সীড ব্যাংক · সবজি

মুলা

শীতের দ্রুততম ফসলের একটি মুলা। দেড়-দুই মাসেই মূল আর শাক দুটোই পাতে। বীজ রাখতে হলে কয়েকটি ভালো মুলা মাঠে রেখে দিতে হয় শীতের শেষ পর্যন্ত, যখন ফুল আর শুঁটি আসে।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-২রবি
নাম
মুলা · Radish · Raphanus sativus
পরিবার
সরিষাজাতীয় (ব্র্যাসিকেসি)
জাতের ধরন
মুক্ত-পরাগায়িত জাত; দেশি ও বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাত আছে
মৌসুম
খরিফ-২, রবি
বপন বা রোপণ
ভাদ্র–অগ্রহায়ণ (মধ্য আগস্ট – মধ্য ডিসেম্বর)
দূরত্ব
সারি থেকে সারি প্রায় ৩০ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ১০–১৫ সেমি
ফসল তোলা
বোনা থেকে প্রায় ৩৫–৫০ দিন · আশ্বিন–মাঘ
বীজ সংগ্রহ
ফাল্গুন–চৈত্র
বীজের আয়ু
প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

দেশি মুলা লম্বা, সাদা, কোনোটা কিছুটা ঝাঁঝালো; কিছু জাতের মূল লালচে। বারির মুক্ত-পরাগায়িত মুলার জাত (যেমন বারি মুলা-১) দেশে বীজ উৎপাদন করা যায়। বাজারের অনেক বিদেশি মুলার বীজ হাইব্রিড; সেগুলো আমাদের খামারে নয়।

মুলার শাকও খুব জনপ্রিয়। তাই কিছু বেড ঘন করে বুনে কচি অবস্থায় শাক হিসেবে তোলা হবে, আর বাকি বেডে ফাঁকা করে মূলের জন্য।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মুলা বোনা বা রোপণ করা হয় ভাদ্র–অগ্রহায়ণ (মধ্য আগস্ট – মধ্য ডিসেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।

ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণের মধ্যে কয়েক দফায় সরাসরি বেডে বোনা, প্রতি দুই-তিন সপ্তাহে একটি ছোট বেড, যাতে সারা শীত মুলা পাওয়া যায়। মুলা চারা রোপণ পছন্দ করে না, তাই সবসময় সরাসরি বোনা। বীজ এক-দেড় সেমি গভীরে।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

মুলার মূল সোজা ও লম্বা হওয়ার জন্য মাটি গভীর পর্যন্ত ঝুরঝুরে, ঢেলা ও পাথরমুক্ত হতে হবে। ভালো পচা কম্পোস্ট মেশানো; কাঁচা গোবর দিলে মূল শাখাযুক্ত ও বাঁকা হয়। চারা গজানোর এক-দুই সপ্তাহে পাতলা করে নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখা, তুলে ফেলা চারা শাক হিসেবে রান্নায়।

পরিচর্যা

  • চারা পাতলা করা; ঘন থাকলে মূল সরু হয়।
  • নিয়মিত হালকা পানি; মাটি শুকিয়ে গেলে মূল ঝাঁঝালো ও আঁশযুক্ত হয়।
  • মূল মাটির ওপরে বের হয়ে এলে হালকা মাটি টেনে দেওয়া।
  • জাব আর করাতি মাছির কীড়ার জন্য পাতায় নজর; সকালে ছাই ছিটানো।
  • বীজের জন্য রাখা গাছ চিহ্নিত করে তোলা থেকে বিরত থাকা।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় আশ্বিন–মাঘ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)।

মূল পূর্ণ আকারে এলেই, ভেতরে ফাঁপা বা আঁশযুক্ত হওয়ার আগে তোলা হয়। দেরি হলে মুলা কাঠের মতো শক্ত আর ঝাঁঝালো হয়। আশ্বিন থেকে মাঘ পর্যন্ত বিভিন্ন দফায় তোলা যায়। কচি পাতা শাক হিসেবে আলাদা রান্না।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

মুলা-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
জাব পোকাকচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমেসাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ
করাতি মাছিকালো কীড়া পাতা খেয়ে ঝাঁঝরা করে, বিশেষ করে চারা অবস্থায়সকালে পাতায় ছাই ছিটানো; হাতে বেছে নষ্ট; সেচ দিলে কীড়া কমে
অল্টারনারিয়া পাতা দাগপাতায় ও বীজের শুঁটিতে বাদামি চক্রাকার দাগআক্রান্ত পাতা সরানো; ঘন না বোনা; বীজের গাছ ঘন বেডে নয়
শুঁয়োপোকা ও লেদা পোকাপাতা ঝাঁঝরা, কখনো রাতারাতি অনেক পাতা খেয়ে ফেলেসকালে হাতে বেছে নষ্ট; ডিমের গাদা পাতা থেকে তুলে ফেলা; নিমের নির্যাস; পাখি বসার জায়গা রাখা

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

মুলা পোকার মাধ্যমে পরপরাগী, আর বেশির ভাগ গাছ নিজের পরাগে বীজ দেয় না। তাই অন্তত পনেরো-বিশটি গাছ একসাথে ফুল ফোটাতে হবে। আশপাশের জমিতে অন্য মুলার জাত ফুল দিলে সংকর হবে; সম্ভব হলে কয়েকশ মিটার দূরত্ব। সরিষা ও মুলা আলাদা প্রজাতি, সাধারণত নিজেদের মধ্যে সংকর হয় না।

  1. অগ্রহায়ণ-পৌষে তোলা মুলার মধ্য থেকে জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, সোজা, সুস্থ বিশ-পঁচিশটি মুলা বাছাই করুন।
  2. পাতার ওপরের অংশ কিছুটা রেখে কেটে, মূলের নিচের এক-তৃতীয়াংশ কেটে ফেলে বীজের বেডে আবার লাগান (মূল থেকে বীজ পদ্ধতি); অথবা বাছাই করা গাছ মাঠেই রেখে দিন।
  3. মাঘ-ফাল্গুনে লম্বা ডাঁটায় সাদা-বেগুনি ফুল, তারপর শুঁটি আসবে; ডাঁটা হেলে পড়লে খুঁটি দিন।
  4. শুঁটি বাদামি ও শুকনো হলে, ফাল্গুন-চৈত্রে পুরো ডাঁটা কেটে ছায়ায় আরও শুকান।
  5. শুঁটি শক্ত, সহজে ফাটে না; কাপড়ে রেখে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা হাতে ঘষে বীজ বের করুন।
  6. কুলায় ঝেড়ে পরিষ্কার করে বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।

বীজের আয়ু

মুলার বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে কয়েক বছর ভালো থাকে। বীজ উৎপাদনে সময় ও জায়গা বেশি লাগে বলে প্রতি দুই বছরে একবার বীজ রাখাই যথেষ্ট।

পুষ্টিগুণ

মুলায় ভিটামিন সি, আঁশ আর পটাশিয়াম আছে, ক্যালরি কম। মুলার শাকে মূলের চেয়ে বেশি পুষ্টি: ভিটামিন এ, সি, ক্যালসিয়াম আর আয়রন। মুলা ভাজি, মাছের ঝোলে, সালাদে, আর মুলা শাক ভাজি জনপ্রিয়। কচি শুঁটিও রান্না করে খাওয়া যায়।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।