মাটি থেকে নিজেদের পাতে
পাঁচ পরিবারের স্বনির্ভর, অবাণিজ্যিক ও সম্পূর্ণ জৈব খামার। শহর থেকে বিশ মিনিটের পথ, অন্তত দশ বিঘা জমি, সূর্যের আলোয় চলা বিদ্যুৎ আর গোয়ালঘর থেকে রান্নার গ্যাস।
বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, নিজেদের খাবার নিজেরা
বাজারের চাল-সবজিতে কী সার আর কী কীটনাশক পড়েছে, মাছ আর মুরগির খাবারে কী মেশানো হয়, আমরা জানি না। এই অনিশ্চয়তা থেকেই পাঁচটি পরিবারের সিদ্ধান্ত: শহরের কাছে একখণ্ড জমিতে নিজেদের খাবার নিজেরা ফলাব, পুরোপুরি জৈব পদ্ধতিতে।
খামারটি ব্যবসা নয়। কোন ফসল হবে তা ঠিক হবে বাজারদর দেখে নয়, পাঁচ পরিবারের রান্নাঘরের প্রয়োজন দেখে। বীজ থাকবে নিজেদের ঘরে, আর সন্তানেরা দেখবে চারা কীভাবে ভাত হয়।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যছয়টি নীতি, প্রতিটি সিদ্ধান্তে
পুকুর খোঁড়া হোক বা কোন জাতের লাউ লাগানো হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এই নীতিগুলোর সাথে মিলিয়ে নেওয়া হবে।
ভিশন পড়ুনস্বনির্ভরতা
খাবার, শক্তি আর বীজ, তিনটিতেই বাইরের ওপর নির্ভরতা যতটা সম্ভব কমানো। চাল, মাছ, দুধ, ডিম, সবজি ও ডাল যেন বছরের বেশির ভাগ সময় নিজেদের জমি থেকেই আসে।
+অবাণিজ্যিক
উৎপাদনের লক্ষ্য লাভ নয়, পাঁচ পরিবারের সারা বছরের খাবার। উদ্বৃত্ত কীভাবে ভাগ হবে তা বণ্টন নীতিতে লেখা থাকবে।
+সম্পূর্ণ জৈব
রাসায়নিক সার, আগাছানাশক ও কীটনাশক নয়। মাটির খাবার আসবে গোবর, কম্পোস্ট, কেঁচো সার ও বায়োগ্যাস স্লারি থেকে; পোকা দমন হবে নিম, ফাঁদ আর ফসলের পালাবদলে।
+বীজের স্বাধীনতা
হাইব্রিড কোনো জাত নয়। শুধু দেশি ও মুক্ত-পরাগায়িত জাত, যাদের বীজ রেখে পরের বছর আবার বোনা যায়, নিজেদের সীড ব্যাংকে।
+পরিচ্ছন্ন শক্তি
বিদ্যুতের লাইন নেওয়া হবে না। প্রথমে ৫ কিলোওয়াট, পরে ১০ কিলোওয়াট সৌর ব্যবস্থা। রান্না হবে গোবরের বায়োগ্যাসে।
+আমানতের দায়
জমি, পানি ও প্রাণী আল্লাহর দেওয়া আমানত। অপচয় না করা, মাটিকে আগের চেয়ে উর্বর রেখে যাওয়া, পশুর প্রতি দয়া আর হিসাবের স্বচ্ছতা।
+খামারে যা যা থাকবে
মোট টি পাতায় পুরো পরিকল্পনা আটটি অধ্যায়ে ভাগ করা। যেকোনো কার্ডে চাপ দিয়ে সেই অধ্যায়ের সূচিপাতায় যান।
সীড ব্যাংক
হাইব্রিডমুক্ত দেশি বীজ, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও প্রতিটি ফসলের বীজ-পরিচিতি।
ফসল ও মাটি
ছয় ঋতু, তিন মৌসুম, ধান চাষ, মাচা সবজি, কম্পোস্ট ও সেচ।
মাছ ও পুকুর
দুটি পুকুর, বাঁধানো ঘাট, পানির মান, জৈব খাদ্য ও চৌদ্দটি মাছ।
প্রাণিসম্পদ
দেশি গরু, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, হাঁস-মুরগি, রাজহাঁস, ময়ূর ও হরিণ।
শক্তি ও বায়োগ্যাস
৫ থেকে ১০ কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ, ব্যাটারি, সোলার পাম্প ও বায়োগ্যাস।
মানুষ ও কাজ
দায়িত্ব বণ্টন, দৈনিক রুটিন, প্রশিক্ষণ, শিশুদের অংশগ্রহণ ও হিসাব।
ওয়াকফ ও মসজিদ
ওয়াকফ জমি, আইনি নিবন্ধন, ছোট মসজিদ ও মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব।
মূল পরিকল্পনা
মালিকানা, জমি নির্বাচন, দেয়াল, মাস্টারপ্ল্যান, ক্যালেন্ডার ও রোডম্যাপ।
বীজ থেকে পাতে, প্রতিটি ধাপ
প্রতিটি অধ্যায়ের নিজস্ব সূচিপাতা আছে। নামের ওপর চাপ দিন।
- (০১)লেআউট মাস্টারপ্ল্যানকোন অংশে কী থাকবে: পুকুর, ধানক্ষেত, শেড, সোলার, বসতবাড়ি ও ওয়াকফ প্লট।
- (০২)সীড ব্যাংকনিজেদের বীজ নিজেরা রাখা: সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ ও রেজিস্টার।
- (০৩)মৌসুমি চাষখরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি মৌসুম ধরে ধান, সবজি, ডাল ও তেলবীজ।
- (০৪)পুকুর ও ঘাটবড় পুকুরে বাঁধানো ঘাট ও বসার জায়গা, ছোট পুকুরে জিওল মাছ।
- (০৫)গোয়াল ও খোঁয়াড়দেশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও রাজহাঁসের ঘর, খাবার ও টিকা।
- (০৬)সৌর বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসগ্রিড ছাড়া আলো, পাখা, পাম্প; গোবর থেকে রান্নার গ্যাস।
- (০৭)পাঁচ পরিবারের দায়িত্বরুটিন, রোস্টার, প্রশিক্ষণ, বণ্টন নীতি ও হিসাবের স্বচ্ছতা।
- (০৮)ওয়াকফ মসজিদদেয়ালের বাইরে ওয়াকফকৃত জমিতে সবার জন্য খোলা ছোট মসজিদ।
তিন মৌসুম, ছয় ঋতু
বাংলাদেশের কৃষি চলে তিন ফসল মৌসুমে, প্রকৃতি ঘোরে ছয় ঋতুতে। খামারের প্রতিটি কাজ এই ক্যালেন্ডার ধরে সাজানো। পূর্ণ শস্য ক্যালেন্ডার
গরম ও প্রাক-বর্ষার মৌসুম
তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি, মাঝে মাঝে কালবৈশাখী। মৌসুমের শুরুতে সেচ লাগে, শেষে বর্ষা নামে। দ্রুত বাড়ে এমন শাক আর লতানো সবজির সময়।
খরিফ-১ বিস্তারিতভরা বর্ষা ও শরৎ
মাঠ পানিতে ভরা, আমন রোপণের সময়। নিচু জমিতে পানি জমে, তাই সবজি যায় উঁচু বেড আর মাচায়। শরতে শীতের সবজির বীজ বোনা শুরু।
খরিফ-২ বিস্তারিতশীতের ভরা মৌসুম
শুকনো, ঠান্ডা আবহাওয়া; সবজির জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। ডাল ও তেলবীজ মাটিতে নাইট্রোজেন ফেরায়। মৌসুমের শেষে বেশির ভাগ বীজ সংগ্রহ হয়।
রবি বিস্তারিতএকটির বর্জ্য, অন্যটির খাদ্য
ঠিকমতো সাজাতে পারলে বাইরে থেকে সার, জ্বালানি বা পশুখাদ্য কেনার প্রয়োজন অনেক কমে যায়। ধাপগুলো নিজে নিজে ঘোরে; যেকোনোটিতে চাপ দিলে থামবে।
- গরু ও ছাগলঘাস, খড় আর ভুসি খেয়ে দেয় দুধ, মাংস এবং প্রতিদিনের গোবর। গরুর গোবরই বায়োগ্যাসের মূল কাঁচামাল।
- বায়োগ্যাস প্ল্যান্টগোবর ও পানি মিশিয়ে দেওয়া হয় ডাইজেস্টারে। বাতাসহীন অবস্থায় পচে তৈরি হয় রান্নার গ্যাস, যা পাইপে রান্নাঘরে যায়।
- স্লারি ও কম্পোস্টপ্ল্যান্টের স্লারি, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, খড় ও ঝরা পাতা মিলিয়ে তৈরি হয় জৈব সার; একাংশ যায় কেঁচো সারের হাউজে।
- মাঠ ও মাচাধানক্ষেত, সবজির বেড, পুকুরপাড়ের মাচা আর ঘাসের প্লটে এই সার দেওয়া হয়। ধানের খড় ও ঘাস আবার ফিরে যায় গোয়ালে।
- পুকুরপরিমিত পচা জৈব সার পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য (প্ল্যাংকটন) বাড়ায়; হাঁস-রাজহাঁস পানিতে চরে। তলার পলি শুকনো মৌসুমে জমিতে ফেরে।
- সূর্যসৌর প্যানেল চালায় সেচ পাম্প, আলো, পাখা ও ফ্রিজ। দিনের রোদে পাম্প চালিয়ে পানি ট্যাংকে তুলে রাখা হয়, যাতে রাতে ব্যাটারির ওপর চাপ না পড়ে।
বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট · স্লারি সার · কম্পোস্ট · গোবর ব্যবস্থাপনা
পাঁচ পরিবার, একটি খামার
খামারের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে উদ্যোক্তা পরিবার। বাকি চারটি পরিবার প্রত্যেকে ১০ শতাংশ করে মোট ৪০ শতাংশ দেবে। সব মিলিয়ে ৬০ + ১০ + ১০ + ১০ + ১০ = ১০০ শতাংশ।
খামারটি বাণিজ্যিক নয়, তাই এই অংশ মূলত তিনটি জিনিস ঠিক করে: কে কত টাকা দেবে, চলমান খরচের ভাগ কত, আর উৎপাদিত খাবারের ভাগ কীভাবে হবে। সিদ্ধান্তের নিয়ম থাকবে পরিচালনা পাতায়। অংশ ছাড়া বা নতুন কেউ যুক্ত হওয়ার নিয়ম শুরুতেই লিখিত চুক্তিতে রাখা জরুরি, যা আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করে নিতে হবে।
মালিকানা ও ফান্ডিং বিস্তারিত- উদ্যোক্তা পরিবার৬০%
- পরিবার ২১০%
- পরিবার ৩১০%
- পরিবার ৪১০%
- পরিবার ৫১০%
- মোট১০০%
যে জীবনটা আমরা গড়তে চাই
বাংলাদেশের মাঠ, পুকুর আর উঠানের এই ছবিগুলো আমাদের অনুপ্রেরণা। যেকোনো ছবিতে চাপ দিয়ে বড় করে দেখুন; তীর চিহ্ন দিয়ে পরের ছবিতে যান।
কোথা থেকে শুরু
পুরো খামার একসাথে দাঁড় করানো সম্ভবও নয়, বুদ্ধিমানের কাজও নয়। প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতা থেকে পরের ধাপ ঠিক হবে। সময়সীমা আনুমানিক। বিস্তারিত রোডম্যাপ
- ০
প্রস্তুতি
পাঁচ পরিবারের লিখিত চুক্তি, ফান্ড সংগ্রহের সূচি, জমি খোঁজা, দলিল ও খতিয়ান যাচাই, মাটি ও পানি পরীক্ষা।
- ১
ভিত্তি · প্রথম বছর
জমি কেনা ও নামজারি, সীমানা প্রাচীর ও ফটক, পুকুর খনন, নলকূপ ও ট্যাংক, ৫ কিলোওয়াট সোলার, দেশি মুরগি ও হাঁস, সবজি ও সীড ব্যাংক, বর্ষার শুরুতে গাছ লাগানো, ওয়াকফ নিবন্ধনের প্রক্রিয়া।
- ২
বিস্তার · দ্বিতীয় বছর
গোয়ালঘর, দেশি গরু ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, পুকুরে মাছ, ধান চাষ, বাঁধানো ঘাট, রাজহাঁস ও মসজিদ নির্মাণ।
- ৩
পূর্ণতা · তৃতীয় বছর ও পরে
সৌর ব্যবস্থা ১০ কিলোওয়াটে উন্নীত, অনুমতি সাপেক্ষে ময়ূর, পূর্ণাঙ্গ বীজ রেজিস্টার ও প্রতিটি ফসলের নিজস্ব বীজ।
- ৪
ভবিষ্যৎ
বন বিভাগের অনুমতি পাওয়া গেলে হরিণের ঘের। অনুমতি না মিললে এই পরিকল্পনা বাদ যাবে।
এই ওয়েবসাইট কীভাবে ব্যবহার করবেন
- ওপরের খোঁজ বোতাম চেপে বা কি-বোর্ডে / চেপে ফসল, মাছ বা যন্ত্রের নাম লিখুন।
- থ্রিডি ভিউ থেকে খামারের যেকোনো অংশে চাপ দিলে সেই অংশের পাতার লিংক পাবেন।
- শস্য ক্যালেন্ডারে মাস বাছাই করে সেই মাসের সব কাজ একসাথে দেখা যাবে।
- অপরিচিত শব্দের অর্থ শব্দকোষে, সাধারণ প্রশ্নের উত্তর প্রশ্নোত্তর পাতায়।
- ইন্টারনেট ছাড়াও ফোল্ডারটি খুলে
index.htmlচালালে ওয়েবসাইট চলবে; ছবিগুলো ফোল্ডারের ভেতরেই আছে। শুধু ফন্ট ও থ্রিডি লাইব্রেরির জন্য ইন্টারনেট লাগবে।
- ময়ূর ও হরিণ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রাণী। পালনের আগে বন বিভাগের লাইসেন্স বা অনুমতি লাগবে।
- ওয়াকফ জমির দলিল সম্পাদনের পর তা ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ে নিবন্ধন করতে হয়।
- কৃষিজমিতে পুকুর খনন বা স্থাপনা নির্মাণে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি লাগতে পারে।
- জমির দলিল, খতিয়ান ও নামজারি কেনার আগে অভিজ্ঞ আইনজীবী দিয়ে যাচাই করা আবশ্যক।
