সীড ব্যাংক · তেলবীজ

সরিষা

শীতের মাঠে হলুদ সরিষা ফুল বাংলার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যের একটি। নিজেদের সরিষা থেকে ঘানিতে ভাঙানো খাঁটি তেল, আর ফুলে মৌমাছির ভিড়।

মুক্ত-পরাগায়িত · বীজ রাখা যায়হাইব্রিড নয়খরিফ-২রবি
নাম
সরিষা · Mustard (Tori and Rai) · Brassica rapa (টরি), Brassica juncea (রাই)
পরিবার
সরিষাজাতীয় (ব্র্যাসিকেসি)
জাতের ধরন
মুক্ত-পরাগায়িত দেশি টরি ও রাই জাত; হাইব্রিড বাদ
মৌসুম
খরিফ-২, রবি
বপন বা রোপণ
আশ্বিন–কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য নভেম্বর)
দূরত্ব
সারিতে বুনলে সারি থেকে সারি প্রায় ২৫–৩০ সেমি; ছিটিয়েও বোনা যায়
ফসল তোলা
টরি বোনা থেকে প্রায় ৮০–৯০ দিন; রাই কিছু বেশি · অগ্রহায়ণ–মাঘ
বীজ সংগ্রহ
পৌষ–মাঘ
বীজের আয়ু
প্রায় দুই থেকে তিন বছর

বারো মাসের সময়সূচি

বৈশাখ
জ্যৈষ্ঠ
আষাঢ়
শ্রাবণ
ভাদ্র
আশ্বিন
কার্তিক
অগ্রহায়ণ
পৌষ
মাঘ
ফাল্গুন
চৈত্র

বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে

জাত ও উৎস

দেশে প্রধানত দুই ধরনের সরিষা: টরি, যা স্বল্পমেয়াদি আর আমন ও বোরোর মাঝের ফাঁকে খাপ খায় (যেমন দেশি টরি-৭), আর রাই, যা একটু দীর্ঘমেয়াদি, ঝাঁঝালো। বারির কয়েকটি মুক্ত-পরাগায়িত সরিষার জাত আছে; কিছু হাইব্রিড সরিষাও বাজারে আছে, যা আমাদের খামারে নয়। প্রতিটি জাতের ধরন কেনার আগে যাচাই।

টরি পোকার মাধ্যমে পরপরাগী, রাই মূলত স্বপরাগী। তাই টরির বীজ রাখতে বেশি গাছ আর বিশুদ্ধতার যত্ন দরকার।

মৌসুম ও বপন

খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সরিষা বোনা বা রোপণ করা হয় আশ্বিন–কার্তিক (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য নভেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।

আশ্বিনের শেষ থেকে কার্তিকে, আমন কাটার পর বা আগাম জমিতে, মাটিতে জো থাকতে বোনা হয়। দেরিতে বুনলে জাব পোকার আক্রমণ বাড়ে। ছিটিয়ে বা সারিতে; প্রতি শতাংশে আনুমানিক ৩০–৪০ গ্রাম বীজ, বালির সাথে মিশিয়ে।

জমি তৈরি ও দূরত্ব

মিহি চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে মাটি, কম্পোস্ট মেশানো। সরিষার শিকড় গভীরে যায়, মাটির গঠন ভালো করে। সরিষার পরে বোরো বা মুগ ভালো হয়। সরিষার জমির পাশে মৌমাছির বাক্স রাখলে পরাগায়ন ভালো হয়, আর মধুও পাওয়া যায়।

পরিচর্যা

  • চারা গজানোর দুই-তিন সপ্তাহে পাতলা করা ও নিড়ানি।
  • শুকনো বছরে ফুল আসার আগে একটি হালকা সেচ।
  • জাব পোকা ফুলের মঞ্জরিতে দেখা দিলে শুরুতেই সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস, বিকেলে, যখন মৌমাছি কম।
  • অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নয়; গাছ নরম হয়ে জাব বাড়ে।

ফসল তোলা

ফসল তোলার প্রধান সময় অগ্রহায়ণ–মাঘ (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ফেব্রুয়ারি)।

অগ্রহায়ণ থেকে মাঘে, যখন প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শুঁটি হলুদ-খড় রঙের, তখন কাটা হয়; সব শুঁটি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলে শুঁটি ফেটে দানা ঝরে যায়। সকালে শিশির থাকতে কাটা, কয়েক দিন স্তূপ করে রেখে তারপর রোদে শুকিয়ে মাড়াই। শুকনো দানা ঘানিতে ভাঙিয়ে তেল, খৈল গরুর খাবার বা জৈব সার।

রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান

সরিষা-এর প্রধান রোগ-পোকা ও জৈব প্রতিকার
সমস্যালক্ষণজৈব সমাধান
জাব পোকাফুলের মঞ্জরি ও কচি শুঁটিতে ঘন পোকার দল; শুঁটি হয় নাসময়মতো আগাম বোনা; সাবান-পানি বা নিমের নির্যাস; লেডিবার্ড বিটল রক্ষা; আক্রান্ত মঞ্জরির আগা কেটে ফেলা
অল্টারনারিয়া পাতা দাগপাতা ও শুঁটিতে কালো-বাদামি চক্রাকার দাগসুস্থ বীজ; ঘন না বোনা; শস্য পর্যায়
করাতি মাছিকালো কীড়া চারার পাতা খায়সকালে ছাই ছিটানো; হাতে বেছে নষ্ট
দানা ঝরাপাকা শুঁটি ফেটে দানা মাটিতেসময়মতো, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শুঁটি হলুদ হলে কাটা

রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।

বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

টরি পোকার মাধ্যমে পরপরাগী, আর নিজের পরাগে বীজ কম হয়; তাই বীজের জন্য জমির একটি বড় অংশের অনেক গাছ একসাথে রাখতে হবে। আশপাশে অন্য টরি বা হাইব্রিড সরিষা থাকলে সংকর হবে; সম্ভব হলে কয়েকশ মিটার দূরত্ব। রাই মূলত স্বপরাগী, কয়েক দশ মিটার দূরত্বেই চলে।

  1. জমির মাঝখানের সবচেয়ে সমান, সুস্থ অংশ বীজের জন্য রাখুন; কিনারার গাছ বাদ, কারণ সেখানে বাইরের পরাগ বেশি আসে।
  2. জাতের সাথে না মেলা গাছ (ভিন্ন উচ্চতা, ভিন্ন সময়ে ফুল) ফুল আসার সময় তুলে ফেলুন।
  3. প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শুঁটি হলুদ হলে সকালে আলাদা করে কাটুন।
  4. কয়েক দিন স্তূপে রেখে, তারপর ত্রিপলে রোদে শুকিয়ে পিটিয়ে মাড়াই করুন।
  5. কুলায় ঝেড়ে পরিষ্কার করে আরও দুই-তিন দিন রোদে শুকান।
  6. বায়ুরোধী পাত্রে রাখুন; তেলবীজ বলে আর্দ্র জায়গায় দ্রুত নষ্ট হয়।

বীজের আয়ু

সরিষার বীজ পৌষ-মাঘে সংগ্রহ হয়ে পরের আশ্বিন পর্যন্ত রাখতে হয়। তেলবীজ বলে আর্দ্রতা ও গরমে অঙ্কুরোদগম দ্রুত কমে; খুব ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে দুই-তিন বছর চলে।

পুষ্টিগুণ

সরিষার তেল রান্নার প্রধান তেল, ঝাঁঝালো স্বাদের জন্য ভর্তা-আচারে অপরিহার্য। সরিষা বাটা দিয়ে মাছ বাংলার বিখ্যাত রান্না। সরিষার কচি পাতাও শাক হিসেবে খাওয়া যায়, যাতে ভিটামিন এ, সি ও ক্যালসিয়াম আছে।

সীড ব্যাংকের খাতায়

প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।