টমেটো
শীতের সকালে লাল টমেটো ছাড়া সালাদ আর চাটনি অসম্পূর্ণ। মুক্ত-পরাগায়িত টমেটো থেকে গাঁজন পদ্ধতিতে বীজ রাখা সহজ, আর এক মৌসুমের কয়েকটি ফলই যথেষ্ট।
- নাম
- টমেটো · Tomato · Solanum lycopersicum
- পরিবার
- বেগুনজাতীয় (সোলানেসি)
- জাতের ধরন
- মুক্ত-পরাগায়িত জাত; বারির কয়েকটি মুক্ত-পরাগায়িত জাত আছে
- বপন বা রোপণ
- আশ্বিন–অগ্রহায়ণ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর)
- দূরত্ব
- সারি থেকে সারি প্রায় ৬০ সেমি, গাছ থেকে গাছ প্রায় ৪০–৫০ সেমি; খুঁটিতে বাঁধা
- ফসল তোলা
- রোপণ থেকে প্রায় ৬০–৭০ দিনে প্রথম পাকা ফল · পৌষ–ফাল্গুন
- বীজ সংগ্রহ
- মাঘ–ফাল্গুন
- বীজের আয়ু
- প্রায় চার থেকে ছয় বছর
বারো মাসের সময়সূচি
বপন বা রোপণফসল তোলাবীজ সংগ্রহ · একই তথ্য শস্য ক্যালেন্ডারে
জাত ও উৎস
বাজারের বেশির ভাগ টমেটো বীজ এখন হাইব্রিড। তবে বারির কয়েকটি মুক্ত-পরাগায়িত টমেটোর জাত আছে (যেমন বারি টমেটো-২, রতন), আর গ্রামে কিছু পুরোনো দেশি টক-মিষ্টি ছোট টমেটো টিকে আছে। কেনার আগে জাতটি মুক্ত-পরাগায়িত কি না, প্রতিষ্ঠানের তথ্যে যাচাই করতে হবে।
আমাদের লক্ষ্য দুটি জাত: একটি বড় ফলের রান্না ও সালাদের জন্য, আরেকটি ছোট, বেশি ফলনশীল চাটনি ও সস বানানোর জন্য।
মৌসুম ও বপন
খামারের শস্য ক্যালেন্ডার অনুযায়ী টমেটো বোনা বা রোপণ করা হয় আশ্বিন–অগ্রহায়ণ (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর), যা খরিফ-২ ও রবি মৌসুমের অংশ।
আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণে বীজতলায় বীজ বোনা, আর চারার বয়স প্রায় চার সপ্তাহ, চার-পাঁচ পাতা হলে মূল জমিতে রোপণ। কয়েক সপ্তাহ পরপর দুই-তিন দফায় বুনলে পৌষ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত টমেটো পাওয়া যায়। বীজতলা উঁচু ও রোদেলা, ওপরে প্রয়োজনে চালা।
জমি তৈরি ও দূরত্ব
বেডে প্রচুর কম্পোস্ট বা কেঁচো সার, কিছু ছাই। রোপণের সময় চারা একটু গভীরে লাগালে কাণ্ড থেকেও শিকড় হয়, গাছ শক্ত হয়। প্রতিটি গাছের পাশে খুঁটি বা সারির ওপর দিয়ে দড়ি টানা। আগের মৌসুমে বেগুন, মরিচ বা আলু ছিল এমন জায়গায় টমেটো নয়।
পরিচর্যা
- গাছ বাড়তে থাকলে নরম দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধা।
- পাতার কক্ষ থেকে বের হওয়া কিছু পাশের ডাল ভেঙে দেওয়া, যাতে বাতাস চলে আর ফল বড় হয়।
- নিয়মিত, সমান পরিমাণে পানি; একবার শুকিয়ে আবার বেশি পানি দিলে ফল ফেটে যায়।
- গোড়ায় খড়ের মালচ; মাটি পাতায় ছিটকে রোগ ছড়ায় না।
- ফুল আসার পর মাসে একবার কম্পোস্ট-চা বা পাতলা স্লারি।
- নিচের দিকের হলুদ বা দাগযুক্ত পাতা ছেঁটে ফেলা।
ফসল তোলা
ফসল তোলার প্রধান সময় পৌষ–ফাল্গুন (মধ্য ডিসেম্বর – মধ্য মার্চ)।
পৌষ থেকে ফাল্গুনে টমেটো তোলা হয়। ফল লাল হতে শুরু করলে তুলে ঘরে কয়েক দিন রাখলেও পেকে যায়, আর পাখি বা পোকার ক্ষতি কম হয়। মৌসুমের শেষে সবুজ টমেটো দিয়ে চাটনি বা আচার বানানো যায়।
রোগ-পোকা ও জৈব সমাধান
| সমস্যা | লক্ষণ | জৈব সমাধান |
|---|---|---|
| ফল ছিদ্রকারী পোকা | ফলে গোল ছিদ্র, ভেতরে সবুজ কীড়া | আক্রান্ত ফল তুলে নষ্ট; ফেরোমন ফাঁদ; সাথী ফসল হিসেবে গাঁদা ফুল; নিমের নির্যাস |
| নাবি ধসা রোগ | কুয়াশাচ্ছন্ন ঠান্ডা আবহাওয়ায় পাতায় পানিভেজা কালো দাগ, দ্রুত ছড়িয়ে গাছ পুড়ে যাওয়ার মতো দেখায় | বাতাস চলাচল; পাতায় পানি নয়; আক্রান্ত পাতা ও গাছ দ্রুত সরানো; আলু ও টমেটো পাশাপাশি নয় |
| পাতা কোঁকড়ানো ভাইরাস | পাতা কুঁকড়ে ছোট হয়, গাছ খাটো থাকে, ফল ধরে না | সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণ; আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা; এমন গাছের বীজ নয় |
| ফল ফাটা | পাকার সময় ফলের গায়ে চক্রাকার বা লম্বা ফাটল | সমান পানি; মালচ; ভারী বৃষ্টির আগে লাল হতে শুরু করা ফল তুলে ফেলা |
রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার হবে না। সাধারণ জৈব প্রস্তুতির পদ্ধতি জৈব কীটনাশক পাতায়।
বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
আধুনিক টমেটো ফুলের গঠনের কারণে প্রায় পুরোপুরি স্বপরাগী, তাই দুটি জাত কয়েক মিটার দূরে লাগালেই সাধারণত বিশুদ্ধ থাকে। তবু বীজের গাছ সারির মাঝখান থেকে বাছাই করা ভালো।
- জাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, রোগমুক্ত কয়েকটি গাছ চিহ্নিত করুন; প্রতিটি গাছের মাঝের দিকের কয়েকটি সুগঠিত ফল বীজের জন্য।
- ফল গাছেই পুরো লাল ও কিছুটা নরম হওয়া পর্যন্ত রাখুন।
- ফল কেটে বীজসহ রস একটি কাচের বয়ামে চিপে নিন, সামান্য পানি মেশান।
- বয়াম ঢেকে দুই-তিন দিন রেখে দিন (গাঁজন); ওপরে সাদা স্তর পড়বে, দুর্গন্ধ স্বাভাবিক।
- পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে ভাসমান বীজ ও শাঁস ফেলে দিন; তলায় জমা ভারী বীজ রাখুন।
- ছাঁকনিতে পানি ঝরিয়ে প্লেট বা কাগজে পাতলা করে ছায়ায় শুকান, মাঝে মাঝে আলাদা করে দিন যাতে জমাট না বাঁধে।
- শুকনো বীজ বায়ুরোধী পাত্রে লেবেলসহ রাখুন।
বীজের আয়ু
গাঁজন করে পরিষ্কার ও ভালোভাবে শুকানো টমেটোর বীজ দীর্ঘজীবী। কয়েক বছর ভালো থাকে, তবে প্রতি দুই বছরে নতুন বীজ রাখলে জাত সতেজ থাকে।
পুষ্টিগুণ
টমেটোতে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, পটাশিয়াম আর লাইকোপিন নামের লাল রঞ্জক আছে, যা রান্না করলে শরীর আরও সহজে গ্রহণ করে। কাঁচা সালাদ, চাটনি, ডাল-মাছে, আর সস বানিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। কাঁচা খাওয়া হয় বলে তোলার আগের কয়েক সপ্তাহ গাছে তরল স্লারি নয়।
প্রতিটি সংগ্রহের লট নম্বর, গাছের সংখ্যা আর অঙ্কুরোদগমের হার বীজ রেজিস্টারে লিখুন। সাধারণ নিয়ম বীজ সংরক্ষণ পদ্ধতি আর সংরক্ষণাগার পাতায়।