সীড ব্যাংক · মসলা

মরিচ

বাঙালির রান্নায় মরিচ ছাড়া চলে না। কাঁচা সবুজ মরিচ শীতজুড়ে, আর লাল পাকা মরিচ শুকিয়ে সারা বছরের মসলা। বীজ রাখাও সহজ: সবচেয়ে টকটকে লাল মরিচগুলোই বীজের উৎস।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-২রবি
নাম
মরিচ · Chilli · Capsicum annuum (কিছু দেশি জাত C. frutescens)
পরিবার
বেগুনজাতীয় (সোলানেসি)
জাতের ধরন
দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
মৌসুম
খরিফ-২, রবি
বপন বা রোপণ
ভাদ্র–কার্তিক (মধ্য আগস্ট – মধ্য নভেম্বর)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ৫০ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ৪০ সেমি
ফসল তোলা
রোপণ থেকে প্রায় ৬০–৭০ দিনে কাঁচা মরিচ · অগ্রহায়ণ–চৈত্র
বীজ সংগ্রহ
মাঘ–ফাল্গুন
বীজের আয়ু
প্রায় দুই থেকে তিন বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

দেশি মরিচের বৈচিত্র্য অনেক: ছোট, খুব ঝাল “ধানি” বা “বোম্বাই” ধরনের, লম্বা সরু, আর মোটা কম ঝালের মরিচ। বারির মুক্ত-পরাগায়িত মরিচের জাত (যেমন বারি মরিচ-১, বাংলা লঙ্কা) আছে। বাজারের অনেক প্যাকেট হাইব্রিড, তাই যাচাই জরুরি। আমাদের পরিকল্পনা দুটি জাত: একটি কাঁচা মরিচের জন্য বেশি ফলনশীল, আরেকটি শুকনো মরিচের জন্য ঘন লাল রঙের।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মরিচ বোনা বা রোপণ করা হয় ভাদ্র–কার্তিক (মধ্য আগস্ট – মধ্য নভেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।

ভাদ্র-আশ্বিনে বীজতলায় বীজ বোনা, ওপরে বৃষ্টি থেকে রক্ষার চালা। চারার বয়স প্রায় এক মাস, পাঁচ-ছয় পাতা হলে আশ্বিন-কার্তিকে মূল জমিতে রোপণ। বর্ষাকালেও উঁচু জমিতে মরিচ হয়, তবে রোগ বেশি।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

মরিচ জলাবদ্ধতা একেবারেই সহ্য করে না, তাই উঁচু বেড আর ভালো নিষ্কাশন জরুরি। বেডে কম্পোস্ট ও ছাই। আগের মৌসুমে বেগুন, টমেটো বা আলু ছিল এমন জায়গায় মরিচ নয়। সবজির বেডের চারপাশেও এক সারি মরিচ লাগানো যায়।

পরিচর্যা

  • রোপণের পর কয়েক দিন বিকেলে হালকা পানি, তারপর মাটি শুকালে সেচ; অতিরিক্ত পানি নয়।
  • গাছ বড় হলে গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া; ফলভারে হেলে পড়লে খুঁটি।
  • মাসে একবার কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।
  • পাতা কোঁকড়ানো দেখলে থ্রিপস ও মাকড় আছে কি না পাতার নিচে দেখা।
  • ফুল ঝরা কমাতে মাটির আর্দ্রতা সমান রাখা।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় অগ্রহায়ণ–চৈত্র (মধ্য নভেম্বর – মধ্য এপ্রিল)।

অগ্রহায়ণ থেকে চৈত্র পর্যন্ত কাঁচা মরিচ সপ্তাহে একবার-দুবার তোলা হয়। শুকনো মরিচের জন্য গাছে পুরো লাল হতে দিয়ে তোলা, তারপর চাটাইয়ে কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে। শুকনো মরিচ গুঁড়ো করে সারা বছরের মসলা।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

মরিচ-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
পাতা কোঁকড়ানো (থ্রিপস ও মাকড়)পাতা ওপরে বা নিচে কুঁকড়ে নৌকার মতো হয়, গাছ খাটো থাকেনিমের নির্যাস পাতার নিচে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; নিয়মিত সেচ; মারাত্মক আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা
অ্যানথ্রাকনোজ (ফল পচা)পাকা ফলে বসে যাওয়া কালো-বাদামি দাগ, ফল পচেআক্রান্ত ফল সরানো; সুস্থ ফলের বীজ; ঘন না লাগানো
ঢলে পড়া রোগগাছ হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে মরে যায়উঁচু বেড; শস্য পর্যায়; আক্রান্ত গাছ শিকড়সহ তুলে ফেলা
জাব পোকাকচি ডগা, ফুল ও শুঁটিতে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; গাছ দুর্বল হয়সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস; সময়মতো আগাম বোনা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

মরিচ স্বপরাগী, তবে পোকার মাধ্যমে বেশ খানিকটা সংকর হয়। দুটি জাত থাকলে অন্তত কয়েক দশ মিটার দূরে, ভালো হয় আরও বেশি; অথবা বীজের গাছের কয়েকটি ফুল ফোটার আগে পাতলা কাপড়ের ব্যাগে ঢেকে রাখা। আশপাশে হাইব্রিড মরিচ থাকলে ব্যাগ ব্যবহার অবশ্যই।

  1. জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, রোগমুক্ত, ফলনশীল কয়েকটি গাছ চিহ্নিত করুন।
  2. গাছের মাঝের দিকের কয়েকটি সুগঠিত মরিচ পুরো লাল ও কিছুটা কোঁচকানো হওয়া পর্যন্ত গাছেই রাখুন।
  3. তুলে কয়েক দিন ছায়ায় শুকিয়ে নিন, তারপর লম্বালম্বি চিরে বীজ বের করুন; হাতমোজা পরুন, চোখে হাত দেবেন না।
  4. বীজ কাগজে ছড়িয়ে কয়েক দিন ছায়ায় ও হালকা রোদে শুকান।
  5. বায়ুরোধী পাত্রে লেবেলসহ রাখুন।

বীজের আয়ু

মরিচের বীজ মাঘ-ফাল্গুনে সংগ্রহ হয়ে পরের ভাদ্র পর্যন্ত রাখতে হয়। ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে দুই-তিন বছর চলে, তবে প্রতি বছর নতুন বীজ রাখাই ভালো, কারণ পুরোনো মরিচ বীজের অঙ্কুরোদগম দ্রুত কমে।

পুষ্টিগুণ

কাঁচা মরিচে প্রচুর ভিটামিন সি, আর পাকা লাল মরিচে ভিটামিন এ। ঝালের উৎস ক্যাপসাইসিন। অল্প পরিমাণে খেলেও খাবারে স্বাদ ও পুষ্টি যোগ করে।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।