পালংশাক
শীতের সবুজ পালংশাক বারবার কেটে খাওয়া যায়। দিন বড় হতে শুরু করলে ফুলের ডাঁটা আসে, আর বীজ রাখতে কয়েকটি গাছ মাঠে রেখে দিতে হয় শীতের শেষ পর্যন্ত।
- নাম
- পালংশাক · Spinach (local) · Spinacia oleracea
- পরিবার
- বিটজাতীয় (অ্যামারান্থেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির মুক্ত-পরাগায়িত জাতও আছে
- বপন বা রোপণ
- আশ্বিন–অগ্রহায়ণ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর)
- দূরত্ব
- সারি থেকে সারি প্রায় ২০–২৫ সেমি, পরে গাছ থেকে গাছ প্রায় ১০ সেমি
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ৩০–৪০ দিনে প্রথম কাটা · কার্তিক–মাঘ
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন–চৈত্র
- বীজের আয়ু
- প্রায় দুই থেকে তিন বছর; আর্দ্রতায় দ্রুত কমে
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশে পালংশাক নামে দুই ধরনের জাত চাষ হয়: চওড়া, মসৃণ পাতার “কপি পালং” ধরনের, আর সরু পাতার দেশি পালং। বারির মুক্ত-পরাগায়িত পালংশাকের জাতও (যেমন বারি পালংশাক-১) আছে। বাজারে আমদানিকৃত হাইব্রিড পালংয়ের বীজও পাওয়া যায়; সেগুলো আমাদের খামারে নয়।
পালংয়ের গাছ সাধারণত স্ত্রী বা পুরুষ, আলাদা হয়; তাই বীজের জন্য অনেক গাছ একসাথে রাখতে হয়, যাতে পরাগায়ন ঠিকমতো হয়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালংশাক বোনা বা রোপণ করা হয় আশ্বিন–অগ্রহায়ণ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।
আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণে কয়েক দফায় সরাসরি বেডে বোনা হয়। বীজের খোসা শক্ত, তাই বোনার আগে এক রাত পানিতে ভিজিয়ে নিলে দ্রুত গজায়। গরমে পালং ভালো হয় না, তাই খুব আগে বা খুব দেরিতে বোনা ঠিক নয়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
বেড ঝুরঝুরে, ভালো পচা কম্পোস্ট মেশানো। পালং কিছুটা অম্লীয় মাটিতে ভালো করে না; মাটি পরীক্ষায় খুব অম্লীয় হলে আগে থেকে ছাই বা চুন মেশানো যায়। চারা গজানোর পর পাতলা করে নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখা।
পরিচর্যা
- চারা পাতলা করা; তুলে ফেলা চারা রান্নায়।
- নিয়মিত হালকা পানি, মাটি সবসময় হালকা ভেজা।
- প্রথমবার কাটার পর পাতলা স্লারি বা কেঁচো সার, যাতে দ্রুত নতুন পাতা আসে।
- আগাছা পরিষ্কার।
- বীজের জন্য রাখা বেড চিহ্নিত করে সেখান থেকে শাক কাটা বন্ধ।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–মাঘ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)।
গাছে পাঁচ-ছয়টি পূর্ণ পাতা হলে মাটির একটু ওপর থেকে কেটে নেওয়া হয়, যাতে গোড়া থেকে আবার পাতা গজায়। কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত দুই-তিনবার কাটা যায়। ফুলের ডাঁটা বের হলে পাতা তিতা ও শক্ত হতে শুরু করে।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| পাতার দাগ রোগ | পাতায় ছোট গোল বাদামি বা ধূসর দাগ, পরে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে | আক্রান্ত পাতা তুলে ফেলা; ঘন না লাগানো; পাতায় নয়, গোড়ায় পানি; শস্য পর্যায় |
| শুঁয়োপোকা ও লেদা পোকা | পাতা ঝাঁঝরা, কখনো রাতারাতি অনেক পাতা খেয়ে ফেলে | সকালে হাতে বেছে নষ্ট; ডিমের গাদা পাতা থেকে তুলে ফেলা; নিমের নির্যাস; পাখি বসার জায়গা রাখা |
| জাব পোকা | কচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমে | সাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ |
| ডাউনি মিলডিউ | পাতার ওপরে হলুদ দাগ, নিচে ধূসর-বেগুনি ছত্রাক; কুয়াশার দিনে বেশি | ঘন না বোনা; সকালে পানি দেওয়া, সন্ধ্যায় নয়; আক্রান্ত পাতা সরানো |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
পালং বাতাসের মাধ্যমে পরাগায়িত হয়, আর পরাগ অনেক দূর যায়। আশপাশে অন্য পালংয়ের জাত ফুল দিলে সংকর হবে; সম্ভব হলে একটি জাত, আর কয়েকশ মিটার দূরত্ব। স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা বলে অন্তত বিশ-ত্রিশটি গাছ একসাথে বীজের জন্য রাখতে হয়।
- অগ্রহায়ণে বোনা একটি বেড বীজের জন্য রাখুন, কাটবেন না; দুর্বল বা আগাম ফুল দেওয়া গাছ তুলে ফেলুন।
- মাঘ-ফাল্গুনে দিন বড় হলে গাছে ফুলের ডাঁটা আসবে; পুরুষ গাছ পরাগ ঝরিয়ে মরে যায়, স্ত্রী গাছে বীজ হয়।
- ফাল্গুন-চৈত্রে স্ত্রী গাছ হলুদ-বাদামি হয়ে বীজ শক্ত হলে পুরো গাছ কেটে ছায়ায় শুকান।
- শুকনো গাছ কাপড়ের ওপর রেখে হাতে ঘষে বা পিটিয়ে বীজ ঝরান; কুলায় ঝেড়ে পরিষ্কার করুন।
- বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
বীজের আয়ু
পালংয়ের বীজ তুলনামূলক কম দিন টেকে, বিশেষ করে বর্ষার আর্দ্রতায়। চৈত্রে সংগ্রহ করা বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে আর্দ্রতা শোষকসহ রাখলে পরের আশ্বিনে ভালো গজায়। প্রতি বছর নতুন বীজ রাখাই নিরাপদ।
পুষ্টিগুণ
পালংশাকে ভিটামিন এ, ভিটামিন কে, ফোলেট, আয়রন আর আঁশ আছে। পালংয়ের আয়রন শরীর পুরোপুরি নিতে পারে না, তবে লেবু বা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের সাথে খেলে গ্রহণ বাড়ে। পালং ভাজি, ডাল-পালং, বা মাছ দিয়ে রান্না জনপ্রিয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।