শিম
শীতের সবজির রানি শিম। বর্ষায় বুনে দিলে কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত মাচা ভরে থাকে সবুজ, বেগুনি আর সাদা শুঁটিতে, আর শিকড় মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করে।
- নাম
- শিম · Hyacinth bean / Dolichos bean · Lablab purpureus
- পরিবার
- শিমজাতীয় (ফ্যাবেসি)
- জাতের ধরন
- দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত; মূলত স্বপরাগী, বীজ রাখা সহজ
- বপন বা রোপণ
- আষাঢ়–ভাদ্র (মধ্য জুন – মধ্য সেপ্টেম্বর)
- দূরত্ব
- মাদা থেকে মাদা প্রায় ১–১.৫ মিটার; মাচা বা বাঁশের কাঠামোয়
- ফসল তোলা
- বোনা থেকে প্রথম শুঁটি প্রায় ৯০–১২০ দিনে · কার্তিক–মাঘ
- বীজ সংগ্রহ
- ফাল্গুন
- বীজের আয়ু
- বায়ুরোধী পাত্রে প্রায় দুই থেকে তিন বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
দেশি শিমের বৈচিত্র্য অনেক: চ্যাপ্টা সবুজ, বেগুনি কিনারওয়ালা, পুরো বেগুনি, সাদাটে, ছোট “ঘৃতকাঞ্চন” ধরনের, বা মোটা দানাওয়ালা “ছুরি শিম”। প্রতিটি অঞ্চলে কৃষকেরা নিজেদের পছন্দের জাত বছরের পর বছর রেখে আসছেন, তাই দেশি শিমের বীজ পাওয়া সহজ। বারিরও কয়েকটি মুক্ত-পরাগায়িত শিমের জাত আছে; কেনার আগে জাতের ধরন যাচাই করে নিতে হবে। হাইব্রিড শিম আমাদের খামারে নয়।
আমাদের পরিকল্পনা হলো দুই-তিনটি আলাদা রং ও স্বাদের দেশি জাত রাখা, যাতে মৌসুমজুড়ে বৈচিত্র্য থাকে। শিম মূলত স্বপরাগী, তাই কয়েকটি জাত মাচার ভিন্ন অংশে লাগালেও বীজ খুব একটা মেশে না।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শিম বোনা বা রোপণ করা হয় আষাঢ়–ভাদ্র (মধ্য জুন – মধ্য সেপ্টেম্বর), যা খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমের অংশ।
শিম দিনের দৈর্ঘ্য কমলে ফুল দেয়। তাই বর্ষার মাঝামাঝি, আষাঢ় থেকে ভাদ্রে বীজ বুনলে লতা বর্ষায় বেড়ে উঠে কার্তিক থেকে ফুল-ফল দেয়। খুব আগে বুনলে লতা অনেক বাড়ে, কিন্তু ফুল আসে সেই একই সময়ে; খুব দেরিতে বুনলে গাছ ছোট থাকে আর ফলন কমে। প্রতি মাদায় তিন-চারটি বীজ, গজানোর পর দুটি সবল চারা।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
মাদা উঁচু করে তৈরি, যাতে বর্ষার পানি গোড়ায় না জমে। মাদায় কম্পোস্ট আর কিছু ছাই; শিম নিজে নাইট্রোজেন তৈরি করে, তাই বেশি গোবর লাগে না, বরং বেশি দিলে লতা বেশি হয়, ফুল কম। পুকুরপাড়ের মাচা, বেড়া বা ঘরের চালেও শিম তোলা যায়। মাচা মজবুত হওয়া দরকার, কারণ পূর্ণ মৌসুমে লতা অনেক ভারী হয়।
পরিচর্যা
- চারা লতাতে শুরু করলে কঞ্চি বা দড়ি দিয়ে মাচায় তুলে দেওয়া।
- বর্ষায় গোড়ায় পানি জমতে না দেওয়া; শুকনো মৌসুমে ফুল আসার পর নিয়মিত পানি।
- লতা অতিরিক্ত ঝোপালো হলে কিছু শাখা ছেঁটে দেওয়া, যাতে আলো-বাতাস ঢোকে আর ফুল বেশি হয়।
- ফুল আসার সময় গোড়ায় সামান্য কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।
- জাব পোকা দেখা দিলে শুরুতেই সাবান-পানি; শীতে জাব দ্রুত বাড়ে।
- শুঁটি নিয়মিত তুললে গাছ নতুন ফুল দিতে থাকে।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় কার্তিক–মাঘ (মধ্য অক্টোবর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)।
শুঁটি কচি ও নরম থাকতে, দানা স্পষ্ট বড় হওয়ার আগে তোলা হয়। কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত সপ্তাহে দুই-তিনবার তোলা যায়। পরিপক্ব কিন্তু সবুজ দানা আলাদা করে “শিমের বিচি” হিসেবেও রান্না হয়, যা আমিষে ভরপুর।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| জাব পোকা | কচি ডগা, পাতার নিচ ও ফুলে ছোট সবুজ-কালো পোকার দল; পাতা কুঁকড়ে যায়, আঠালো রস জমে | সাবান-পানি বা নিমপাতার নির্যাস স্প্রে; আক্রান্ত ডগা কেটে ফেলা; লেডিবার্ড বিটলসহ উপকারী পোকা রক্ষা; হলুদ আঠালো ফাঁদ |
| শিমের ফল ছিদ্রকারী পোকা | ফুল ও কচি শুঁটিতে ছিদ্র, ভেতরে কীড়া; ফুল ঝরে পড়ে | আক্রান্ত ফুল ও শুঁটি তুলে নষ্ট; নিমের নির্যাস ফুল আসার সময়; সন্ধ্যায় আলোর ফাঁদ |
| মোজাইক ভাইরাস | পাতায় হলুদ-সবুজ ছোপ, পাতা ছোট ও কোঁকড়ানো | জাব ও সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ; আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা; এমন গাছের বীজ নয় |
| মরিচা রোগ | পাতার নিচে বাদামি-কমলা গুঁড়োর মতো দাগ | আক্রান্ত পাতা সরানো; ঘন লতা পাতলা করা; পরের বছর অন্য জায়গায় চাষ |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
শিম মূলত স্বপরাগী, তবে মৌমাছি ঘুরে বেড়ালে সামান্য সংকর হতে পারে। একাধিক জাত থাকলে মাচার আলাদা প্রান্তে, অন্তত কয়েক মিটার দূরে রাখুন, আর বীজের গাছ জাতের বৈশিষ্ট্য দেখে বাছাই করুন।
- সবচেয়ে সুস্থ, ফলনশীল কয়েকটি গাছ চিহ্নিত করুন; এদের প্রথম দিকের শুঁটি খাওয়ার জন্য তুলবেন না।
- শুঁটি গাছেই পুরো পাকতে ও শুকাতে দিন, যতক্ষণ না বাদামি, খড়খড়ে হয় আর ঝাঁকালে ভেতরে দানার শব্দ হয়।
- শুকনো শুঁটি তুলে আরও কয়েক দিন ছায়ায় রাখুন, তারপর হাতে ভেঙে বা কাপড়ে রেখে আলতো পিটিয়ে দানা বের করুন।
- ভাঙা, কুঁচকানো, ছিদ্রযুক্ত দানা বাদ দিন; শুধু পুষ্ট, চকচকে দানা রাখুন।
- দুই-তিন দিন হালকা রোদে শুকান; দাঁতে চাপ দিলে দাগ না বসে ভাঙলে তৈরি।
- বায়ুরোধী পাত্রে নিমপাতা বা ছাইসহ রাখুন; ডালের দানায় ঢোরা পোকা সবচেয়ে বড় শত্রু, তাই মাসে একবার দেখুন।
বীজের আয়ু
শিমের বীজ ফাল্গুনে সংগ্রহ হয়ে পরের আষাঢ় পর্যন্ত রাখতে হয়। ভালোভাবে শুকানো ও বায়ুরোধী অবস্থায় দুই-তিন বছর ভালো থাকে, তবে ঢোরা পোকার জন্য প্রতি বছর নতুন বীজ রাখাই নিরাপদ।
পুষ্টিগুণ
শিমের শুঁটি ও দানায় আমিষ, আঁশ, আয়রন, ফোলেট আর কিছু ভিটামিন সি আছে। শুকনো বা পাকা দানা ডালের মতো আমিষের উৎস। শিম ভাজি, মাছের ঝোল, শিমের বিচির ভর্তা, নানা রান্না। কাঁচা বা আধা সেদ্ধ শিম খাওয়া উচিত নয়; ভালো করে রান্না করে খেতে হয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।