লাউ
শীতের মাচায় ঝুলে থাকা লাউ বাংলার উঠানের চিরচেনা ছবি। একটি গাছ থেকেই মাসের পর মাস লাউ আর লাউ শাক, আর পাকা শুকনো লাউয়ের খোলে বছরের বীজ।
- নাম
- লাউ · Bottle gourd · Lagenaria siceraria
- পরিবার
- কুমড়াজাতীয় (কিউকারবিটেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; গোল বা লম্বা, যে আকার পরিবারের পছন্দ
- মৌসুম
- খরিফ-২
- বপন বা রোপণ
- ভাদ্র–আশ্বিন (মধ্য আগস্ট – মধ্য অক্টোবর)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ২ মিটার, সারি থেকে সারি প্রায় ২ মিটার; মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রথম ফল প্রায় ৬০–৭০ দিনে · কার্তিক–ফাল্গুন
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে চার থেকে ছয় বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি লাউ মূলত দুই রকম: লম্বা আর গোল বা কলসি আকৃতির। গায়ের রং হালকা থেকে গাঢ় সবুজ, কোনোটায় সাদা ছিট। দেশি জাতগুলো সাধারণত সতেজ, অনেক শাখা দেয়, আর একই গাছে দীর্ঘদিন ফল ধরে। বারির কিছু মুক্ত-পরাগায়িত লাউয়ের জাতও আছে; বাজারের বেশির ভাগ প্যাকেট অবশ্য হাইব্রিড, তাই কেনার আগে প্যাকেট দেখতে হবে।
প্রথম বীজের সবচেয়ে ভালো উৎস প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের বাড়ি, যেখানে বছরের পর বছর নিজের লাউয়ের বীজ রাখা হয়। একটি পাকা লাউয়ে কয়েকশ বীজ থাকে, যা পুরো খামারের জন্য যথেষ্ট।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী লাউ বোনা বা রোপণ করা হয় ভাদ্র–আশ্বিন (মধ্য আগস্ট – মধ্য অক্টোবর), যা খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।
শীতের লাউয়ের জন্য ভাদ্র-আশ্বিনে বীজ বোনা হয়। বীজ ১২–২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে দ্রুত গজায়। মাদায় সরাসরি দুই-তিনটি বীজ, অথবা পলিব্যাগে চারা করে তিন-চার পাতা হলে মাদায় লাগানো যায়। গজানোর পর প্রতি মাদায় একটি-দুটি সবল চারা রেখে বাকি তুলে ফেলুন। গ্রীষ্মেও লাউ হয়, তবে তখন মাছি পোকা আর রোগ বেশি।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
প্রতিটি মাদা প্রায় আধা মিটার চওড়া ও গভীর, তাতে পচা গোবর বা কম্পোস্ট আর কিছু ছাই মিশিয়ে বোনার এক-দুই সপ্তাহ আগে তৈরি। লাউয়ের শিকড় অনেক দূর ছড়ায়, তাই মাদা বড় হলে ভালো। পুকুরপাড়ের মাচায় লাউ সবচেয়ে উপযোগী: পানি কাছে, আর মাচার ছায়া পাড়ের মাটিকে ঠান্ডা রাখে। মাচা প্রায় দুই মিটার উঁচু, যাতে নিচ দিয়ে হাঁটা যায়।
পরিচর্যা
- চারা লতাতে শুরু করলে বাঁশের কঞ্চি বা দড়ি দিয়ে মাচায় তুলে দেওয়া।
- মাচায় ওঠার আগ পর্যন্ত গোড়ার দিকের পাশের ডাল ছেঁটে ফেলা; এতে মাচায় শাখা বেশি হয়।
- শুকনো মৌসুমে সপ্তাহে দুই-তিনবার গোড়ায় পানি; পাতায় নয়।
- ফুল আসার পর মাসে দুবার পাতলা স্লারি বা কম্পোস্ট-চা গোড়া থেকে একটু দূরে।
- স্ত্রী ফুল বেশি হলেও ফল না ধরলে সকালে হাতে পরাগায়ন।
- গোড়ায় খড়ের মালচ, যাতে মাটির আর্দ্রতা থাকে আর আগাছা কম হয়।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–ফাল্গুন (মধ্য অক্টোবর – মধ্য মার্চ)।
খাওয়ার লাউ কচি অবস্থায়: নখ দিয়ে চাপ দিলে সহজে দাগ বসে, গায়ে হালকা লোম থাকে। পরাগায়নের প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই খাওয়ার উপযোগী। নিয়মিত তুললে গাছ নতুন ফল দিতে থাকে। বীজের জন্য রাখা লাউ গাছেই পুরো পাকতে দেওয়া হয়।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| মাছি পোকা (ফলের মাছি) | কচি ফলে ছিদ্র, ভেতরে পোকা, ফল হলুদ হয়ে পচে ঝরে পড়ে | ফেরোমন ফাঁদ; থেঁতো মিষ্টিকুমড়ার টোপ ফাঁদ; আক্রান্ত ফল তুলে গর্তে পুঁতে ফেলা; বীজের ফল কাগজ বা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা |
| লাল পামকিন বিটল | চারা ও কচি পাতায় ছোট লাল-কমলা পোকা, পাতা ঝাঁঝরা করে | সকালে শিশির থাকতে পাতায় ছাই ছিটানো; হাতে ধরে নষ্ট; চারা অবস্থায় হালকা জাল দিয়ে ঢেকে রাখা |
| পাউডারি মিলডিউ | পাতার ওপরে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ, পরে পাতা শুকায় | ঘন না লাগানো, বাতাস চলাচল; আক্রান্ত পাতা কেটে ফেলা; পাতলা দুধ-পানির দ্রবণ (এক ভাগ দুধ, নয় ভাগ পানি) রোদেলা সকালে স্প্রে |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতার ওপরে হলুদ কোনাকুনি দাগ, নিচে ধূসর ছত্রাক; বর্ষায় বেশি | মাচায় তুলে পাতা মাটি থেকে দূরে রাখা; গোড়ায় পানি দেওয়া, পাতায় নয়; আক্রান্ত পাতা সরানো |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
লাউ পোকার মাধ্যমে পরপরাগী। একই প্রজাতির অন্য জাত, এমনকি প্রতিবেশীর জমির হাইব্রিড, কাছাকাছি ফুটলে সংকর হতে পারে। তাই হয় এক মৌসুমে একটিই জাত, নয়তো বীজের ফলের জন্য হাতে পরাগায়ন করে ফুল ঢেকে রাখা (পদ্ধতি বীজ সংরক্ষণ পাতায়)। অন্তত কয়েকটি গাছ থেকে বীজ রাখুন, যাতে জাতের বৈচিত্র্য থাকে।
- মৌসুমের শুরুতে সবচেয়ে সুস্থ গাছের একটি-দুটি ভালো আকারের ফল চিহ্নিত করে সুতা বাঁধুন।
- ফলটি গাছেই থাকবে যতক্ষণ না গাছ মরে যায় আর খোল বাদামি, শক্ত হয়; প্রায় আড়াই-তিন মাস।
- তারপর লাউ বোঁটাসহ কেটে বাতাস চলাচল করে এমন ছায়ায় ঝুলিয়ে রাখুন; ঝাঁকালে ভেতরে বীজের শব্দ হবে।
- খোল ভেঙে বা মুখ কেটে বীজ বের করুন; লেগে থাকা শুকনো শাঁস ঘষে পরিষ্কার।
- দুই-তিন দিন ছায়ায়, তারপর হালকা রোদে শুকান; ভাঙার পরীক্ষায় খটখট করে ভাঙলে তৈরি।
- বায়ুরোধী বয়ামে লেবেল দিয়ে রাখুন। অনেকে আস্ত শুকনো খোলের ভেতরেই বীজ রেখে দেন; সেটাও চলে, যদি ঘর শুকনো থাকে।
বীজের আয়ু
লাউয়ের বীজ দীর্ঘজীবী। ঠিকমতো শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে কয়েক বছর ভালো অঙ্কুরোদগম দেয়। তবু প্রতি দুই-তিন বছরে নতুন বীজ রাখা ভালো, যাতে জাতটি আমাদের মাঠের সাথে মানিয়ে নিতে থাকে।
পুষ্টিগুণ
লাউয়ের প্রায় পুরোটাই পানি, তাই হালকা ও সহজপাচ্য; গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে বলে লোকবিশ্বাস। এতে আঁশ, কিছু ভিটামিন সি ও খনিজ আছে, ক্যালরি খুব কম। লাউ দিয়ে ডাল, মাছ, চিংড়ি বা দুধ-লাউ, নানা রান্না। কচি পাতা ও ডগা আলাদা শাক হিসেবে আরও পুষ্টিকর; দেখুন লাউ শাক। তিতা স্বাদের লাউ খাবেন না; এমন ফলে বিষাক্ত উপাদান থাকতে পারে।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।