগা আর পাতা আলাদা একটি সবজি। শীতের সকালে লাউ শাক ভাজি বা ডাল দিয়ে রান্না অনেক পরিবারের প্রিয়। একই গাছ থেকে শাক আর ফল দুটোই নেওয়া যায়, বা আলাদা শাকের গাছ রাখা যায়।
- নাম
- লাউ শাক · Bottle gourd leaves and shoots · Lagenaria siceraria
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- লাউয়ের মতোই দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত; বীজ আসে লাউয়ের বীজ থেকে
- মৌসুম
- খরিফ-২
- বপন বা রোপণ
- ভাদ্র–আশ্বিন (মধ্য আগস্ট – মধ্য অক্টোবর)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১–১.৫ মিটার; মাটিতে বা নিচু মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনার প্রায় ৩০–৪০ দিন পর থেকে নিয়মিত · কার্তিক–মাঘ
- বীজ সংগ্রহ
- লাউয়ের বীজ থেকে; এই গাছ থেকে নয়
- বীজের আয়ু
- লাউয়ের বীজের মতোই, চার থেকে ছয় বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
লাউ শাকের জন্য আলাদা কোনো জাত লাগে না; যে দেশি লাউ চাষ হয়, তার ডগাই শাক। তবে কিছু দেশি জাত বেশি সতেজ, নরম ও বেশি শাখাওয়ালা ডগা দেয়, সেগুলো শাকের জন্য ভালো। আমাদের পরিকল্পনা হলো মাচার লাউ গাছের পাশাপাশি সবজির বেডের এক কোণে কয়েকটি গাছ শুধু শাকের জন্য রাখা, যেগুলো মাচায় না উঠে মাটিতে বা নিচু মাচায় লতাবে।
শাকের গাছ থেকে বীজ রাখা হবে না, কারণ বারবার ডগা কাটায় গাছ দুর্বল হয় আর ফল ঠিকমতো পাকে না। বীজ আসবে মাচার বাছাই করা লাউ গাছ থেকে; বিস্তারিত লাউ পাতায়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লাউ শাক বোনা বা রোপণ করা হয় ভাদ্র–আশ্বিন (মধ্য আগস্ট – মধ্য অক্টোবর), যা খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।
লাউয়ের মতোই ভাদ্র-আশ্বিনে বীজ বোনা। শাকের জন্য একটু ঘন করে, প্রতি মাদায় দুটি চারা রাখা যায়। গ্রীষ্মের শুরুতে আরেক দফা বুনলে বর্ষায়ও কিছু শাক পাওয়া যায়, যদিও তখন পোকা বেশি।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
সবজির বেডের এক প্রান্তে বা পুকুরপাড়ের ঢালে মাদা তৈরি, কম্পোস্ট মিশিয়ে। শাকের গাছ নিচু, প্রায় আধা মিটার উঁচু বাঁশের ফ্রেমে বা খড় বিছানো মাটিতে লতাতে পারে। মাটিতে রাখলে নিচে শুকনো খড় বিছালে ডগা পরিষ্কার থাকে আর পচে না।
পরিচর্যা
- চারা পাঁচ-ছয় পাতার হলে প্রথম ডগা ভেঙে দিলে পাশে অনেক শাখা হয়।
- নিয়মিত পানি; শুকনো মাটিতে ডগা শক্ত আর আঁশযুক্ত হয়।
- প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে গোড়ায় পাতলা স্লারি বা কেঁচো সার।
- ডগা কাটার পর গাছে চাপ পড়ে, তাই প্রতিবার সব শাখা না কেটে কিছু রেখে দেওয়া।
- পাতার নিচে জাব পোকা বা লাল বিটল নিয়মিত দেখা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–মাঘ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)।
প্রতিটি শাখার আগা থেকে প্রায় এক বিঘত লম্বা কচি ডগা, দুই-তিনটি নরম পাতাসহ ভেঙে বা কেটে নেওয়া হয়। সপ্তাহে একবার বা দুবার তোলা যায়। সকালে তোলা শাক বেশি সতেজ থাকে। শক্ত হয়ে যাওয়া পাতা বা কাণ্ড কম্পোস্টে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| লাল পামকিন বিটল | চারা ও কচি পাতায় ছোট লাল-কমলা পোকা, পাতা ঝাঁঝরা করে | সকালে শিশির থাকতে পাতায় ছাই ছিটানো; হাতে ধরে নষ্ট; চারা অবস্থায় হালকা জাল দিয়ে ঢেকে রাখা |
| জাব পোকা | কচি ডগা ও পাতার নিচে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল, পাতা কুঁকড়ে যায় | সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস স্প্রে; লেডিবার্ড বিটলের মতো উপকারী পোকা রক্ষা; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা |
| পাউডারি মিলডিউ | পাতার ওপরে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ, পরে পাতা শুকায় | ঘন না লাগানো, বাতাস চলাচল; আক্রান্ত পাতা কেটে ফেলা; পাতলা দুধ-পানির দ্রবণ (এক ভাগ দুধ, নয় ভাগ পানি) রোদেলা সকালে স্প্রে |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতার ওপরে হলুদ কোনাকুনি দাগ, নিচে ধূসর ছত্রাক; বর্ষায় বেশি | মাচায় তুলে পাতা মাটি থেকে দূরে রাখা; গোড়ায় পানি দেওয়া, পাতায় নয়; আক্রান্ত পাতা সরানো |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
শাকের গাছ থেকে বীজ রাখা হয় না। বীজের জন্য লাউ পাতায় দেওয়া নিয়ম মেনে মাচার বাছাই করা গাছ থেকে পাকা লাউ রাখা হবে। শাক আর ফলের জন্য একই দেশি জাত ব্যবহার করলে বীজ ব্যবস্থাপনা সহজ থাকে।
- শাকের গাছ চিহ্নিত করে রাখুন, যাতে ভুল করে এগুলোর ফল বীজের জন্য রাখা না হয়।
- বীজের জন্য মাচার সুস্থ লাউ গাছের একটি-দুটি ফল গাছেই পুরো পাকতে দিন।
- খোল শক্ত ও বাদামি হলে কেটে ছায়ায় শুকিয়ে বীজ বের করুন।
- বীজ শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে লেবেলসহ রাখুন; লেবেলে লিখুন “লাউ ও লাউ শাক”।
বীজের আয়ু
শাকের জন্য আলাদা বীজ রাখতে হয় না বলে এর আয়ু লাউয়ের বীজের মতোই। শাক বোনার আগে লাউয়ের বীজের সর্বশেষ অঙ্কুরোদগম পরীক্ষার ফল দেখে নিন।
পুষ্টিগুণ
লাউ শাকে লাউয়ের ফলের চেয়ে বেশি পুষ্টি: ভিটামিন এ (বিটা ক্যারোটিন), ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন আর আঁশ। সবুজ শাক নিয়মিত খেলে শিশুদের রাতকানা রোগ ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমে। লাউ শাক ভাজি, ডাল দিয়ে, বা চিংড়ি দিয়ে রান্না করা যায়; বেশি সেদ্ধ না করলে ভিটামিন কম নষ্ট হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।