পুঁইশাক
মোটা, রসালো পাতার লতানো পুঁইশাক গ্রীষ্ম আর বর্ষার শাক। বেড়া, মাচা বা ঘরের চালে উঠে মাসের পর মাস শাক দেয়, আর শরতে বেগুনি ফলে ভরে গেলে বছরের বীজ।
- নাম
- পুঁইশাক · Malabar spinach / Indian spinach · Basella alba
- পরিবার
- পুঁইজাতীয় (বাসেলেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; সবুজ ও লাল কাণ্ডের দুই ধরন
- বপন বা রোপণ
- ফাল্গুন–বৈশাখ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মে)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১ মিটার, সারি থেকে সারি প্রায় ৫০ সেমি; বেড়া বা নিচু মাচায়
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রায় ৪০–৪৫ দিনে প্রথম ডগা · বৈশাখ–ভাদ্র
- বীজ সংগ্রহ
- কার্তিক–অগ্রহায়ণ
- বীজের আয়ু
- প্রায় দুই থেকে তিন বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি পুঁইশাকের দুটি ধরন: সবুজ কাণ্ড ও সবুজ পাতা, আর লাল-বেগুনি কাণ্ডের লাল পুঁই। দুটিই একই প্রজাতির, স্বাদে সামান্য পার্থক্য। বারির মুক্ত-পরাগায়িত পুঁইশাকের জাতও আছে। পুঁইয়ের বীজ প্রায় সব গ্রামের বাড়িতে পাওয়া যায়, আর একবার লাগালে আশপাশে নিজে থেকেই চারা গজায়।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পুঁইশাক বোনা বা রোপণ করা হয় ফাল্গুন–বৈশাখ (মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মে), যা রবি ও খরিফ-১ মৌসুমের অংশ।
ফাল্গুন থেকে বৈশাখে বীজ বা কাটিং লাগানো হয়। বীজের খোসা শক্ত, তাই এক রাত পানিতে ভিজিয়ে নিলে দ্রুত গজায়। পুরোনো গাছের ডগা থেকে এক বিঘত লম্বা কাটিং ছায়ায় ভেজা মাটিতে লাগালেও শিকড় হয়।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
পুঁই উর্বর, আর্দ্র মাটি পছন্দ করে। মাদায় কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। পুকুরপাড়ের ভেজা মাটি, সবজির বেডের বেড়া বা ঘরের পাশের দেয়াল বেয়ে তোলা যায়। বর্ষায় মাদা একটু উঁচু রাখা, যাতে গোড়ায় পানি না জমে।
পরিচর্যা
- লতা বাড়তে শুরু করলে বেড়া বা মাচায় তুলে দেওয়া।
- ডগা নিয়মিত কাটলে পাশে নতুন শাখা বের হয়, গাছ ঝোপালো হয়।
- গরমে নিয়মিত পানি; শুকনো মাটিতে পাতা ছোট ও শক্ত হয়।
- মাসে একবার কম্পোস্ট বা পাতলা স্লারি; পাতার সবুজ রং গাঢ় থাকে।
- শামুক ও পাতা খাওয়া পোকার দিকে নজর।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় বৈশাখ–ভাদ্র (মধ্য এপ্রিল – মধ্য সেপ্টেম্বর)।
বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে কচি ডগা পাতাসহ কেটে নেওয়া হয়। পুঁইয়ের ডাঁটাও রান্না হয়। শরতে দিন ছোট হলে ফুল ও ফল আসে, তখন পাতা কমে যায়।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| পাতার দাগ রোগ | পাতায় ছোট গোল বাদামি দাগ, মাঝখান সাদাটে; বর্ষায় বেশি | আক্রান্ত পাতা কেটে ফেলা; বাতাস চলাচল; গোড়ায় পানি |
| শামুক | রাতে পাতা খেয়ে বড় ছিদ্র করে | সন্ধ্যায় হাতে তুলে ফেলা; গোড়ার চারপাশে ছাই বা ভাঙা ডিমের খোসা; হাঁস চরাতে দেওয়া (ফসল রক্ষা করে) |
| শুঁয়োপোকা ও লেদা পোকা | পাতা ঝাঁঝরা, কখনো রাতারাতি অনেক পাতা খেয়ে ফেলে | সকালে হাতে বেছে নষ্ট; ডিমের গাদা পাতা থেকে তুলে ফেলা; নিমের নির্যাস; পাখি বসার জায়গা রাখা |
| জাব পোকা | কচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমে | সাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
পুঁইশাক মূলত স্বপরাগী, তাই সবুজ আর লাল পুঁই কয়েক মিটার দূরে লাগালেই সাধারণত আলাদা থাকে।
- বর্ষার শেষে কয়েকটি সবচেয়ে সতেজ গাছের ডগা কাটা বন্ধ করুন, যাতে ফুল আসে।
- কার্তিক-অগ্রহায়ণে ছোট ছোট সবুজ ফল পেকে গাঢ় বেগুনি-কালো হলে তুলুন।
- ফল পানিতে চটকে বেগুনি রস থেকে বীজ আলাদা করুন (রস কাপড়ে দাগ ফেলে, সাবধান)।
- বারবার ধুয়ে পরিষ্কার করে ছায়ায় ও হালকা রোদে কয়েক দিন শুকান।
- শুকনো, শক্ত বীজ বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন।
বীজের আয়ু
পুঁইয়ের বীজ শক্ত খোসার, ভালোভাবে শুকিয়ে রাখলে দুই-তিন বছর ভালো থাকে। তাছাড়া বেঁচে থাকা গাছ থেকে কাটিংও নেওয়া যায়, তাই বীজ হারানোর ঝুঁকি কম।
পুষ্টিগুণ
পুঁইশাকে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম আর আঁশ আছে। পিচ্ছিল রস দ্রবণীয় আঁশ। পুঁইশাক দিয়ে চিংড়ি, মাছের মাথা বা ডাল জনপ্রিয় রান্না। বেগুনি ফলের রস প্রাকৃতিক রং হিসেবেও ব্যবহার হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।